এনামুল কবীর :: গোলাপগঞ্জের শিশু শিক্ষার্থী, তার মা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মানসিক নির্যাতনকারী সেই প্রধান শিক্ষক জয়নাল আবেদিনের পক্ষে ধানাই-পানাই শুরু হয়েছে। তাও আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। যথা নিয়মে যথা স্থানে প্রতিবাদ না করে তারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন। এমনকি তারা সিলেট প্রতিদিনের মতো একটা প্রথম শ্রেণীর গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে মিথ্যার বেশাতি চালিয়েছেন। এ নিয়ে গোটা উপজেলার সচেতন মহলে সমালোচনার পাশাপাশি হাসাহাসিও চলছে।
ঘটনা গত জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের। গোলাপগঞ্জেরই একটি স্কুল থেকে তৃতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়া এক শিক্ষার্থী ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে ভর্তি হতে গিয়েছিল ভাদেশ্বর নালিউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শিশুটির সাথে ছিলেন তার মা। প্রধান শিক্ষক জয়নাল আবেদিন তাকে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি করেন। তার মা এর কারণ জানতে চাইলে জয়নাল জানান, ওর বয়স কম। আন্ডার এজ। এ অবস্থায় তিনি তাকে ভর্তি করতে পারবেন না।
শিশুটির মা বার বার অনুনয় বিনয় করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর ঐ শিশুর মামাও দু’দিন তার কাছে অনুনয় বিনয় করে ব্যর্থ হয়েছেন।
এরপর শিশুটির পরিবারের সদস্যরা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মিসবাহ উদ্দিনসহ অন্যান্য সদস্যদের সাথে আলাপ আলোচনা, অনুরোধ করলেও কোন লাভ হয়নি। প্রধান শিক্ষকের একই কথা, আন্ডার এজ শিশুকে তৃতীয় শ্রেণীতে তিনি ভর্তি করতে পারবেন না।
শিশুটির বয়স ৩১ জানুয়ারি ৮ বছর পূর্ণ হবে। মাত্র ২৯ দিন কম হওয়ায় জয়নাল আবেদিন তাকে ভর্তি না করায় ঐ শিশু, তার মা ও পরিবারের সদস্যরা অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করছিলেন। এ অবস্থায় ঘটনা জানতে পারেন এই প্রতিবেদক। সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথাও বলেন। পরে ১২ জানুয়ারি ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মিছবা বাচ্চাটিকে সংবাদ দিয়ে নিয়ে ভর্তি করিয়ে দেন।
পুরো ঘটনা নিয়ে গত ৭ ফেব্রুয়ারি সিলেট প্রতিদিনে এই প্রতিবেদক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সেই প্রতিবেদনে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্যও ছিল। আন্ডার এজ সংক্রান্ত কোন আইনই নেই বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তোলপাড় শুরু হয়। কঠোর সমালোচনা করেন ভাদেশ্বর এলাকা ও নালীউরির সচেতন মানুষ। তারা প্রধান শিক্ষককেও আক্রমন করে মন্তব্য করেন।
তেমনই একজন ফেসবুক ব্যবহারকারীর মন্তব্য, ‘জানিনা ঘটনা কতটুকু সত্য। তবে আমাদের স্কুলে এমন ঘটনা ঘটবে তা কল্পনার বাহিরে। উনি এর আগে আরও অনেকবার সমালোচনায় এসেছেন।’
মানে, প্রতিবেদকের প্রতিবেদনটি যে মোটেও অসত্য নয়, সত্য- তার প্রমাণ ঐ মন্তব্য।
এদিকে ঐ প্রতিবেদন প্রকাশের প্রায় এক সপ্তাহ পর গোলাপগঞ্জ টিচার্স ক্লাব নামক একটি সংগঠন থেকে ফেসবুকে ‘মিথ্যা সংবাদ প্রকাশে গোলাপগঞ্জ টিচার্স ক্লাবের নিন্দা’ শীর্ষক কয়েক লাইনের একটি লেখা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদকের ফেসবুক আইডিতে ব্যবহৃত ছবি ব্যবহার করে প্রকাশ করা ঐ নিন্দায় তারা প্রথম প্যারায় ভুল বাক্য প্রয়োগ করেছেন। তাদের সেই বাক্যটি কয়েকজন বাংলার অধ্যাপককে দেখালে তারাও এর ভাষা আর বাক্য গঠনের ত্রুটি নিয়ে হাসাহাসি করেছেন। এমনই এক অধ্যাপকের মন্তব্য, এদের নিয়েই চলছে প্রাথমিক শিক্ষা!
শুধু তাই নয়, ঐ নিন্দায় জয়নাল আবেদিনের ঘনিষ্ঠজন হিসাবে পরিচিত মিফথা উদ্দিন নামক একজন ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন ‘সুনামধন্য’ লিখে! সেটা জয়নাল আবেদিনের নামের আগে ব্যবহার করেছেন তিনি।
তাদের এমন স্ট্যাটাস পড়ে চলছে তীব্র সমালোচনা ও হাসাহাসি। এর আরও কারণ আছে। তা হচ্ছে, তারা গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ কিভাবে করতে হয়, তা জানেন না। আর তাই ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ ( ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ) হতে চললেও সিলেট প্রতিদিনে কোন প্রতিবাদ পাঠাতে পারেন নি। কেবলমাত্র ফেসবুকে নিন্দা জানিয়েছেন। তাও আবার সংবাদটি মিথ্যা উল্লেখ করে। কিন্তু সেটি কিভাবে মিথ্যা? প্রকৃত সত্যটাইবা কি? তার কোন ছিটেফোটা উল্লেখও নেই তাদের সেই লেখায়। এমনকি তারা এই প্রতিবেদকের নামের বানানেও ভুল করেছেন। এমনই তাদের সামর্থ্য ও শিক্ষাদীক্ষা!
এ অবস্থায় এমনসব বড়বড় ভুলে ভরা প্রতিবাদহীন ফেসবুকীয় নিন্দায় অন্য একটি মহলের ধারনা, প্রতিবাদটি সত্যিই গোলাপগঞ্জ টিচার্স ক্লাবের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে, না কেউ ক্লাবের নাম ব্যবহার করে জয়নাল আবেদিনের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করছে, তাও খতিয়ে দেখার বিষয় ( প্রক্রিয়া চলছে)।
প্রধান শিক্ষক জয়নাল আবেদিন ছাড়াও এখন সমালোচনার পাত্র স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মিসবাহ উদ্দিন। যে প্রতিবেদনের ফেসবুকীয় নিন্দা জানানো হয়েছে, সেই প্রতিবেদন প্রকাশের আগে বিষয়টি নিয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি প্রথমেই জবাব দিয়েছিলেন, শিশুটিকে ভর্তি করা হয়েছে যখন তখন আর এসব নিয়ে জিজ্ঞেস করা কেন?
প্রতিবেদক কোন আইনে ভর্তি করা হয়নি আর কোন আইনে হলো- এটা জানতে চাওয়া হচ্ছে বলে জানান। এতে ঐ শিশু ও তার পরিবারের সদস্যরা মানসিক নির্যাতন ও অযথা হয়রানির স্বীকার হয়েছেন বললে তখন তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ভর্তির বিষয়টি আমার এখতিয়ারে পড়েনা। প্রধান শিক্ষকের এখতিয়ারে পড়ে। আমি জানিনা।
অথচ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে কথা বলার পর তিনিই শিশুটিকে ডেকে নিয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন। সমালোচকদের বক্তব্য, তিনি জয়নাল আবেদিনের ‘তল্পিবাহক’ হিসাবে কাজ করছেন। নইলে প্রধান শিক্ষককে অনুরোধ করার পর যখন তিনি ফিরিয়ে দিলেন, এরপর ১২ জানুয়ারি ডেকে নিয়ে তিনিই আবার ভর্তি করিয়ে দিবেন কেন? আর একজন পেশাদার সাংবাদিক কার কাছ থেকে তথ্য পেয়েছেন, তা প্রকাশের জন্য বারংবার অনুরোধই বা করবেন কেন?
তাছাড়া বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি একটি সভা আহ্বান করে, শিশুটির পরিবারের কাছে গেছেন, তারা সাংবাদিককে চিনেন কি না, তার সাথে কথা বলেছেন কি না, ইত্যাদি প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু কেন বাচ্চাটি ও তার পরিবারের সদস্যদের হয়রানি ও নির্যাতন করেছেন প্রধান শিক্ষক? কোন আইনে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল- সে বিষয়ে কোন কথাই বলেন নি। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নালিউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মিসবাহ উদ্দিনের ব্যক্তিগত আইটি থেকে শেয়ার করা একটি পোস্টে শিশুটির পরিবারের সদস্যরা সাংবাদিককে চিনেন কি না, কথা বলেছেন কি না- ইত্যাদি জিজ্ঞেস করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। ঐ পরিবারটি নেহায়েত দুর্বল ও সহজ সরল বলেই তারা এমন স্পর্ধা দেখানোর সাহস পেয়েছেন বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। নইলে একটি শিশু ও তার পরিবারকে হয়রানির অভিযোগে আগে তারা প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত করতেন বা কথা বলতেন বলে মন্তব্য তাদের।
পোস্টে মূল ঘটনা অত্যন্ত চতুরতার সাথে ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা করেছেন মিসবাহ। আর নেপথ্যে ছিলেন প্রধান শিক্ষক জয়নাল। তারা সত্যকে পাশ কাটিয়ে মিথ্যার বেশাতির মাধ্যমে কিছু ফেসবুক ব্যবহারকারীর বাহবা কুড়িয়েছেন । তাদের এই চতুরতাও প্রত্যক্ষ করছেন গোলাপগঞ্জের সচেতন মানুষ।
তাদের মতে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের নিন্দা ফেসবুকে জানানোর আগে গণমাধ্যমেই জানাতে হয়। তা না করে গণমাধ্যমকে পাশ কাটিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নিন্দা বা প্রতিবাদ স্রেফ কাপুরোষোচিত। ফেসবুকীয় নিন্দা বা প্রতিবাদের আগে প্রধান শিক্ষক কেন শিশুটিকে ভর্তি করেন নি- তার জবাব আদায় করা দরকার। বাচ্চাটির বয়স মাত্র ২৯ দিন কম হওয়ায় শিশু বয়সে তার উপর যে মানসিক নির্যাতন হলো তার দায় প্রধান শিক্ষকের। শিশুটির দোষ কোথায়?
তাদের বক্তব্য, বাচ্চাটির পরিবারের সদস্যদের অযথা হয়রানি ও মানসিক নির্যাতন করার কারণে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়া উচিৎ গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ স্কুল ম্যানেজিং কমিটি এবং সচেতন এলাকাবাসীর।
এ প্রসঙ্গে গোলাপগঞ্জের একজন সচেতন ব্যাক্তি মনিরুল ইসলাম (৩৬) বলেন, যাচ্ছে তাই শুরু করেছেন ঐ হেডমাস্টার আর তার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। নইলে আগে বাচ্চাটির পরিবারের কাছে তারা ক্ষমা চাইবেন, দুঃখ প্রকাশ করবেন- সেটাই ছিল স্বাভাবিক। তা না করে তারা এমনটি করবেন কেন? আর বাচ্চাটি একটি সরকারি স্কুল থেকে টিসি নিয়ে গেছে। তাইনা? আর ৮ বছর না হলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া যাবেনা- এমন আজগুবি আইন ওরা কোথায়ইবা পেলেন?
উল্লেখ্য, জয়নাল আবেদিন এতই প্রভাবশালী যে, তার বিরুদ্ধে এতসব অভিযোগ সিলেটের একটি প্রথম সারির গণমাধ্যমে প্রকাশ হলেও উপজেলা বা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে এখনো কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা উদ্যোগী হবেন বলেই প্রত্যাশা তাদের।




এনামুল কবীর



