বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০১ পূর্বাহ্ন

শিশির ভেজা ভোরে চোখ জুড়ে যায় গোয়ালগাদ্দা শিমে

  • প্রকাশের সময় : ১৭/১২/২০২৪ ০৬:৩৫:০৭
এই শীতে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের ছবি: সিলেট প্রতিদিন
Share
84

শিশির ভেজা ভোরে লতানো গাছের দিকে তাকালে চোখ জুড়ে যাবে গোলাপি রঙের ফুল ও সবুজ সতেজ শিমে। মাঠের পর মাঠে মাচাংয়ে শোভা পাচ্ছে ফুল ও শিম। শীতের শুরু হতে না হতেই ক্ষেত থেকে শিম তুলে বাজারে বিক্রি করছেন চাষিরা। প্রচলিত শিম থেকে ব্যতিক্রম হওয়া বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে সিলেটের গোয়ালগাদ্দা শিমের। ৮ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার প্রস্থের গোয়ালগাদ্দা শিম খেতে সুস্বাদু। দেশের গন্ডি পেরিয়ে রফতানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। কৃষকরা আঞ্চলিক বাজারে নিয়ে এলে পাইকাররা সেখান থেকে ক্রয় করে বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেন।


কৃষকরা বলছেন-সঠিক সময়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে আরও বেশি শিম উৎপাদন সম্ভব। পাইকারি বাজারে শিমের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। কৃষি অধিদফতরের বিপণন বিভাগ থেকে মূল্য নির্ধারণ করলে বাজারে ন্যায্যমূল্যে শিম বিক্রি করে লাভবান হবেন বলে দাবি চাষিদের।


জানা যায়, ভাদ্র মাসের শেষের দিকে গোয়ালগাদ্দা শিমের বীজ রোপণ করা। পরে সার সেচ ও কীটনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে পরিচর্যা করে চারা গাছ একটু বড় হলে মাচাং তৈরি করে তিন মাসের মধ্যেই বিক্রি করার মতো হয়ে যায় শিম। অল্প সময়ে স্বল্প পুঁজি লাভজনক হওয়াতে সিলেটের গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় বিশেষ এ জাতের শিমের চাষ হয়ে থাকে। তবে বেশি চাষ হয় গোলাপগঞ্জ উপজেলা।


শুধু এ বছর গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ৭৪২ হেক্টর জমিতে শিম চাষ হয়েছে। স্থানীয় পুরকায়স্থ বাজার, চৌধুরী বাজার ও রাখালগঞ্জ বাজারে কৃষকেরা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে শিম বিক্রি করেন। সেখান থেকে পাইকাররা সরাসরি শিম সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে শিম প্রক্রিয়াজাত করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করে থাকেন।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সিলেট তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে সিলেট জেলায় ৪ হাজার ৩৯০ হেক্টর জমিতে গোয়ালগাদ্দা শিম চাষ হয়। উৎপাদন হয় ৫০ হাজার ৪৮৫ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৪ হাজার ২১০ হেক্টর জমিতে ৪৮ হাজার ৮৩৬ মেট্রিক টন শিম উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা।


গোলাপগঞ্জ উপজেলার মিরদারচক গ্রামের শিম চাষি বিকাশ মালাকার বলেন, তিন-চার মাস কষ্ট করে শিম চাষ করে বাজারে নিয়ে গিয়ে ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। কারণ বাজারে পাইকাররা সিন্ডিকেট তৈরি করে। আমাদের কাছ থেকে ৪০-৫০ টাকা কেজি ধরে কিনে নিয়ে গেলে ৭০-৮০ টাকা কেজি ধরে বিক্রি করেন। দিন-রাত অনেক কষ্ট করতে হয়।


লক্ষণাবন্দ ইউনিয়নের মুল্লা টিকর গ্রামের জয়নুল হক। কয়েক বছর আগে দেশে ফিরেছেন তিনি। এ বছর ৩৩ শতক জায়গায় গোয়ালগাদ্দা শিম চাষ করেছেন।


তিনি বলেন, ২০-২৫ ধরে আমরা শিম চাষ করে আসছি। গোয়ালগাদ্দা শিম ১০-১৫ বছর ধরে চাষ করে আসছি। চলতি বছর বৃষ্টির কারণে ফলন কম উৎপাদন হয়েছে। লাভ কিছু হবে। একেবারে লস হবে না।


একই এলাকার আব্দুছ ছামাদ। ৮ বছর সৌদি আরব ছিলেন। সেখান থেকে ২০ বছর আগে দেশে ফিরে আসেন। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন ধরনের শিম চাষ করে থাকেন।


আব্দুছ ছামাদ বলেন, যে পরিমাণ খরচাপাতি করেছি সে তুলনায় বাজার মূল্য অনেক কম। আমাদের এখানকার শিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়। সরকার থেকে সমান্য সার ও বীজ পেয়েছি। তাও সেটা অনেক দেরিতে দেয়া হয়। সরকার থেকে শিমের একটি নির্দিষ্ট দাম নির্ধারণ করে দিলে ভালো হয়। যদি পাইকারি ও খুচরা বাজারে শিমের দাম নির্ধারণ করা হয় তাহলে আমরা শিম চাষিরা লাভবান হবো।


রাখালগঞ্জ বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী রাসেল আহমদ বলেন, বাজারে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। আমরা এই বাজার থেকে শিম সংগ্রহ করে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেই। আগে থেকে অনেক সুযোগ-সুবিধা ভালো হয়েছে। দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশে রফতানি হওয়ায় গোয়ালগাদ্দা শিমের চাহিদা বাজারে অনেক বেশি।


তিনি বলেন, যদি সিলেট থেকে শিমগুলো বাইরের দেশে রফতানি করা যেতো তাহলে কৃষকের পাশাপাশি আমরাও লাভবান হতাম। কিন্তু আমাদের এখানে প্যাকিং হাউস না থাকায় রফতানি করা যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে বেশি ঢাকায় ঢাকা থেকে অন্যান্য দেশে রফতানি করতে হয়। গোয়ালগাদ্দা শিম মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন রফতানি হয়ে থাকে।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, সিলেটের উপপরিচালক খায়ের উদ্দিন মোল্লা বলেন, সিলেট অঞ্চলের কৃষকরা আগে গোয়ালগাদ্দা চাষ করতেন না। আমরা সবসময় কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে আসছি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রশিক্ষণ ও উদ্যোগের ফলে এ শিম নিয়ে তাদের উৎসাহ অনেকে বেড়েছে।


তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বন্যা ও বৃষ্টির কারণে এ বছর আবাদ কম হয়েছে। গোয়ালগাদ্দা শিম বেশ সম্ভাবনাময় এটি ইউরোপসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে রফতানি হচ্ছে। সিলেট থেকে সরাসরি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিম রফতানি করতে সরকার ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তাছাড়া কৃষকদের মধ্যে সঠিক সময়ে সার ও বীজ বিতরণ করা হচ্ছে।


সিলেট প্রতিদিন / এমএ


Local Ad Space
কমেন্ট বক্স
© All rights reserved © সিলেট প্রতিদিন ২৪
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরি