মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম : আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় যদি বলি ‘বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তা করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’। হ্যাঁ নারী ছাড়া যেনো সব কিছু অসম্পূর্ণ। সেই আদম (আ.) এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বে পুরুষদের প্রতিটি সফলতার পেছনে কোন না কোন নারীর গল্প জড়িয়ে রয়েছে। তাছাড়া বর্তমান একুশ শতকে এসে অনেক নারীও নিজেকে একেকজন সফল নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এমনি দুই সফল নারী সুষমা সুলতানা রূহি ও নিলাঞ্জনা দাশ জুঁই।
ভিন্নধর্মী সুষমা সুলতানা রূহি
সিলেট জেলা পরিষদের একজন সদস্য সুষমা সুলতানা রূহি’র শৈশব ও বেড়ে ওটা সিলেটের ওসমানীনগরের তাজপুরে। বাবা তাজপুর ডিগ্রী কলেজের ভূমিদাতা ও প্রতিষ্ঠাতা, সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিবিদ কমরেড আজহার আলীর আদর্শে বেড়ে ওটা সুষমা সুলতানা রূহি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সংস্কৃতিমনা। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে উদিচী শিল্পী গোষ্টী বালাগঞ্জ শাখার হয়ে ইংল্যান্ডে সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ১৪৭টি দলের মধ্যে সপ্তম স্থান অর্জন করেন। সেই সংবাদ বিবিসিতেও প্রচারিত হয়।
সুষমা সুলতানা রূহি ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে ক্লাস নাইনে থাকাকালীন সময়ে মোটর সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করলে তৎকালীন সময়ে এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। তারপরও থেমে থাকেননি তিনি। রূহির কথায়- তার পিতা সব সময় নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে বলতেন। সমাজ সেবামূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করতেন। সেইজন্যই ছোটবেলা থেকেই বাবার অনুপ্রেরণায় একজন সমাজ সেবক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। গরিব দুঃখী মেহনতী মানুষের কষ্টকে গানে রূপান্তরিত করে তিনি ক্ষুদে উদিচী শিল্পীদের নিয়ে স্কুল-কলেজে পড়ার সময় গ্রামে-গঞ্জে এবং শহরে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেছেন।
বাংলাদেশ স্কাউট এর ডিআরসি সিলেট অঞ্চল-এর আঞ্চলিক উপ কমিশনার সুষমা সুলতানা রূহি স্কাউটিংয়ের পাশাপাশি দৌঁড়, সাইক্লিংসহ নানা ধরণের খেলাধুলায় বেশ পারদর্শী। এছাড়াও জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিরন্তর ছুটে চলেছেন শহর থেকে গ্রামে। তিনি নারীদের নানামুখী শিক্ষা এবং ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বি হওয়ার প্রেরণা যোগাচ্ছেন।
তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা সোসাইটির তিন বছর সভাপতি দায়িত্ব পালন করেন সুষমা সুলতানা রূহি। বর্তমানে নারী জাগরণী ঐক্য পরিষদ সিলেটের সভাপতির দায়িত্বে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্যে। তিনি এ পর্যন্ত সিলেট জেলা পরিষদ ও ব্যক্তিগতভাবে প্রায় শ’খানেক নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে ও মেশিং দিয়ে সাবলম্বী করে তোলেছেন।
তাছাড়া, প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদানের সিটি করপোরেশন কমিটিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মনোনীত সদস্য হিসেবেও কাজ করছেন তিনি।
সুষমা সুলতানা রূহির এসব কাজে সর্বদা সমর্থন যোগাচ্ছেন তার স্বামী সিলেট জেলা যুবলীগের সভাপতি একজন স্বচ্ছধারার রাজনীতিক শামীম আহমদ ভিপি।
তাজপুরে ‘কলেজ বাড়ি এগ্রো ফার্ম’ নামে একটি খামার ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রূহি। এ খামারের মাধ্যমে এলাকায় দুধের চাহিদা পূরণে সহায়তা করার পাশাপাশি এলাকার মানুষদের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও রূহি ২০০৬ সালে তাজপুরে সিলভিয়া বিউটি পার্লার প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিউটি পার্লারের মাধ্যমে অনেক মেয়েদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলেছেন।
এরকম কাজ নারীদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি নিজেদের সাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলছে।
নৃত্যের নিরব আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া নিলাঞ্জনা দাশ জুঁই
সিলেটের যে ক’জন নৃত্যশিল্পী নিজেদের একটা জায়গা তৈরি করতে পেরেছেন তার মধ্যে অন্যতম নিলাঞ্জনা দাশ জুঁই। তিনি দীর্ঘদিন থেকে নৃত্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে অনেকটা সফলতার মুখও দেখেছেন তিনি।
নিলাঞ্জনা দাশ জুঁই তার প্রতিষ্ঠিত নৃত্যশৈলী নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেশ ভালো ভালো নাচ উপহার দিয়েছেন। এছাড়া তার আরেক প্রতিষ্ঠান ঘুংঘুর এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নৃত্য শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন।
সিলেট সরকারী গার্লস হাই স্কুল থেকে এসএসসি ও সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি ও মদন মোহন কলেজ থেকে অনার্স পাশ করেন নিলাঞ্জনা দাশ জুঁই।
নৃত্যে একটি নিরব আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া জুঁই সিলেটে নৃত্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছেন।
নৃত্যে এ পর্যন্ত দু’বার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত জুঁই বলেন, নৃত্যকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্টা করতে না পারলে এই ক্ষেত্রকে ঠিকিয়ে রাখা যাবে না। যখন নৃত্য থেকে নিয়মিত আয় করতে পারবে তখন এতে মানুষ উৎসাহী হবে। তখন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন হবে।
তিনি বলেন, নৃত্যে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধু করতে আমরা কাজ করছি। সিলেটে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক মানের শিল্পীকে এনে নৃত্যানুষ্ঠান করেছি। এছাড়া আমার প্রতিষ্ঠান ঘুংঘুর ও নৃত্যশৈলী’র মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।




মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম



