শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৪৬ অপরাহ্ন

সিলেটে টালমাটাল বিএনপি

  • প্রকাশের সময় : ০৫/০৩/২০২২ ১০:০৫:৪৬
এই শীতে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের
Share
10

রীতিমতো টালমাটাল অবস্থা বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির। অভ্যন্তরীন কোন্দল, গ্রুপিং, লবিং, সিলেট জেলা বিএনপির আহবায়ক, বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক এবং উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির প্রথম সদস্যের স্বাক্ষরে বিভিন্ন ইউনিয়নের কমিটি গঠন, বিবৃতি পাল্টা বিবৃতি, উপজেলার সকল ইউনিয়ন কমিটি বাতিল নিয়ে অস্থিত্ব সংকটে পড়েছে সিলেট জেলা বিএনপির নিয়ন্ত্রাধীন এ ইউনিট।

বৃহস্পতিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে সিলেট জেলা বিএনপি  ৫টি ইউনিয়নের উভয় গ্রুপের ৫টি করে মোট ১০টি কমিটি বাতিলের পর তৃণমূল বিএনপিতে আশার সঞ্চার হলেও এ নিয়ে কানাঘুষা চলছে পুরো উপজেলাতে।

বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপিতে  মুলত: দুটি গ্রুপ দীর্ঘদিন থেকে বিদ্যমান। বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপির আহবায়ক কামরুল হুদা জায়গীরদার, উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট জেলা বিএনপির সদ্যসাবেক উপদেষ্ঠা আতাউর রহমানের গ্রুপই মূল নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এছাড়াও ধাপে ধাপে আরো কয়েকটি উপ গ্রুপের সৃস্টি হয়েছে, যার জের ধরে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোও বহুধাপে বিভক্ত।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির অভ্যন্তরীন কোন্দল দীর্ঘ দিনের, যার শুরু ২০০৯ সালের  দলীয় কাউন্সিল থেকে। কাউন্সিলে তৎকালীন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বিপুল ভোটে সভাপতি পদে জয়লাভের তীব্র সম্ভাবনার মুখে তৎকালীন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য, নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম. ইলিয়াস আলী কাউন্সিল ছাড়াই বিশেষ বিবেচনায় কামরুল হুদা জায়গীরদারকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মনোনীত করেন।

সভাপতি হওয়ার পর তার বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকান্ড ও ইলিয়াস আলী বিরোধী গ্রুপের সাথে গোপন সমোঝতায় দলকে সঠিক পথে নেতৃত্ব না দেয়ার কারণেই মূলত ভাঙ্গন ধরে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে। তৈরি হয় জায়গীরদার বিরোধী বলয়।

এরপর দলটির পরবর্তী কাউন্সিলে  ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদীর লোনা জায়গীরদারকে আবারো দলের সভাপতি মনোনীত করেন। তখন তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন তৎকালীন বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপি'র সহ-সভাপতি  আব্দুন নুর চেয়ারম্যান।

এরপর থেকে বালাগঞ্জ বিএনপিতে সৃস্টি হয় নুর চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন আরও একটি উপ গ্রুপের। গ্রুপিং পাল্টা গ্রুপিংয়ের এক পর্যায়ে কার্যত বালাগঞ্জ বিএনপিতে কোনঠাসা হয়ে পড়েন কামরুল হুদা জায়গীরদার। তখনকার সময়ে দলটির কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচিও পালিত হয় আলাদাভাবে।

সবশেষে জেলা বিএনপির কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে কামরুল হুদায় জায়গীরদারকে আহবায়ক করে কমিটি ঘোষণা করা হলে বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতকে উপেক্ষা করে নিজের অনুগত আব্দুর রশিদকে আহবায়ক করে উপজেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণা দেন তিনি।

সেই কমিটিতে আহবায়ক প্রার্থী ছিলেন প্রবাসী গোলাম রব্বানী। সেখান থেকেই নতুন করে দ্বন্দ্ব শুরু হয় রশিদ-রব্বানীর। আহবায়ক হওয়ার পর রশিদ আহমদ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক টিম ও উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫টি ইউনিয়নে 'নিজের অনুসারীদের দিয়ে কমিটি গঠন করেন। 

এরপরই তৃণমূলে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। আর উপজেলা বিএনপি'র আহ্বায়ক আব্দুর রশিদ জেলা বিএনপির আহবায়ক কামরুল হুদা জায়গীরদারের বলয় ছেড়ে দিয়ে অন্য গ্রুপের সাথে আশ্রয় নেয়ায় বেঁকে বসেন জেলা বিএনপি'র আহবায়ক। এই ক্ষোভ থেকেই উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে পাল্টা কমিটি গঠন করেন পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা।

কমিটি- পাল্টা কমিটি হলেও দলের অনেক ত্যাগী, পরীক্ষিত ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা কোন কমিটিতে যান নি।

দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্রের মতে অভিযোগ উঠেছে, উপজেলা বিএনপি'র আহবায়ক নিজের বলয় ছেড়ে যাওয়ায় পরোক্ষভাবে এসব কমিটিতে ইন্দন দিয়েছেন জেলা বিএনপি'র আহবায়ক। আর এতে ব্যবহার করেছেন উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটিতে থাকা নিজের অনুসারী সদস্যদের। এরপর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে সিলট নগরীর একটি পেট্টোল পাম্পে বসে উপজেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণা দেন জেলা বিএনপির আহবায়ক। 

তীব্র অষোন্তষের মধ্যে দলটির হাইকমান্ডের নির্দেশক্রমে কমিটি গঠনের ২৪ ঘন্টার মধ্যেই এটি বাতিল করতে বাধ্য হয় জেলা বিএনপি। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির ১ম সদস্য সিরাজুজ্জামান খানকে সমোঝতার কথা বলে নগরীর একটি পেট্টোল পাম্পে নিয়ে 'ব্ল্যাকমেইল' করে ২৪ ফেব্রুয়ারীর তারিখ দিয়ে উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের বিদ্রোহী কমিটি বাতিল করে গণমাধ্যমে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠান।

এ ঘটনার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই সিরাজুজ্জামান খান তাকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছিল বলে জেলা বিএনপির আহবায়ক ও দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের কাছে চিঠি দিয়েছেন। এরপর ২ মার্চ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আব্দুর রশিদের স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডের দরুন তাকে শোকজ করে জেলা বিএনপি।

শোকজের পর গত বৃহষ্পতিবার(৩ ফেব্রুয়ারি) বেঁধে দেয়া ২৪ ঘন্টার মধ্যে শোকজের জবাব না দেয়ায় উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে কমিটি ও বিদ্রোহী কমিটিকে বাতিল করে জেলা বিএনপি। পরিস্থিতি সামাল দিতে যেকোন সময় ভেঙ্গে দেয়া হতে পারে উপজেলা বিএনপির কমিটি, এমন আবাসই পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন মারফতে।

বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আব্দুর রশিদের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, কমিটি গঠনের পর থেকে জেলা বিএনপির আহবায়কের কথামত তৃণমূলের নেতাকর্মীদের উপক্ষো করে ৫টি ইউনিয়নে কমিটির অনুমোদন দেন তিনি। এর পর জেলা বিএনপির আহবায়কের নিজ ইউনিয়ন বোয়ালজুড় ইউনিয়ন বিএনপির কমিটি নিয়েই দেখা দেয় বিপত্তি। কারণ সিলেট জেলা বিএনপি'র আহ্বায়ক কামরুল হুদা জায়গীরদার এবং উপজেলা বিএনপির কাউন্সিলে সম্ভাব্য চারজন সভাপতি পদপ্রার্থীর বাড়ি একই ইউমিয়নে। এই ইউনিয়নে জেলা বিএনপির আহবায়কের কথামত

কমিটি ঘোষনা করলে দলটিতে চরম বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে। এর পরই জেলা বিএনপি আহবায়ক আব্দুর রশিদকে চাপে ফেলতে সিরাজুজ্জামান খানকে ব্যাবহার করে ৫টি ইউনিয়নের বিদ্রোহী কমিটি  করান।

পরিচয় গোপন করার শর্তে সিরাজুজ্জামান খানের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, তাকে সভাপতি করার প্রতিশ্রুতিতে ৫টি ইউনিয়ন বিএনপির বিদ্রোহী কমিটিতে স্বাক্ষর করান জেলা বিএনপির আহবায়ক। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে প্রবাসী গোলাম রব্বানীকে সভাপতি করতে মরিয়া হয়ে উঠেন। আর এতে 'বলির পাঠা' বানান সিরাজুজ্জামান খানকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা বিএনপির তৃণমূলের কয়েকজন নেতাকর্মীরা জানান, দীর্ঘ দিন থেকে বিএনপি ক্ষমতার বাহিরে রয়েছে। এখন দলকে শক্তিশালী করতে গ্রহনযোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন।আমরা কোন প্রবাসীকে উপজেলার সভাপতি হিসেবে মেনে নিব না। আর এক্ষেত্রে তৃণমূলের প্রথম পছন্দ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট জেলা বিএনপির সদ্য সাবেক উপদেষ্ঠা আতাউর রহমান। দলের অস্থিত্বকে ফিরিয়ে আনতে, সকল গ্রুপকে একত্রিত করতে, সর্বপরী একটি সার্বজনীন বিএনপি গড়তে এই মুহুর্তে আতাউর রহমানকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে অথবা তার মত ত্যাগী নিঃস্বার্থ যেকোনো ব্যক্তিকে দেয়া হোক।কিন্তু কোন প্রবাসীকে যেন কমটিতে না আনা হয়।

বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির ১ম সদস্য সিরাজুজ্জামান খান বলেন, যা হবার হয়েছে, এসব বিষয় নিয়ে আমি মিডিয়ায় কথা বলতে চাই না। এখন বিষয়টি হাইকমান্ড দেখবে।

বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক রশিদ আহমদ বলেন, আমাদের সমস্যা চলছে ঠিকই, তবে দু-একদিনের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে সিলেট জেলা বিএনপির আহবায়ক কামরুল হুদা জায়গীরদারকে কল দেয়া হলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে মুঠোফোনের লাইন কেটে দেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক এমপি কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন সিলেট প্রতিদিনকে বলেন,বালাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির কমিটির বিষয়টা কেন্দ্রের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।উপজেলার প্রথম সদস্য কমিটি অনুমোদন করতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,কেউ অগঠনতান্ত্রীক কিছু করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন সিলেট প্রতিদিনকে জানান, সবাইকে নিয়ে সমোঝোতার মাধ্যমে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।আহবায়ক কমিটির যে সদস্য কমিটি ঘোষণা করেছেন তাকে অবশ্যই আমরা শোকজ করে কারণ জানতে চাইবো।সন্তোষজনক উত্তর না পেলে তার বিরুদ্ধে আমরা সাংগঠনিক যেকোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো।

আর যে উপজেলায় এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে সেটিও আমরা দেখছি।


সিলেট প্রতিদিন / ইকে


Local Ad Space
কমেন্ট বক্স