বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:৫৩ পূর্বাহ্ন

মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদ : একজন নিভৃতচারী শিক্ষক

  • প্রকাশের সময় : ১৪/০৭/২০২৪ ০৪:০৬:৪৬
এই শীতে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের
Share
207


 মো. আব্দুল বাছিত :


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদ একজন নিভৃতচারী শিক্ষক। একজন মানবদরদি ব্যক্তিত্ব। শিক্ষা, সমাজসেবা এবং অধ্যয়নের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। মানুষ এবং সমাজ ছিল তাঁর চিন্তার একীভূত মোহনা। নিজস্ব অবস্থান থেকে নীরবে জ্বালিয়ে গেছেন আলো। তিনি যেন নিভৃতে চলে যাওয়া আমাদের একজন প্রাজ্ঞ, বিচক্ষণ এবং দরদি অভিভাবক। মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা এবং রহমদিল তাঁকে পরিণত করেছে একজন আলোকিত ব্যক্তিত্বে। 


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদ ১ মার্চ ১৯৪৫ সালে ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলার বদরপুরে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস জকিগঞ্জের সুলতানপুর ইউনিয়নের গঙ্গাজলের ঈসাপুর গ্রামে। পরবর্তীতে তারা সিরাজপাড়ায় তাঁদের বসতি স্থাপন করেন। তিনি একটি সম্ভ্রান্ত ও মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের রয়েছে একটি সমৃদ্ধ ইসলামী ও দ্বীনি উত্তরাধিকার। তাঁর পিতা মৌলানা আব্দুল আজিজ ছিলেন একজন দাঈ ও ইসলামী চিন্তাবিদ। দ্বীনের প্রচার-প্রসারই ছিল তাঁর জীবনের লক্ষ্য। তাঁর দাদা মৌলানা মো. কাছিমও ছিলেন একজন আলেমে দ্বীন। তাঁর মা আতিকুন নেছা চৌধুরীও দ্বীনদার একজন নারী ছিলেন। তাঁর নানা মশদ আলী চৌধুরীও ছিলেন তৎকালীন সময়ের একজন রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ার। ব্যক্তিগত জীবনে তিনিও ছিলেন তাকওয়াবান মানুষ। 

মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদের জন্ম এমন একটি পরিবারে যার উত্তরাধিকার দ্বীনি খেদমত, ত্যাগ-তিতিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে। আম্মাজান খাদিজা (রা.)-এর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেল কুরাইশী’র বংশের কয়েকজন ব্যক্তিত্ব মক্কা থেকে ইয়েমেনে হিজরত করেন। তাঁদের বংশদ্ভূত আলী মর্তুজা ইয়েমেনী ইয়েমেন থেকে ভারতের দিল্লীতে আসেন। সেখানে উপমহাদেশের বিখ্যাত সাধক নিজাম উদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর পাশেই তারা বসতি স্থাপন করেন। 


হজরত শাহজালাল ইয়ামেনী (রহ.) ৭০৩ হিজরি মোতাবেক ১৩০৩ সালে ৩২ বছর বয়সে ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে সিলেটে আগমন করেছিলেন। তিনি মূলত হিন্দুস্থান হয়ে সিলেটে আগমন করেন। তিনি যখন দিল্লীতে আগমন করেন তখন এই খবর নিজাম উদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর কাছে পৌঁছে যায়। তিনি শাহজালাল (রহ.)-কে তাঁর দরবারে ডেকে পাঠান। শাহজালাল (রহ.) তাঁর দরবারে পৌঁছলে কুশল বিনিময় করেন এবং তাঁকে এক জোড়া কবুতর উপহার দেন। আর সেখানে কয়েকজন সাগরেদকে শাহজালাল (রহ.)-এর সফরসঙ্গী হিসেবে পাঠান। তাঁদেরই একজন হলেন আলী মর্তুজা ইয়েমেনীর পুত্র শাহ সনজর ইয়েমেনী (রহ.)। যিনি শাহজালাল (রহ.)-এর ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম একজন। তাঁরই পঞ্চদশ অধস্তন পুরুষ হলেন মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদের পিতা মৌলানা আব্দুল আজিজ রহ.।


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদের বয়স যখন মাত্র ৩ মাস তখন তিনি মাতৃহারা হন। এরপর তিনি তাঁর নানীর তত্ত্বাবধানে লালিত পালিত হন। আবার ১৫ বছর বয়সেও তিনি পিতৃহারা হন। এত অল্প বয়সে পিতামাতা দুজনকে হারানোর ফলে মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদের জীবন অন্যধারায় পরিচালিত হয়েছিল। তিনি যেন একটু বেশিই জীবন ও বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাঁর চিন্তাশক্তি আরো সুদৃঢ় ও প্রসারিত হয়েছিল। জীবনকে জানার এবং বোঝার মাধ্যমে নিজেকে উন্নত করার প্রেরণাশক্তি তিনি এ জায়গা থেকেই লাভ করেন। তিনি ছিলেন চার ভাই ও বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। তাঁর অন্যান্য ভাই-বোনেরা হচ্ছেন-বড়বোন শামসুন নাহার, ফয়জুর রহমান ও জহির উদ্দিন। ভাইয়ের মধ্যে প্রথমজন মাদরাসা শিক্ষক এবং দ্বিতীয়জন ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় করিমগঞ্জের বদরপুরে। তিনি সেখানে মক্তবে আরবি ভাষা ও দ্বীনের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তখন ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে গেলে তাঁর দাদা বাংলাদেশে চলে আসেন এবং জকিগঞ্জে বসতি স্থাপন করেন। তিনি গঙ্গাজল হাসানিয়া সিনিয়র মাদরাসায় ভর্তি হন। তিনি ১৯৬২ সালে আলিম পাশ করেন। এরপর তিনি সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। তিনি এখান থেকে ১৯৬৪ সালে ফাজিল পাশ করেন। পরবর্তীতে কামিল পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে ১৯৭২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পাশ করেন। এছাড়া তিনি মদনমোহন কলেজ, সিলেট থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।  ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও পরিশ্রমী। তাঁর স্মৃতিশক্তিও অত্যন্ত প্রখর ছিল।


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদ শিক্ষকতাকেই তাঁর পেশা হিসেবে বেছে নেন। মূলত তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক ও সমাজসংস্কারক। তিনি ১৯৭২ সালে জাতীয় শিক্ষাকেন্দ্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। এর কিছুদিন পরেই একই বিদ্যালয়ে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। তিনি সিলেট পিটিআই থেকে শিক্ষকতার উপর বিশেষ ট্রেনিং গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ভাতালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তেলীবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাজী জালাল উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক এবং সর্বশেষ আবার জাতীয় শিক্ষাকেন্দ্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্র্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখান থেকে তিনি ২০০৩ সালে সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তেলীবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দায়িত্বপালনকালে তিনি সিলেট সদর থানা স্কাউটসের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদ ছিলেন শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে একজন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। তখনকার সময়ে তিনি যে মাপের শিক্ষিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তাতে চাইলে যেকোনো সরকারি চাকুরি তিনি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি শিক্ষকতাকেই আপন করে নিলেন। এজন্য সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করলেও তিনি শিক্ষা প্রচার-প্রসারের নেশা থেকে নিজেকে নিবৃত রাখতে পারেননি। তাই তিনি নগরীর নয়াসড়কের মানিকপীর রোডে প্রতিষ্ঠিত ‘খাদিজা রা. মাদরাসা’-এর সাথে আমৃত্যু সম্পৃক্ত ছিলেন। 


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদ ব্যক্তিজীবনে ১৯৭৪ সালে বিয়ানীবাজার নিবাসী লন্ডন প্রবাসী আব্দুল হাফিজের কন্যা জামেনা বেগম মিরার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। সন্তানদের প্রত্যেকেই সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। তারা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আঞ্জাম দিচ্ছেন। তাঁর বড় মেয়ে ইছমত হানিফা। তিনি একজন লেখক, কবি ও সংগঠক। তিনি কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সহ-পাঠাগার সম্পাদক। এরপূর্বেও তিনি পাঠাগার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি নারী পরিষদ যুক্তরাষ্ট্র শাখার সহ সাধারণ সম্পাদক, রেডিও বাংলাদেশ সিলেটের হোস্ট ও স্ক্রিপ্ট রাইটার, সিলেট ট্যুরিজম ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট, মঈন উদ্দিন আহমদ ট্রাস্ট-এর চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ইতোমধ্যে তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সিলেটের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে তিনি এক সুপরিচিত নাম।


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদের দ্বিতীয় সন্তান আরিফা শবনম। তিনি সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন সমাপ্ত করে নিউইয়র্ক চলে যান। সেখানে তিনি রুশো হার্ট শেয়ার স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। স্বামীর সঙ্গে সেখানে তাঁর সুখের সংসার। তৃতীয় সন্তান শাহ কামরান। তিনি ইংল্যান্ড প্রবাসী। চতুর্থ সন্তান ইউসুফ আদনান বাংলাদেশ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। এখানে একটি কর্পোরেট ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে সিএ কোর্স করার জন্য লন্ডন চলে যান। বর্তমানে সেখানে লিওড ব্যাংকে হেড অব ডিজিটাল চেইঞ্জ শাখায় সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর স্ত্রী রুনা চৌধুরীও নিজেকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রেখেছেন।


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদের পঞ্চম সন্তান সুমাইয়া আহমদ শম্পা। বর্তমানে আমেরিকার ওয়াশিংটনে সপরিবারে বসবাস করছেন। তিনি সেখানে উইনউড চিলড্রেন’স সেন্টারে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর ষষ্ঠ সন্তান আহমদ মারজান সুইডেনের হাওয়াই স্টকহোম এবি-তে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সেখানে সপরিবারে তাঁর সুখের সংসার। 


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদ ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যানুরাগী ছিলেন। সেসময় থেকে তিনি জাতীয় শিক্ষাকেন্দ্র পাঠাগারের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সাথেও তাঁর সম্পর্ক ছিল। আর কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের কিছুকাল পরেই জাতীয় শিক্ষাকেন্দ্র পাঠাগার সিলেট স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে তিনি সেখানে অফিস সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। সেটা ১৯৮৮ সালের কথা। তিনি আল্লামা ইকবাল ও মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমীর কবিতার ভক্ত ছিলেন। তিনি তাঁদের অসংখ্য কবিতা সুন্দর করে আবৃত্তি করতে পারতেন। আর তাদের সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। তিনি অধ্যয়নে নিবিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। নিয়মিত গ্রন্থ অধ্যয়ন আর পত্র-পত্রিকা পাঠ ছিল তাঁর নিত্যদিনের রুটিন। তাঁর ভাষা-দক্ষতাও ছিল অসাধারণ। তিনি ৭টি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। এগুলো হচ্ছে-বাংলা, ইংরেজি, আরবি, উর্দু, ফারসি, হিন্দি ও ও নাগরী। তিনি সিলেটে নাগরী ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তিনি মুরারিচাঁদ কলেজ, সিলেটের গণিত বিভাগের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর এহরাসুজ্জামানের সাথে নাগরী ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদ ২০০৩ সালে সপরিবারে ইংল্যান্ডে ভ্রমণ করেন। এরপর তিনি ২০০৮ সালে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য চলে যান। সেখানে কিছু দিন নিউইয়র্ক শহরে থাকেন। এরপর তিনি ভার্জিনিয়ায় বসবাস করেন। পরবর্তীতে তিনি ২০১১ সালে আবার দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি ছিলেন একজন আল্লাহপ্রেমিক ব্যক্তিত্ব। তিনি দীর্ঘদিন আমেরিকায় বসবাস করেন। কিন্তু সেখানে কোনো আজানের ধ্বনি শুনতে পাননি। তাই মনের কষ্টে দ্বীনি তাকাজা থেকে আবার দেশে ফিরে আসেন। তিনি ২০০৭ সালের দিকে হজব্রত পালন করেন। এছাড়া তিনি ইয়েমেনও সফর করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ যেহেতু ইয়েমেন থেকে হিজরত করেছেন, তাই সেখানে অনেক আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তিনি ভ্রমণ করেন।


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদ ছিলেন সহজ-সরল জীবনের প্রতিচ্ছবি। একজন সাদাসিধে মানুষ হিসেবে তিনি তাঁর জীবনকে পরিচালিত করেছেন। তিনি সবসময় সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি-টুপি পরতেন। তিনি ছিলেন একজন স্বল্পভাষী ও স্বল্পাহারী মানুষ। তাঁর জীবনে কোনো উচ্চবিত্ত চাহিদা কিংবা চাওয়া-পাওয়া ছিল না। অত্যন্ত রূচিশীল ও অল্পে তুষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তিনি সবসময় মানুষকে দান-খয়রাত করতেন। তাঁর কাছ থেকে কেউ কোনোকিছু চেয়ে খালি হাতে ফিরে যাননি। তিনি নিজে খরচের টাকা থেকে বাঁচিয়ে মানুষকে সাহায্য করতেন। আত্মীয়-স্বজন এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে অনুপ্রাণিত করতেন, যাতে তারা তাদের বাচ্চাদেরকে পড়ালেখায় করায়। তিনি অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীকে পড়ালেখায় অগ্রসর হওয়ার জন্য সহযোগিতা করেছেন। তাঁর অসংখ্য-অগণিত ছাত্র-ছাত্রী দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। একজন আল্লাহওয়ালা মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন একেবারে ভদ্র, বিনয়ী, অমায়িক এবং শান্তশিষ্ট ছিলেন। তাঁর আচার-আচরণে রাগ-অভিমান আর অভিযোগের কোনো স্থান ছিল না। নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত, তাহাজ্জুদসহ বিভিন্ন নফল ইবাদাতে তিনি অগ্রগণ্য ছিলেন। তাকওয়া এবং ঈমানদারি তাঁর চরিত্রের ভূষণ ছিল। 


কবির একটি কথা আছে-‘জন্মিলে মরিতে হইবে, অমর কে কোথা রবে’। এটি একটি অনিবার্য সত্য। পৃথিবীতে আমাদের আগমন হয়েছে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য। মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদও তেমনই ২০২৪ সালের ৪ জুলাই রোজ বৃহস্পতিবার দুপুর পৌণে দুইটায় নগরীর কাজলশাহ এলাকাস্থ নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। তাঁকে জকিগঞ্জের গঙ্গাজলের সিরাজপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। 


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন নিভৃতচারী শিক্ষক। যিনি আত্মপ্রচারকে কখনোই প্রশ্রয় দেননি। একটি নীরব-নিভৃতের জীবন তিনি অতিবাহিত করেছেন। যেখানেই গিয়েছেন শিক্ষার আলো জ্বেলেছেন। মানুষকে আলোর দিকে আহবান করেছেন। তিনি আল্লাহর একজন সত্যিকার বান্দা। যিনি দুনিয়াবি মোহ-লোভ-লালসা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছেন। তাই তো উন্নত জীবনের মায়া ছেড়ে তিনি আল্লাহর প্রেমে সুদূর আমেরিকা থেকে স্বদেশ ফিরে আসেন। যেই প্রেমের আহবান তিনি শুনতে পাননি আমেরিকায় বসে, তাই শুনার জন্য তিনি অনন্তকালের জন্য স্থান করে নিলেন তাঁর শেষ ঠিকানা গঙ্গাজল হাসানিয়া সিনিয়র মাদরাসার পাশে সিরাজপাড়ায়। যেখান থেকে তিনি অনন্তকাল শুনবেন আজানের মধুর ধ্বনি। এ যেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমোঘ প্রেমের গান-


‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই

যেন ঘোরে থেকে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।’


মৌলানা মঈন উদ্দিন আহমদের স্বপ্নকে আল্লাহ তায়া’লা পূরণ করেছেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল বৃহস্পতিবার রাতেই তাঁর দাফন হবে। আর তাই হয়েছেও। তিনি চেয়েছিলেন অনন্তকাল আজানের ধ্বনি শুনতে। আল্লাহ তায়া’লা তাঁর ভালোবাসায় তাঁকে সিক্ত করেছেন। আল্লাহ তায়া’লা তাঁর প্রতি রহম করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের বাসিন্দা হিসেবে কবুল করুন। আমিন।



সিলেট প্রতিদিন / টিবি


Local Ad Space
কমেন্ট বক্স
© All rights reserved © সিলেট প্রতিদিন ২৪
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরি