নারীর অধিকার, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও আর্থিক স্বাবলম্বিতা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ইসলামী উগ্রবাদীদের হামলা, হুমকি ও অপহরণের শিকার হয়েছেন সিলেটের খাদিমনগর এলাকার নারী উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী মোছাঃ লিনা আক্তার মিতা (৩০)। নারী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং নারীদের জন্য একটি ইউনিসেক্স বিউটি স্পা পরিচালনার কারণে হেফাজতে ইসলামের স্থানীয় নেতা মাওলানা আবদুল জলিল ও তার অনুসারীদের রোষানলে পড়েন তিনি।
লিনা আক্তার মিতা ২০১৫ সাল থেকে ‘আশার আলো’নামের একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ শুরু করেন। বিশেষ করে দরিদ্র ও চা শ্রমিক পরিবারের নারীদের নিয়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা, পরিবার পরিকল্পনা, গার্হস্থ্য সহিংসতা প্রতিরোধ, মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব এবং নারীদের আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন তিনি।
ইতোপূর্বে, ২০২১ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে লাক্কাতুরা চা বাগানে আয়োজিত একটি সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে নারীর অধিকার, প্রজনন স্বাস্থ্য ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় মাওলানা আবদুল জলিলের নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি অনুষ্ঠানটি বন্ধের চেষ্টা করেন এবং লিনাকে প্রকাশ্যে থাপ্পড় মারেন। একই বছরের অক্টোবরে বাঘা গ্রামে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর বাল্যবিবাহ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার কারণে লিনা স্থানীয় হেফাজতপন্থীদের বিরোধিতার মুখে পড়েন; পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে বাল্যবিবাহটি বন্ধ করা হয়।
লিনার অভিযোগ, বাল্যবিবাহ বন্ধের ঘটনায় আবুল হাশেম গ্রেপ্তার হওয়ার পর মাওলানা আবদুল জলিল অভিযোগ করেন যে তিনি ‘ইসলামবিরোধী’ ধারণা প্রচার করছেন। আবুল হাশেম জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর অজ্ঞাতনামা নম্বর থেকেও লিনাকে হুমকি দেওয়া হয়।
২০২২ সালের জুনে স্বামীর সহযোগিতায় খাদিমনগরে ‘মিতাস স্পা’ নামে নিজের একটি ব্যবসা শুরু করেন লিনা। পাঁচজন কর্মী নিয়ে শুরু করা প্রতিষ্ঠানটিতে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য বিভিন্ন সৌন্দর্যসেবা দেওয়া হতো। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি সিলেট চেম্বার অব কমার্সের নারী ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত হন।
তবে ব্যবসা শুরুর পরও তার ওপর হুমকি অব্যাহত থাকে। ২০২২ সালের জুলাইয়ে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ফোন করে তার স্পাকে ‘অনৈতিক’ ও ‘ইসলামবিরোধী’ বলে আখ্যা দেন এবং ব্যবসা বন্ধের নির্দেশ দেন। লিনা জানান, প্রতিষ্ঠানটি বৈধভাবে নিবন্ধিত এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত হওয়ায় তিনি হুমকির পরও ব্যবসা চালিয়ে যান।
এরপর ২০২২ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে হেফাজতে ইসলামের সদস্য ও মাওলানা আবদুল জলিলের অনুসারী পরিচয় দেওয়া পাঁচ ব্যক্তি তার স্পায় ঢুকে হামলা চালায়। তারা লিনা ও তার কর্মীদের ওপর হকি স্টিক দিয়ে আঘাত করে, নিরাপত্তা ক্যামেরা ভাঙচুর করে এবং ক্যাশ রেজিস্টার থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়ে যায়। হামলায় লিনা মুখ, নাক ও ডান চোখে গুরুতর আঘাত পান। পরে তাকে ও তার এক কর্মীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হামলার পর লিনা ও তার স্বামী পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর স্পাটি পুনরায় চালু করা হয় এবং নিরাপত্তার জন্য বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা হয়। একই বছরের নভেম্বরে পুলিশ দুই হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করলে লিনা থানায় গিয়ে তাদের শনাক্ত করেন।
কিন্তু এর পরেই তার ওপর আরও ভয়াবহ হামলা চালানো হয়। ২০২২ সালের ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাকে জোর করে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। তার চোখ ও হাত বেঁধে তাকে প্রায় আধা ঘণ্টা গাড়িতে ঘোরানোর পর একটি নির্জন চা-বাগান এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি মাওলানা আবদুল জলিলের দুই অনুসারীকে চিনতে পারেন বলে জানান।
লিনার ভাষ্য অনুযায়ী, অপহরণকারীরা তাকে এনজিওর কাজ ও স্পা ব্যবসা বন্ধ না করার জন্য অভিযুক্ত করে। তারা দাবি করে, তার অভিযোগের কারণে তাদের দুই সহযোগী গ্রেপ্তার হয়েছে এবং এর আগে বাল্যবিবাহ বন্ধের ঘটনাতেও তিনি তাদের ক্ষতি করেছেন। এরপর তারা তাকে মারধর করে। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখে স্বামীকে খবর দেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং তিন দিন চিকিৎসা নিতে হয়।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর লিনা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। তবে তার অভিযোগ অনুযায়ী, মাওলানা আবদুল জলিল ও হেফাজতে ইসলামের নাম উল্লেখ করার পর পুলিশ বিষয়টি নিয়ে অনাগ্রহ দেখায় এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়নি।
একদিকে হামলা ও হুমকি, অন্যদিকে নারীদের জন্য কাজ করার স্বপ্ন, সবকিছুর মধ্যেও লিনা আক্তার মিতা তার কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করাই তার অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে উগ্রবাদী গোষ্ঠীটি।




প্রতিদিন ডেস্ক



