'রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই,
তোমার ভাষা আমার ভাষা,
বাংলা ভাষা বাংলা ভাষা।’
ভাষা আন্দোলনের এই মন্ত্রটির ওপর ভিত্তি করে সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউলরা বায়ান্নের ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ বাঙালির চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন। এই ধারাবাহিকতায় একাত্তরের সাত মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের- 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ -এবাণীর মাধ্যমে বাংলার অন্তিম সূর্য অর্জিত হওয়ার ইতিহাস রচিত হয়েছে। মহান ভাষা আন্দোলনের চেতনা বাঙালি সত্তায় মিশে আছে। বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয় এবং বাঙালির আত্মপরিচয় ও আত্মনুসন্ধানের প্রধান প্রতীক অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। এই ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত পথ ধরে এসেছে মহান মুক্তিযুদ্ধ। মাতৃভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির একটি গৌরবময় অধ্যায় এবং মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতিসত্তার মূলমন্ত্র।
একমাত্র বাঙালি জাতি ছাড়া পৃথিবীর কোনো জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দেয়নি। একুশে ফেব্রুয়ারি এবং মুক্তিযুদ্ধ এ দুটিই বাঙালির অহংকার এবং গৌরবের। আমাদের গৌরবময় এদুটি ঘটনার মধ্যে যেমন রয়েছে আনন্দ তেমনই রয়েছে অহংকার। সঙ্গে শোক ও বেদনার ইতিহাস। যার মধ্যে একটি ভাষা আন্দোলন; যা ১৯৫২ সালে আত্মত্যাগে হয়েছে আর অপরটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম; যা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে হয়েছে। আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে পাওয়া একুশ আর একাত্তর আমাদের অহংকারের, গর্বের। একাত্তরের সূচনা হয়েছিল বায়ান্নতে।
পূর্ব পাকিস্তানের সকল মানুষ ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষভাবে যোগ দিয়েছিল। একুশে ভাষার জন্য যুদ্ধ এবং একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধ ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য ছিল অধিকার ও স্বাধীনতার। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব বীজ রোপন করা হয়েছিল। এর ফসল ভাষা আন্দোলন। যা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা এবং তা ১৯৪৮ সালে প্রথম প্রতিবাদে হয়েছিল। পরে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রথম অর্জন হয়েছে এবং এরপর ধারাবাহিকভাবে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিরা অর্জন করেছে স্বাধীনতা।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে শহিদ হয়েছে বাংলাদেশের ভাষাপ্রাণ মানুষ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের প্রকৃত মূল ভিত্তি। এই রক্তাক্ত পথ বেয়ে বাঙালিরা স্বাধীনতা অর্জনের পথে এগিয়েছে। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে সূত্রপাত শুরু হয়েছে স্বাধীনতার যুদ্ধের। বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিজয় এবং অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রেরণার। এই একুশ ধারাবাহিক সাফল্যের জয় এবং অর্জনের মাধ্যমে আমাদের বাঙালির জাতীয় স্বত্তার পরিচয় সমৃদ্ধ করেছে। একুশ চিরঞ্জীব হয়ে আমাদের পথচলায় আমাদের জীবনে চেতনা বহন করেছে। বাঙালির জাতিসত্তার জাগরণের চেতনা দিয়েছে।
বাঙালি জাতির বিপ্লবী এই চেতনায় একাত্তরে পরিণত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ যা আমাদেরকে গৌরবময় স্বাধীনতা দিয়েছে। বাংলাদেশকে দুনিয়াব্যাপি বিকাশ করেছে বিপ্লবী বাঙালি হিসেবে। এজন্য আমার গর্ব হয়, আমি একুশকে নিয়ে অহংকার করি। একুশে ফেব্রুয়ারি এবং বাংলা ভাষাকে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। একুশের প্রেরণায় বাঙালি জাতির জনক স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ ঘোষণা করে বাংলাদেশকে গৌরবান্বিত করেছে।
বাংলাদেশে এই সময়ে নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু শেষ হওয়ার পথে। বছরের পহেলা দিন শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হচ্ছে। মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিকদের ক্রিকেট খেলায় বিরাট সাফল্যে বাংলাদেশের নাম বিশ্বের কাছে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশি দেশ মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে রাখাইন মুসলিম রোহিঙ্গা গোত্র যখন নিজ দেশের সরকার কর্তৃক নিপীড়ন হয়ে বিতাড়িত হয়েছে তখন খাদ্যে স্বয়ংস্বম্পূর্ণ বাংলাদেশ তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে এবং তাদের ভরণ পোষন ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে চলেছে।
একুশ কেবল আমাদের মুখের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেনি, দিয়েছে দেশপ্রেমের মহান আবেগ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জীবনবোধ। দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে এগিয়ে চলার শক্তি এবং আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে চেতনা বিকাশে একুশে ফেব্রুয়ারি প্রেরণা যুগিয়েছে সহস্র দিনের। প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার শোক ও বেদনার একুশ এখন আমাদের জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। সৃজনশীলতায় পরিণত হয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতীয় জীবনে অসামান্য অবদান রেখেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা হয়।
লেখক ও কথাসাহিত্যিক রচনা করেন সাহিত্য। কবি তার কবিতায় ফুটিয়ে তুলেন একুশের মর্ম কথা। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদক দেওয়া হয় এই একুশকে ঘিরে। একুশ আমাদের রক্তে রন্দ্রে মিশে যাওয়া প্রাণের স্পন্দন। একুশের গান আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশে উদ্ভুদ্ধ মন্ত্রের মতো প্রেরণাময়। এ গান আজ আমাদের কাছে এক প্রতিকী তাৎপর্যে উজ্জ্বল স্লোগান।
লাল কৃঞ্চচূড়ার ফাল্গুনের দিনে একুশ পালন করার জন্য শহিদ স্মরণে নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরি আর শহিদমিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি আমাদের চেতনার এক দীপ্ত মশাল। এই মশালের আলোতে আমরা আলোকিত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে পরিণত হয়েছি। ভাষা আন্দোলনের রক্তঝরা সংগ্রামী ইতিহাস একাত্তরের সংগ্রামী ইতিহাসের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কবির সত্ত্বায় প্রবহমান একুশের চেতনার প্রতিফলন। একুশে ফেব্রুয়ারি চেতনায় উদ্বুদ্ধ নতুন প্রজন্মের একুশের পটভূমিতে একুশের চেতনা অসামান্য প্রভাব ফেলে এই প্রজন্মের হৃদয়ে। একুশের অনির্বাণ চেতনা ও অপরিমেয় আত্মত্যাগের কাহিনী আমাদেরকে শিখিয়েছে ‘মাগো তোমার বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি'। একুশের গান ও কবিতা শুনলেই চোখের সামনে ভাসে- ভাইয়ের রক্তে রাঙা রাজপথ আর ছেলেহারা মায়ের অশ্রুভেজা নয়ন।
যুগ যুগ ধরে বাঙালির হৃদয়ে ভাষা আন্দোলন আর একুশের চেতনাকে জাগ্রত করেছে একুশের সংগ্রাম। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জীবনে একটি চেতনার অনির্বাণ ঘটে। একুশ বাঙালির জাতিসত্তার জাগরণের প্রথম আন্দোলন। এই চেতনায় একাত্তরে পরিণত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। অর্জিত হয়েছে আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা। বায়ান্নের একুশে ফেব্রয়ারি বাঙালির জাতিসত্তার জাগরণের চেতনা সৃষ্টি করেছে। একুশের পথ ধরে বাঙালি জাতি বিপ্লবী চেতনায় উন্মুখ হয়ে একাত্তরে শুরু করেছে মুক্তিযুদ্ধ। অর্জিত হয়েছে আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা, আমরা পেয়েছি বিজয়। এই ঐতিহাসিক অর্জন আমাদের বাংলাদেশকে দুনিয়ার কাছে বিকশিত করেছে।
এখন বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে উন্নয়নের মডেল এবং শান্তির দেশ হিসেবে পরিচিত। দেশাত্মবোধক গান, অসংখ্য গণসংগীত, কবিতা একুশকে ঘিরেই রচিত হয়। কবিকণ্ঠে প্রভাব পড়ে বেদনা, ক্ষোভ ও যন্ত্রণার ইতিহাস। এই প্রজন্ম ভুলেনি একুশের চেতনা। বাংলা কবিতার অঙ্গনে জন্ম দিয়েছে নিজেকে দায়বদ্ধ রেখে সমাজ সচেতনতায়। বাংলা সাহিত্যে প্রতি বছরে প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি ফাল্গুন কৃঞ্চচূড়া আর একুশের কথায়। ফুটিয়ে তুলেন বায়ান্নের শোষণ ও বঞ্চনার কথা। ভাবিয়ে তুলেন সমাজ ও মানুষকে, স্বদেশ ও বিশ্বকে নিয়ে স্বপ্ন দেখান মানব মুক্তির। কবিতায় ফুটে উঠে স্বদেশের রক্তাক্ত ছবি।
এখন আমাদের বাংলা সংস্কৃতিতে কবিতা হয়ে উঠেছে সংগ্রামের অন্যতম হাতিয়ার। ভাষার জন্যে আত্মদানের ভেতর দিয়ে সালাম, বরকত, রফিক, জববার দেশের মানুষের ভিতরে সজীব হয়ে উঠেছে। হিমালয়ের মতো বিশাল ইতিহাস পরিক্রমায় যেসব অবিনশ্বর স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে পাওয়া যায় এর ধারাবাহিকতায় অমর স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে দেখেছে তরুণ প্রজন্ম। একুশে ফেব্রুয়ারি সাহিত্য সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশে সৃষ্টি হয়েছে অনেক সুর, একুশ ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির বিচিত্র সুর। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশে উজ্জীবনীমন্ত্রের মতো প্রেরণাময়। একুশ আমাদের কাছে এক প্রতীকী তাৎপর্যে উজ্জ্বল। একুশের চেতনা বাংলা কবিতার অঙ্গনে জন্ম দিয়েছে সমাজ সচেতনতা। শোষণ ও বঞ্চনার কথা। সমাজ ও মানুষ, স্বদেশ ও বিশ্বকে নিয়ে, মানব মুক্তির স্বপ্ন এই একুশকে ঘিরে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।




আল-আমিন



