মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৫ অপরাহ্ন

টিসিবির পণ্য: এবার ভোটের মতো ক্রেতার হাতে কালি

  • প্রকাশের সময় : ০৭/০৩/২০২২ ১২:১৪:০৯
এই শীতে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের
Share
14

তপ্ত রোদ্দুর। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১২টা। রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বিজয় সরণির পাশে কলমীলতা বাজারের সামনে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্যবাহী ট্রাক এসে থামল। আগে থেকেই ছিল জটলা। মুহূর্তেই ট্রাক ঘিরে শুরু হয়ে যায় ধাক্কাধাক্কি। এমন প্রেক্ষাপটে ক্রেতাদের সামাল দিতে ট্রাকের বিক্রয়কর্মী সবাইকে সারিবদ্ধ হতে বললেন।

পরে লাল রঙের অমোচনীয় কালি দিয়ে ক্রেতার হাতের তালুতে ১, ২, ৩ ক্রমিক নম্বর লিখে দেন। উদ্দেশ্য ছিল দুটি, ক্রমিকের বাইরে কেউ যেন পণ্য না কিনতে পারেন; এক ক্রেতা দ্বিতীয়বার যাতে সারিতে না দাঁড়ান। কেউ যেন জাল ভোট দিতে না পারেন, সে জন্য ভোট দেওয়ার পর সাধারণত ভোটারের আঙুলের মাথায় অমোচনীয় কালি দিয়ে দাগ দেওয়া হয়। সেই কালি উঠল এবার টিসিবির ক্রেতাদের হাতে। তবে এই নম্বর লিখেও কাজ হয়নি। অনেক ক্রেতা সিরিয়াল ভেঙে সারিতে ঢোকার চেষ্টা করলে ট্রাকটি সেখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে তেজকুনীপাড়ায় বিজয় সরণি ফ্লাইওভারের নিচে চলে যায়।

জায়গাটি স্থানীয়দের কাছে 'ফকিরনি বাজার' নামে পরিচিত। এতেও হাল ছাড়েননি ক্রেতারা। কেউ রিকশায়, কেউ বা হেঁটে ট্রাকের পেছন পেছন ছুটতে থাকেন। হাতে নম্বর লেখা কলমীলতা বাজারের সেই ক্রেতারা তেজকুনীপাড়ার ওই এলাকায় যাওয়ার আগেই ট্রাকটি ঘিরে ধরে কয়েকশ মানুষ। এখানে এসেও ট্রাকটি ক্রেতার চাপে পড়ে। ক্রেতারা নিজেদের হাতে লেখা সিরিয়াল নম্বর দেখিয়ে পণ্য দেওয়ার জন্য বিক্রয়কর্মীদের অনুরোধ করেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে এক পর্যায়ে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে গিয়ে কমিশনের সহায়তা চান বিক্রয়কর্মীরা। পরে স্থানীয় কয়েকজনের চেষ্টায় ক্রেতাদের সারিবদ্ধ করা হয়। গতকাল তেজগাঁওয়ে টিসিবির পণ্য কিনতে আসা ক্রেতাদের মধ্যে দেখা গেছে এমন লড়াইয়ের ছবি।

একই রকম ঘটনা দেখা যায় উত্তর সিটি করপোরেশনের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের হাবুলের পুকুরপাড়েও। সেখানেও কয়েকশ মানুষ আসার পর তাদের হাতে কালো কালি দিয়ে নম্বর দেওয়া হয়। তেজকুনীপাড়ায় টিসিবির পণ্য বিক্রি করা ডিলার হাসমত বলেন, গাড়ি থামানোর সঙ্গে সঙ্গে কয়েকশ মানুষ ভিড় করেছে। এ কারণে ক্রেতাদের হাতে ক্রমিক নম্বর দেওয়া হয়েছে।

হাবুলের পুকুরপাড়ে পণ্য বিক্রি করতে আসা স্বপ্না এন্টারপ্রাইজের ট্রাকের বিক্রয়কর্মী শাহ আলম বলেন, ক্রেতারা হুড়োহুড়ি করে। লাইন ধরা নিয়ে ঝামেলা পাকায়। সে কারণে সিরিয়াল লিখে দেওয়া হয়েছে। তবে এতেও কাজ হয়নি। ক্রেতারা দুই থেকে তিন সারি করে ফেলছে। তবে হাতে ক্রমিক নম্বর পেলেও অনেক ক্রেতা পাননি টিসিবির পণ্য। ক্রেতা রাহেলা বেগম রাজধানীর মণিপুরিপাড়া থেকে প্রথমে কলমীলতা বাজার, পরে টিসিবির ট্রাকের পেছন পেছন ছুটে আসেন তেজকুনীপাড়ায়। এসেই কয়েকশ মানুষের পেছনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ান। তার সামনে যখন ৩০ থেকে ৪০ জন, তখন শুনতে পান পণ্য শেষ। হতাশ হয়ে তিনি বলেন, 'এত কষ্ট করে এলাম। রিকশা ভাড়াও গেল। কিছুই কিনতে পারলাম না।' হাতিরপুল বাজারের পাশে টিসিবির পণ্য বিক্রি করেছে লাভলী এন্টারপ্রাইজ। সেখানে বিক্রি যখন শেষ, তখনও ৬০ থেকে ৭০ জন নারী-পুরুষ পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরেছেন।

গৃহকর্মী হাবিবা বলেন, 'রোদের মধ্যে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।' একজন ক্রেতা ১১০ টাকা দরে এক লিটার সয়াবিন তেল, ৫৫ টাকায় এক কেজি চিনি, ৬৫ টাকায় মসুর ডাল ও ৩০ টাকায় এক কেজি পেঁয়াজ পাচ্ছেন। জনপ্রতি দুই লিটার সয়াবিন, দুই কেজি করে চিনি, মসুর ডাল ও পেঁয়াজ কেনার সুযোগ রয়েছে। একজন ক্রেতা ৫১০ টাকায় এই পণ্যগুলো কিনতে পারেন। তবে বাজারে বর্তমানে প্রতি লিটার সয়াবিনের দাম ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা, চিনির কেজি ৮০ টাকা, ডালের কেজি ১০০ থেকে ১৩০ টাকা এবং পেঁয়াজের কেজি ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সে হিসাবে দুই কেজি করে বাজার থেকে কিনতে ক্রেতাকে খরচ করতে হয় ৮১০ থেকে ৯১০ টাকা। টিসিবির পণ্য কিনলে একজন ক্রেতার সাশ্রয় হয় ২৯০ থেকে ৩৯০ টাকা। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, 'হয়তো বা একজন যেন বারবার নিতে না পারে, সে জন্য এই ক্রমিক নম্বর দিয়েছেন বিক্রয়কর্মীরা।' ঢাকার বাইরে কার্ডের মাধ্যমে পণ্য দেওয়ার উদ্যোগটি ভালো।

তবে টিসিবির উচিত স্থানীয়ভাবে পণ্য সংগ্রহ না করে নিজ উদ্যোগে আমদানি করা। এতে স্থানীয় বাজারে পণ্যের সরবরাহ ঠিক থাকবে। গতকাল থেকে শুরু হওয়া টিসিবির পণ্য ঢাকা মহানগরে প্রতিদিন ১৫০টি ট্রাকের মাধ্যমে বিক্রি চলবে। প্রথম দফায় এই বিক্রি কার্যক্রম চলবে ২৪ মার্চ পর্যন্ত। দ্বিতীয় ধাপে ২৭ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বিক্রি হবে পণ্য। তবে বিক্রি বন্ধ থাকবে শুক্রবার।


সিলেট প্রতিদিন / এসএ


Local Ad Space
কমেন্ট বক্স