২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিগত এক বছরেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সেক্টরে চাঁদাবাজি, মব ভায়োলেন্স ও কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অন্য যেকোনও সময়ের তুলনায় সীমা ছাড়িয়েছে। চাঁদা না দেওয়ায় রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ভাঙারি পণ্যের ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯)। হত্যার আগে ডেকে তাকে নিয়ে যায় খুনিরা। পরে পিটিয়ে ও পাথর দিয়ে আঘাত করে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। হত্যার পর মৃতদেহের ওপরে লাফিয়ে উল্লাস করা হয়। এ ঘটনাটি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও জায়গা করে নেয়। তবে পুলিশ ও সরকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক উন্নতি হয়েছে এবং আরও উন্নতির দিকে যাচ্ছে। মব ভায়োলেন্সসহ অন্যান্য অপরাধও কমে আসছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুরো পুলিশ বাহিনীর স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সরকারবিরোধীদের ওপর দমন পীড়নে এমনিতেই মানুষ পুলিশের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। উপরন্তু, গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন করতে গিয়ে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে নারী, শিশুসহ প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-জনতা নিহত হন। গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। ফলে সরকার পতনের পর তীব্র গণরোষের ভয়ে দুই লাখের বেশি সদস্যের এই বাহিনীর প্রধান আইজিপি থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত বেশিরভাগ সদস্য গাঢাকা দেন। তিন দিন পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করার পর পুলিশকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর কার্যক্রম শুরু করা হয়। তখন সেনাবাহিনীর সহায়তায় পুলিশি কার্যক্রম চলে। বর্তমানে সারা দেশেই পুলিশের কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অনেক সক্রিয় ভুমিকা পালন করে যাচ্ছে পুলিশ বাহিনী। যদিও এখনও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সেনাবাহিনীও মাঠে রয়েছে।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরে সারা দেশে খুনের মামলা হয়েছে তিন হাজার ৮৩২টি। এরমধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে খুনের মামলা হয়েছে এক হাজার ৯৩৩টি। এর আগের ছয় মাসে মামলা হয়েছে এক হাজার ৮৯৯টি। তবে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ের এবং তারও আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের অনেক হত্যার মামলা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।
প্রধান উপদেষ্টার দফতরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া অপরাধ পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ১০ মাসে সর্বমোট মামলা হয়েছে তিন হাজার ৫৫৪টি। একই সময়ে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে দুই হাজার ১৩৬টি। একই সময়ে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৪৭৯টি। অস্ত্র, বিস্ফোরক, অপহরণ, ধর্ষণ, দাঙ্গা ও অন্যান্য অপরাধসহ সব মিলিয়ে সর্বমোট মামলা হয়েছে এক লাখ ৪৪ হাজার ৯৫৫টি।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের এক প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, এ সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২৯টি। কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ৬১ জনের। ১৬৫ জন সাংবাদিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১১টি। রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতের সংখ্যা ৬ হাজার ৩৯০ জন। এরমধ্যে নিহত হয়েছেন ২৩৩ জন। আহত হয়েছেন ৬ হাজার ১৫৭ জন। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৮৮ জন। গণপিটুনি বা মব ভায়োলেন্সে মৃত্যু হয়েছে ১০৮ জনের।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী এএসএম নাসির উদ্দিন এলান বলেন, সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলেও আগের তুলনায় পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। ৫ আগস্টের পর পুলিশ বাহিনীর যে ডিজাস্টারটা হয়েছে, সেই ট্রমা থেকে বের হতে তো একটা সময় লাগে। এরইমধ্যে এ বাহিনী অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছে। এখন যারা পুলিশের নেতৃত্বে আছেন— তারা অনেক দক্ষ। অনেকটা শূন্য থেকে পুলিশকে শুরু করতে হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে পুলিশের বিরুদ্ধে অপপ্রচারও আছে।
পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছরের জুলাইয়ে আমরা (পুলিশ) একটা ধাক্কা খেলাম। সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। পুরো এক বছরতো হলো। সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে সার্বিক অবস্থার উত্তরণ ঘটিয়ে এ অবস্থায় আসলো। এরমধ্যে আবার গত বছরের আন্দোলনে হাজারের ওপরে যে শহীদ হয়েছেন, সেগুলো নিয়ে হত্যা মামলা হয়েছে। এসব মামলা তদন্ত নিয়ে পুলিশের ওপর অনেক বড় চাপ গেছে। তারপরও সঠিক মামলাগুলোকে রেখে যাতে অন্যায়ভাবে কারও ওপর অবিচার না হয়, সেটাও দেখতে হয়েছে। ভুলভ্রান্তি নেই যে তা নয়, তারপরও পুলিশের ভালো উত্তরণ হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যখন আইনের শাসন থাকে না, তখন মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। মব ভায়োলেন্সও এখন নিয়ন্ত্রণে এসেছে।’
দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এ কথা অনস্বীকার্য— ৫ আগস্টের পর আমরা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছি। তবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, অন্তর্বর্তী সরকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের সব পর্যায়ের সদস্যদের আন্তরিকতার ফলে ধীরে ধীরে পুলিশের মনোবল ফিরে এসেছে। বর্তমানে পুলিশ সদস্যরা পেশাদারত্বের সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে পুলিশের সব পর্যায়ের সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতেও জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবে।’ তিনি বলেন, ‘আগের তুলনায় বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি যাতে আরও উন্নত করা যায়— সেই চেষ্টা অব্যাহত আছে।’ সবার সহযোগিতায় পুলিশ সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর ভুমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) শনিবার (২ আগস্ট) বলেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো রয়েছে। সাংবাদিকরা সত্য সংবাদ তুলে ধরলে এবং সহযোগিতা করলে আরও ভালো হবে।’ তিনি বলেন, ‘অপরাধী যেই হোক তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশ অনেকটাই স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে।’




প্রতিদিন ডেস্ক



