রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৫৯ অপরাহ্ন

‌'পালকি চলে দোলকি চালে': হারানো ঐতিহ্য

  • প্রকাশের সময় : ২৭/০২/২০২২ ১১:০১:৪৪
এই শীতে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের
Share
13

সাজলু লস্কর :: মাত্র কয়েক যুগ আগের কথা। দেশের সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তখন এতটা ভালো ছিলনা। জেলা সদরগুলোর অবস্থা যেমন তেমন, অনেক উপজেলা সদরের রাস্তাঘাটের অবস্থাও ছিল নাজুক। আর গ্রামাঞ্চলের অবস্থাতো বলাইবাহুল্য। গাড়ী চলবে কি, অনক গ্রামে পায়ে হাটার রাস্তাও ছিলনা। 

না থাকলে বিয়ে-শাদীতো আটকে  থাকবেনা। আটকে থাকবেনা ধনী মানুষের যাতায়তও। থাকার কথাওনা। তখন আজকালের মতো বর গাড়ীর বহর নিয়ে যেতেন না। যেতেন মানববাহিত এক যানে। তার নাম পালকি। 

কনের বাড়ি অনেক দূরে হলে কিছু অবস্থা সম্পন্ন বরের জন্য থাকতো লঞ্চের ব্যবস্থা। আর দরিদ্রদের জন্য ছাউনি নৌকা। তবে নৌ-যান যাই হোকনা কেন, সেটিকে সাজানো হতো কাগজের ফুল দিয়ে। কাজটি করতো শিশুরা। তারা দলবেঁধে হই-হুল্লোড় করতে করতে রঙবেরঙের কাগজ দিয়ে তৈরি করতেন ফুল। তাদের নেতৃত্বে থাকতেন বড় কেউ। সেই ফুলে সাজানো হতো নৌযান। 

তবে নৌযানে উঠার আগে বর বাড়ী থেকে বের হতেন পালকি চড়ে। পালকি হচ্ছে, কাঠের তৈরি ছোট্ট কুঁড়ে ঘরের মতো বহনযোগ্য একটি যান। একজনের বেশি সেটিতে বসা যায়না। 

সেই পালকিটাও সাজানো হতো দারুন যতœসহকারে। এক্ষেত্রেও মূল ভরসা বা উপকরণ হচ্ছে নানা রঙের কাগজ। সাজানো গোছানো পালকিতে চড়ে বর গিয়ে উঠতেন লঞ্চে বা নৌকায়। পালকিটি যারা বহন করতেন, তাদের বলা হতো বেহারা। অত্যন্ত কঠিন পরিশ্রমের এই কাজটি করেই চলতো তাদের জীবন-জীবিকা।

পালকি নিয়ে মানুষের আবেগ অনুভূতিও ছিল প্রবল। সেই আবেগ নিয়ে অনেক গান কবিতাও রচনা হয়েছে। সেরকমই একটা আবেগের গান বাংলা কোন একটা চলচ্চিত্রে ব্যবহার হয়েছে। যেমন, ‘চার বেহারার পালকি চড়ে...’। গানটিতে একজন যুবকের স্বপ্নের কথা ফুটে উঠেছে, যে কি না নিজের প্রিয়তমাকে পালকি চড়িয়ে নিজের বাড়ি নিয়ে যেতে চায়।

আবার এই বেহারাদের নিয়ে দারুন এক জীবনমুখী গান লিখেছেন অমর কন্ঠশিল্পী ভুপেন হাজারিকা। গানটি হচ্ছে, ‘দোলা হে দোলা’। এই গানটিতে বেহারাদের দুঃখের কথা উঠে এসেছে এভাবে, ‘ হায় মোর ছেলেটির উলঙ্গ শরীরে একটিও জামা নেই খোলা

রাজা মহারাজার দোলা’।

একটা কবিতার অংশবিশেষ মনে পড়ছে - ‘পালকি চলে দোলকি চালে...’

ও হ্যাঁ। পালকি কিন্তু কেবল বিয়ের বর কনে বহনেই ব্যববহার হতোনা, আমীর বা বড়লোকদের যাতায়াতে পালকিই ছিল প্রধান ভরসা। আর পালকি চড়ে কেবল নৌকা বা লঞ্চে বর কনে উঠতেনইনা, বরং আট/ দশ মাইলের দূরত্বে মোটামুটি বরযাত্রায় বরকনে বহনের কাজেও ব্যবহৃত হতো অনায়াসে। বেহারারা ছন্দে ছন্দে পা ফেলে ছুটতেন গন্তব্যের দিকে। আর তাদের ঘিরে থাকতেন বরসহ বরপক্ষের অনেকেই।

কালের বিবর্তনে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। তেমনি হারিয়ে গেছে ‘পালকি’। আজকের প্রজন্মের অনেকেতো এই শব্দটির সাথে পরিচিতই নয়। অথচ একসময় মানুষের জন্য তা অপরিহার্যই ছিল।


সিলেট প্রতিদিন / ইকে


Local Ad Space
কমেন্ট বক্স