এনামুল কবীর :: মা-বাবার কেন ছাড়াছাড়ি হয়েছে জানেনা তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী। শুধু জানে যে, এখন থেকে মা’র সাথে তার নানার বাড়ি থাকতে হবে। লেখাপড়াও করতে হবে এখানে থেকে। নিজের গ্রামের স্কুলটি তার খুব প্রিয়। কান্না পেলেও নিষ্ঠুর বাস্তবতা তাকে মেনে নিয়ে ভর্তি হতে হবে নানার বাড়ি গোলাপগঞ্জের নালিউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গত জানুয়ারির এক সকালে ( জানুয়ারি ) মা’র হাত ধরে ভর্তি হতে গেলো ঐ স্কুলে। কিন্তু গেলেইতো হবেনা। প্রধান শিক্ষকের ইচ্ছেতো হতে হবে!
জ্বি, বাংলাদেশ বা সরকারের আইন নয়, ঐ স্কুলটি চলে প্রধান শিক্ষক জয়নাল আবেদিনের ইচ্ছা অনিচ্ছায়। এখানে তার ইচ্ছাই আইন, তার ইচ্ছাই সব।
আর তাই তিনি ফিরিয়ে দিলেন অসহায় মা- ছেলেকে। মা’র মনতো। অনেক কাতর অনুনয় বিনয় করলেন। কিন্তু মহাক্ষমতাধর প্রধান শিক্ষকের মন গলেনা। তার এককথা, আন্ডার এইজ শিক্ষার্থী তিনি ভর্তি করতে পারবেন না। এমনই মিথ্যাবাদী এই প্রধান শিক্ষক।
তার আইনে, বাচ্চাটির ৮ বছর পূর্ণ হবে জানুয়ারির ৩১ তারিখ। ২৯ দিন আগে তৃতীয় শ্রেণীতে সে ভর্তি হতে পারবেনা।
পরদিন বাচ্চাটির মামা ছুটে গেলেন ঐ স্কুলে। প্রধান শিক্ষকের পা ধরার বাকি রাখলেন তিনি। কিন্তু তবু পাথর নড়েনা। হেডমাস্টার ভর্তি করবেন না। অন্যত্র নিয়ে যেতে বললেন। হতাশাগ্রস্ত মা ও মামা ছুটলেন ম্যানেজিং কমিটির সদস্য সভাপতি ও সহ সভাপতির কাছে। কারো কাছ থেকে কোন ইতিবাচক কিছু পেলেন না। তার মামা জানালেন, দুঃখ কষ্ট লজ্জা আর অপমানে আমার বোন তার শিশু সন্তানটিকে নিয়ে আত্মহত্যার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন।
অবশেষে সিলেট প্রতিদিনের এ প্রতিবেদক তাকে কল দিয়ে কারণটা জানতে চাইলে তিনি জানান, এ তথ্য জানতে হলে তার স্কুলে যেতে হবে। ফোনে বলা যাবেনা। অনেক অনুরোধের পর তিনি ফোনটি রেখেদেন। কথা হয় গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে। তিনিও জানালেন, কেবলমাত্র বয়সের কারণে একটি শিশুকে ভর্তি করতে পারবেনা কেন? বিষয়টি আমি দেখবো।
এরপর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ডেকে নিয়ে বিনা বাক্যব্যয়ে ঐ প্রধান শিক্ষক শিশুটিকে স্কুলে ভর্তি করেন। শিশুটি আন্দিত। তবে ভর্তির আগের ৮/৯টা দিন তাকে অসহনীয় যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে। সে স্কুলে যেতে চায়, পড়তে চায়- এ নিয়ে মাকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলে। তার মা কোন সদুত্তর দিতে পারতেন না। কেবল ফেলতেন চোখের জল। মা ছেলে মিলে একে অন্যের গলায় ধরে কেবল কাঁদতেন। ডিভোর্সি মহিলা বলে এমনিতেই তিনি প্রায় ঘরবন্দি থাকতেন নানা জনের নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় বলে। আর ছেলের মুখেও যখন হতাশার ছায়া দেখতেন, তখন বারবার জীবনটাকে শেষ করে দেয়ার ইচ্ছে হতো। শুধুই কি ইচ্ছে- একদিন কীটনাশক পান করে মরার চেষ্টাও করেছিলেন বলে কাঁদতে কাঁদতে স্বীকারোক্তি দিলেন।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, কোন আইনে একজন অসহায় মহিলা ও তার সন্তান এবং পরিবারের সদস্যদের এমন মানসিক নির্যাতনের মুখে ফেললেন প্রধান শিক্ষক জয়নাল আবদিন। বাংলাদেশের আইনের বাইরে কি চলছে নালিউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়?
বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে সিলেট জেলার সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোকুল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, বয়স কোন বিষয়ই না। যেহেতু সে তার আগের স্কুল থেকে টিসি ( ট্রান্সফার সার্টিফিকেট ) নিয়ে গেছে, সেহেতু ৬/৮ মাস বা বছরও কম হলেও ভর্তি নিতে সমস্যা নেই। ৯ বছর বয়সে হাভার্ডের প্রফেসারের স্বীকৃতি অর্জন করতে পেরেছে একটা শিশু। এটি কেন তিনি করলেন- বুঝতে পারছিনা। এককথায়, বয়সের ব্যাপারে কোন বাধবাধকতা নেই।
শিশুটির আগের স্কুল ছিল গোলাপগঞ্জেরই বাঘার পালানডুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমেনা বেগম বলেন, ঐ শিক্ষার্থীকে আমি ট্রান্সফার সার্টিফিকেট দিয়েছি। বাচ্চা তার মা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের হয়রানির বিষয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি আসলে খুব দুঃখজনক। তবে প্রধান শিক্ষক কেন এমন করলেন- সে প্রসঙ্গে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে গোলাপগঞ্জের আমকুনা-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেলিম উদ্দিন বলেন, এমন কোন আইনী বাধবাধকতা আছে বলে আমি জানিনা। ট্রান্সফার সার্টিফিকেট যখন আছে তখনতো তাকে ভর্তি করে নেয়া উচিৎ ছিল।
বাচ্চাটির পরিবারের উপর এই প্রধান শিক্ষকের মানসিক নির্যাতনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি খুব দুঃখজনক। তিনিও আর কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে ঐ স্কুলে লেখাপড়া করছে এমন ৫/৭ জন শিশুর অভিভাবকের সাথে আলাপকালে জয়নাল আবেদিন বাচ্চাদের ক্ষতি করতে পারেন- এই ভয়ে কেউই মুখ খুলতে চাননি। তবে তাদের পরিচয় গোপন রাখা হবে- এমন শর্তে তারা বলেন, এই হেডমাষ্টারের ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ। নিজেকে তিনি অনেক বড় কিছু মনে করেন। টিইও-এটিইওদের তোষামোদ করে চলেন। তাই অভিভাবকদে সাথে তিনি সবসময় রূঢ় আচরণ করেন। কোন কাজে গেলে সহযোগীতাতো করেনইনা, উল্টো আরও নানা আজেবাজে মন্তব্য করেন।
সামাজিক কারণে শিশুটির পরিচয় গোপন রাখা হলো। উল্লেখ্য, শিশু ও তার পরিবারের সদস্যরা এখন উপবৃত্তির ব্যাপারে শঙ্কিত। তাদের মতে, বাচ্চাটি যাতে উপবৃত্তির আওতায় না এসে, প্রধান শিক্ষক এখন সেই চেষ্টা করবেন। কারণ, ভর্তির দিন তিনি স্পষ্ট বলেই দিয়েছেন- ভর্তি করলাম। উপবৃত্তি পাবে কি না জানিনা।
জয়নাল আবেদিনের এমন অন্যায় আচরণ ও নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিশুটির পরিবারের সদস্যবৃন্দসহ এলাকার সচেতন মহল।




এনামুল কবীর



