গ্রামে মধুর কন্ঠে কুরআন শরীফ তেলাওয়াতে মূখরিত হওয়া মক্তবখানা গুলো দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। ফজর নামাজের পর ভোর বেলা শিশু কিশোর ছাত্র-ছাত্রী কুরআন শিখতে আসতো স্থানীয় মক্তবখানা গুলোতে ।
মক্তবে শিক্ষা দেয়া হতো পবিত্র কুরআন শরীফ, কুরআন শরীফের শিক্ষার জন্য আরবী অক্ষর জ্ঞান কায়েদা ছিপারা । পাশা-পাশি থাকতো নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাতের মসলা-মসায়েল শিক্ষা, ওযু-গোসল, পাক পবিত্রতা অর্জনের দোয়া, জানাযার নামায, ঈদের নামায, বিবাহ-শাদীর নিয়ম কানুন, মাতা-পিতার প্রতি কর্তব্য ও বড়দের সম্মান, ছোটদের স্নেহ আদব, আখলাকের শিক্ষা অনুশীলন ।
এখানে মেয়েদের পর্দা ব্যবহার, পুরুষের ফরজ ও ওয়াজিব সম্পর্কে একজন শিশু তার বয়সের দশ বছরের মধ্যে কুরআন, নামায, দোয়া-দরুদ শিক্ষা সম্পর্কে ধারণা ও শিক্ষা গ্রহণ করতো। মানুষে মানুষে একটা আদব আখলাক চরিত্র সমাজে বিদ্যমান ছিল। ছোট-বড় মান মর্যাদা ছিল। বড়জন ছোটজনকে স্বেহ আর ছোটরা বড়দের দেখলে সম্মান করতো। তখন মক্তব শিক্ষায় সমাজে সেটা বাস্তবায়ন ছিল।
যুগ ও কালের পরিবর্তনে মক্তব শিক্ষা এখন নাম মাত্র পর্যায়ে চলে আসছে। এলাকার প্রতিটি ঘরের মুষ্টিচাউল ও সামর্থবান লোকদের মাসিক চাঁদার মাধ্যমে মসজিদ কমিটির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো এ মক্তব শিক্ষা। মক্তবের হুজুর হতেন মসজিদের ঈমাম। তিনি ইমামতির পাশাপাশি মকতবের ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিক শিক্ষা দিতেন।
খুব অল্প বেতনেই মসজিদের ইমামগণ মকতবে পড়াতেন। তাঁদের এ শিক্ষায় শিক্ষার ভীত মজবুত হতো। সন্তান কে ভোরে ঘুম থেকে ডেকে দিয়ে মুখ হাত ধূয়ে দিয়ে মাথায় টুপি পাঞ্জাবী পড়িয়ে দিয়ে কুরআন শিক্ষার জন্য পাঠাতো সন্তানের অভিবাকরা ।
এখন আর সন্তানদের বলেনা অভিবাবক সকালে কোরআন পড়তে যেতে হবে,অনেকেই বাসা অথবা বাড়িতে ইমাম রেখে কোরআন শিক্ষা দিচ্ছেন। এক সময় বাংলার ঐতিহ্য ছিল কুরআন শুদ্ধ করে জানে এমন একটি মেয়েই হবে ঘরনী। যাতে বাড়ীঘর কুরআন শব্দে বরকতময় হয়ে উঠে। এখন সেই ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে ।
ভোর হলে রাস্তার পাশ দিয়ে লাইন ধরে ধরে পবিত্র কোরআন শরিফ ও কায়দা বুকে নিয়ে হাটতে দেখা যায় না তা ছাড়া আগের মত এখন আর কঁচিকাঁচা শিশুদের কুরআন শিক্ষার জন্য মক্তবে যেতে দেখা যায় না।কালিমা আর আলিফ, বা, তা এর শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেনা জনপদ।
গোলাপগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও মকতবখানা গুলো রক্ষণা-বেক্ষণের অভাবে এমনিতেই বন্ধ হয়ে গেছে। আবার কোথাও কোথাও যা-ও চালু আছে, সেগুলোতেও আগের মতো জৌলুস নেই। শিশুদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। নামে মাত্র চলে এসব কোরআন শিক্ষার পাঠশালা।
কয়েকজন ইমাম সাহেবের সাথে মক্তবের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, বিভিন্ন অযুহাত দেখিয়ে এখন অভিবাবকেরা কঁচিকাঁচা শিশুদের মক্তবে পাঠাতে চান না। বেশিরভাগ শিশুরা সকালে ঘুম থেকে উঠেই স্কুলে কোচিং অথবা কিন্ডার গার্টেনে ক্লাসের সময় হয়ে যায়।
সরজমিনে ঘুরে দেখাগেছে এখনো উপজেলার উল্লেখ যোগ্য কয়েকটি গ্রাম অঞ্চলে মসজিদে গিয়ে দেখা যায়, মসজিদের বারান্দায় মাত্র কয়েকজন কঁচিকাঁচা শিশু কোরআন পাঠে ব্যস্ত। অথচ এক সময় এই মসজিদ-গুলোতে দৈনিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলো প্রায় অর্ধ শতাধিক এমনটাই জানালেন মসজিদ কমিটির সদস্য ও ইমাম সাহেবরা।
বর্তমানে মক্তব কার্যক্রম প্রায় বিলুপ্তির পথে। অনিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন কিন্ডার গার্টেন এ শিশুদের শিক্ষাদানের কারনে মকতব হারিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ইসলামী বুনিয়াদি শিক্ষার এ অবারিত ও ঐতিহ্যগত প্রতিষ্ঠান চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে, পরিণত হতে পারে অতীত ইতিহাসে।




প্রতিদিন প্রতিবেদক



