উত্তরে মেঘালয় পাহাড়ের নীলচে কোল, আর নিচে দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি। মেঘের ছায়া আর জলের খেলায় প্রতিনিয়ত রূপ বদলায় উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত জলভূমি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওর। স্থানীয় মানুষের ভাষায় "ছয় কুড়ি কান্দা আর নয় কুড়ি বিল"-এর সমন্বয়ে গঠিত এই হাওর কেবল একটি বিশাল জলাশয়ই নয়, এটি অনন্য এক প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ও হাজারো মানুষের জীবিকার উৎস।
পানির নিচে সবুজ অরণ্য ও জীববৈচিত্র্য
বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওর ধারণ করে সাগরের মতো বিশাল রূপ। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে রূপ নেয় ছোট-বড় অনেকগুলো বিলে। এই হাওরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অনন্য উদ্ভিজ্জ ও জলজ পরিবেশ। হিজল, করচ, নলখাগড়া আর চ্যাওড়ার মতো জলসহিষ্ণু উদ্ভিদ নিয়ে গড়ে উঠেছে দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট (Ramsar Site) হিসেবে স্বীকৃত এই হাওরের পরিবেশ ব্যবস্থা।
পানির নিচে ও ওপরে ঘুরে বেড়ায় প্রায় ১৪১ প্রজাতির দেশীয় ও সুস্বাদু মাছ। বাতাসিয়া, মহাশোল, রানী, রুই, কাতল থেকে শুরু করে চিতল মাছের অবাধ বিচরণ রয়েছে এখানে। তাছাড়া বিপন্ন প্রজাতির উভচর ও সরীসৃপ প্রাণীরও নিরাপদ আবাসস্থল এটি।
দেশি-বিদেশি পাখির স্বর্গরাজ্য
শীতকাল এলে টাঙ্গুয়ার হাওরের রূপ পায় এক ভিন্ন মাত্রা। সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া ও হিমালয়ের পাদদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এখানে আশ্রয় নেয় লাখ লাখ পরিযায়ী পাখি। লেঞ্জা হাঁস, বালিমুড়ি, ভূতিহাঁস, পিয়ং হাঁস ও রাজহাঁসের কূজনে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো হাওরাঞ্চল। শীতের কুয়াশা ভেদ করে ডানা মেলা পাখিদের এই কলকাকলি দেখতে সারা দেশ থেকে ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।
পর্যটনের সম্ভাবনা ও স্থানীয় জীবনযাত্রা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাঙ্গুয়ার হাওর দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে ঐতিহ্যবাহী বজরা ও আধুনিক হাউজবোটে ভেসে রূপ উপভোগ করতে আসেন পর্যটকরা। এই পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের অর্থনীতিতে নতুন গতি এসেছে। নৌকা চালনা, গাইড, স্থানীয় শুঁটকি ও মাছ বিক্রি করে জীবনযাত্রার মান উন্নত করছেন স্থানীয়রা।
হুমকির মুখে রূপসী হাওর
সম্ভাবনার পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও পরিবেশগত অসচেতনতার কারণে টাঙ্গুয়ার হাওর আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। হাউজবোটের প্লাস্টিক বর্জ্য ও শব্দদূষণ হাওরের শান্ত পরিবেশ বিনষ্ট করছে। পাশাপাশি অবৈধ উপায়ে মাছ শিকার এবং জলজ উদ্ভিদ ও হিজল-করচের বন নিধনের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে এর স্বাভাবিক রূপ ও জীববৈচিত্র্য।
সংরক্ষণ ও টেকসই পরিকল্পনার দাবি
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে অবিলম্বে পরিবেশবান্ধব ও নিয়ন্ত্রিত পর্যটন নীতিমালা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং হাওরের অভয়াশ্রমগুলো কঠোর নজরদারিতে রাখা গেলে টাঙ্গুয়ার হাওর চিরকাল ধরে রাখবে তার এই অনন্য রূপসী রূপ।
মেঘ-পাহাড় আর জলের এই মেলবন্ধন রক্ষায় প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের সম্মিলিত সচেতনতাই হতে পারে একমাত্র কার্যকর সমাধান।




তাহিরপুর প্রতিনিধি



