শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৯ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশিদের টার্গেট কেন ইতালি!

  • প্রকাশের সময় : ০৬/০২/২০২২ ০৩:০৩:১৭
এই শীতে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের
Share
11

অবৈধ রুট ব্যবহার করে গত বছর কমপক্ষে ৮৬৬৭ জন বাংলাদেশি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে প্রবেশ করেছেন।ফ্রোনটেক্স-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী,বিপজ্জনক অবৈধ রুটে ইউরোপে বিশ্বের যেসব দেশের নাগরিকরা প্রবেশ করেন, তার শীর্ষে থাকা দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশ অন্যতম। এসব নাগরিকের বেশিরভাগই ইতালিতে থিতু হতে চান। অনলাইন ইনফো মাইগ্রেন্টস-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।

ইনফো মাইগ্রেন্টসকে সবুজ নামে এক বাংলাদেশি অভিবাসী সাক্ষাতকার দিয়েছেন। তিনি গত বছর লিবিয়া থেকে বোটে করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছেছেন।তিনি বলেছেন, কয়েক বছর আগে আমার বাবা মারা যান। তখনই আমি লিবিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

আট সদস্যের পরিবার আমাদের। সেখানে পরিবারকে ভরণপোষণের জন্য আমিই একমাত্র ব্যক্তি। তাই আমাকে কিছু করতেই হবে, এমন সিদ্ধান্তে আসতে হলো।

বাংলাদেশের ২৫ বছর বয়সী সবুজ ২০২০ সালে লিবিয়া যেতে প্রায় ৪ হাজার ইউরো খরচ করেন। লিবিয়া ছিল তার কাজ খুঁজে নেয়ার জন্য প্রাথমিক গন্তব্য। ওই সময় তিনি ইউরোপে পাড়ি দেয়ার কোনো পরিকল্পনাও করেননি।

সবুজ বলেন, আমার পরিবার অনগ্রসর। বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলে শরিয়তপুরে একটি গ্রামে ঝিয়ের কাজ করেন মা। আমাদের একটি গরু ছিল। তা বিক্রি করে দিলাম। লিবিয়া যাওয়ার জন্য কিছু ঋণ নিলাম।

দারিদ্র্যের কারণে শৈশবে স্কুলে যেতে পারেননি সবুজ। তিনি লিবিয়া পৌঁছার দু’এক মাসের মধ্যে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু নিয়োগকারীর কাছ থেকে বেতন পাওয়া খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। পাওনা চাইলেই তাকে প্রহার করা হতো। এমন এক কঠিন অবস্থায় এসে উন্নত জীবনের আশায় বিপজ্জনক সমুদ্র পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সবুজ।

সবুজ বলেন, লিবিয়া থেকে একটি বোটে করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে আমরা ২০২১ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ইতালির ল্যাম্পেডুসা দ্বীপে পৌঁছি। এতে সময় লাগে প্রায় ২৪ ঘন্টা। আমাদের বোটে ছিলেন ৯৩ জন। এর মধ্যে কমপক্ষে ৪০ জন ছিলেন আমার স্বদেশি।

ইতালি পৌঁছার পর থেকেই রাজধানী রোমে একটি অভিবাসী সেন্টারে বসবাস করছেন সবুজ। স্বপ্ন পূরণের জন্য ইউরোপের এই দেশে একটি কাজ পাওয়ার আশা তার। সবুজ বলেন, লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে ইতালি নিয়ে দেয়ার জন্য লিবিয়ায় পাচারকারীকে কমপক্ষে দুই হাজার ইউরো দিয়েছি। কিন্তু ইতালিতে পৌঁছার পর আমি এখন পর্যন্ত বেকার। এখানে কাউকে জানিনা। চিনিনা। এখানে কেউ আমাকে কাজ দেয় না। এখনও দেশে অন্যের বাড়িতে কাজ করেন মা। জানি না আমার জন্য কী ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে।

ইনফো মাইগ্রেন্টস বলছে, অবৈধ উপায়ে হাজার হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে যাচ্ছেন। ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে জিডিপি ৪০৯০০ কোটি ডলারের ওপরে। এর ফলে বিশ্বের ৩৭তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ। ২০৩০ সালের মধ্যে এখানকার অর্থনীতির আকার দ্বিগুন হবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছে। যদিও কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির অন্যতম হয়ে উঠেছে, তবু এখানকার হাজার হাজার নাগরিক ইউরোপে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন। এক্ষেত্রে তারা অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছেন। উদ্দেশ্য একটি উন্নত ও নিরাপদ জীবন পাওয়া।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বর্ডার এজেন্সি ফ্রোনটেক্স প্রকাশিত বার্ষিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অবৈধ পথে গত বছর কমপক্ষে ৮৬৬৭ জন বাংলাদেশি নাগরিক প্রবেশ করেছেন ইউরোপে। এর মধ্যে ৭৫৭৪ জনই গিয়েছেন মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট দিয়ে। ৬০৪ জন গিয়েছেন পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুট দিয়ে। ৪৩৭ জন গিয়েছেন পশ্চিম বলকান অভিবাসী রুট দিয়ে।

লিবিয়া থেকে মধ্য ভূমধ্যসাগর দিয়ে যেসব নাগরিক ইউরোপে পাড়ি জমান তাদের সংখ্যার একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে ফ্রোনটেক্স। তাতে দেখা গেছে, এমন দেশগুলোর তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। গত মাসে কমপক্ষে ৭ জন বাংলাদেশি লিবিয়া থেকে ইতালির ল্যাম্পেডুসা দ্বীপে পৌঁছানোর সময় মারা গেছেন হাইপোথার্মিয়ায়। এই অবৈধ রুটে এমন মৃত্যু একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশিদের জন্য প্রধান গন্তব্য ইতালি

ফ্রোনটেক্সের পরিসংখ্যান বলছে, অবৈধ পথে যেসব বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন, তাদের বেশির ভাগই গত বছর আশ্রয় নিয়েছেন ইতালিতে। কয়েক দশকে বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীদের প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়েছে পশ্চিম ইউরোপের এই দেশটি। বাংলাদেশি অভিবাসী আরাফাত রহমান। তিনি মৌসুমি ওয়ার্কার ভিসায় গত বছর সার্বিয়া গিয়েছেন। কিন্তু তিনি ইনফো মাইগ্রেন্টসকে বলেছেন, তার আসল গন্তব্য ছিল ইতালি। আরাফাত বলেছেন, সার্বিয়া থেকে ইতালি পৌঁছার জন্য পন্থা বের করার জন্য আমি এরই মধ্যে কয়েক হাজার ইউরো খরচ করেছি। আশা করছি শিগগিরই তা পেয়ে যাবো। তিনি আরও দাবি করেন, বলকান দেশ সার্বিয়াতে অবস্থানরত বাংলাদেশি পাচারকারীরা প্রতিজন মানুষকে সার্বিয়া থেকে ইতালিতে পাচার করতে নিচ্ছে চার থেকে ছয় হাজার ইউরো। তার ভাষায়, আমাকে একটি কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য তারা চেয়েছে ১৬ হাজার ইউরো। এই কাজ পেলে মাসে বেতন হিসেবে আমি পাবো ১৬০ ইউরো।

আরাফাত আরও বলেন, সার্বিয়া থেকে ইতালি যেতে সবচেয়ে ভাল মাধ্যম হলো লরিতে করে যাওয়া। কিন্তু এ ব্যবস্থায় যেতে পাচারকারীদেরকে দিতে হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। পায়ে হেঁটে সীমান্ত পাড়ি দেয়ারও ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তা অনেক বেশি ঝুঁকির এবং কম খরচের।

এখনও আরাফাত রহমান ইতালি যেতে সক্ষম হননি। তার সব অর্থ চুরি করে নিয়েছে একজন পাচারকারী। উল্টো তাকে হুমকি দিয়েছে। বলেছে, এ নিয়ে পুলিশে অভিযোগ করলে তার জীবন হুমকিতে পড়বে। ফলে সার্বিয়াতেই একটি অভিবাসী সেন্টারে বসবাস করছেন তিনি। কেন ইতালি?

রোমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শামীম আহসান। তিনি ইনফো মাইগ্রেন্টকে বলেছেন, ইতালিতে বসবাস করছেন প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি অভিবাসী। কৃষি, শিপবিল্ডিং এবং রাস্তায় ব্যবসা করা সহ নানা রকম সেক্টরে কাজ করছেন তারা। ইউরোপের অন্য কোনো দেশে এত বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী নেই। তিনি মনে করেন, পশ্চিম ইউরোপের এই দেশটি বিদেশীদের স্বাগত জানায়। তারা মাঝে মাঝে অবৈধ অভিবাসী শ্রমিকদেরকে বৈধতা দেয়। শামীম আহসান বলেন, জনগণের মধ্যে একটি ধারণা জন্মেছে যে অভিবাসীদের প্রতি অনেক বেশি নমনীয়তা দেখায় ইতালি। তাই বহু মানুষ বিশ্বাস করে, তারা কোনোভাবে সেখানে গেলে কোনো না কোনো সময় বৈধতা পাবে।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০২০ সাল থেকে ‘সিজনাল’ এবং ‘নন-সিজনাল’ ক্যাটেগরিতে বাংলাদেশি শ্রমিক নেয়া অনুমোদন করেছে ইতালি সরকার। গত মাসে রোমে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে যে,ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশ নয়-বাংলাদেশসহ এমন ৩১টি দেশের জন্য ৬৯ হাজার ৭০০ ভিসা এ বছর ইস্যু করবে ইতালি। তাই বাংলাদেশি শ্রমিকদের উচিত বৈধভাবে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করা। ইউরোপের সঙ্গে প্রত্যাবর্তন বিষয়ক স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস একবার বাংলাদেশ যখন স্বাক্ষর করেছে, ফলে অবৈধ অভিবাসীদের আস্তে আস্তে ফেরত পাঠানো শুরু হবে বলে মনে করেন শামীম আহসান।

সূত্রঃ মানবজমিন


সিলেট প্রতিদিন / এম এ আর


Local Ad Space
কমেন্ট বক্স