শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ০১:৫২ অপরাহ্ন

সর্বজনীন পেনশন সুবিধায় কী আছে

  • প্রকাশের সময় : ২৪/০২/২০২২ ১২:৩০:৩৮
এই শীতে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের
Share
9

আগামী এক বছরের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব সব নাগরিকের জন্য অবসরকালীন সুবিধা বা পেনশন চালু করতে যাচ্ছে সরকার। তবে নিবন্ধিতরা এর প্রত্যক্ষ সুফল পাওয়া শুরু করবেন ১০ বছর পর থেকে। এ ছাড়া বাংলাদেশের বাইরে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও এ সুবিধা রাখা হবে। শুরুর দিকে এ ব্যবস্থা ঐচ্ছিক রাখা হলেও পরবর্তী সময়ে এটাকে বাধ্যতামূলক করা হবে।

গতকাল সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। বলেন, পেনশন ব্যবস্থার আওতায় গঠিত তহবিলে যারা যে পরিমাণ চাঁদা দেবেন, ওই তহবিলে একই পরিমাণ টাকা সরকারও দেবে। এটি ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। পেনশন তহবিল বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করবে এই কর্তৃপক্ষ। বিনিয়োগ থেকে যে মুনাফা আসবে, তাও পেনশনধারীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই সেটা চালু করা সম্ভব। তার আগে আইন প্রণয়ন ও বিধি প্রণয়ন এবং আলাদা একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। এর আওতায় নিবন্ধিতরা ৬০ বছরের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পেনশন ভোগ করতে পারবেন। যাদের বয়স এখন ১৮ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে, আপাতত তাদের এ সুবিধার অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

প্রতি মাসে কতো টাকা জমা দিতে হবে এবং কতো টাকা করে পেনশন পাওয়া যাবে- এমন প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিষয়গুলো এখনো একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। কর্তৃপক্ষ এগুলো ঠিক করবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ ধরনের কার্যক্রম যেভাবে চালায়, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা হবে। সংবিধানের ১৫ ঘ অনুচ্ছেদ থেকে উদ্ধৃত করে মন্ত্রী বলেন, বার্ধক্যজনিত কারণে অভাবগ্রস্ত হলে তাদের অভাবের কারণে যাদের সাহায্য প্রয়োজন, তাদের সাহায্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই আলোকে এই পেনশন স্কিম নেয়া হচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় নির্বাচনী ইশতেহারে সর্বজনীন পেনশনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এসবের ধারাবাহিকতায় এটা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি। এটি একটি অসাধারণ অর্জন হবে। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। কারণ ধারণাটি ছিল তার এবং তিনি বার বার এটি বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছিলেন। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিটি মানুষ উপকৃত হবে এবং লাভবান হবে। অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, বাংলাদেশে এখন গড় আয়ুষ্কাল ৭৩ বছর, যা ২০৫০ সালে ৮০ বছর এবং ২০৭৫ সালে ৮৫ বছর হবে। এতে বোঝা যায় আগামী তিন দশকে একজন কর্মজীবী ব্যক্তি অবসর গ্রহণের পরেও ২০ বছর বেঁচে থাকবে। কিন্তু ওই সময় তাদের আয় থাকবে না। সেজন্য তাদের দায়িত্ব কেবল সরকারই নিতে পারে।

পেনশন সুবিধার প্রস্তাবে যা আছে:

১। ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সকল কর্মক্ষম নাগরিক এই পেনশন সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হবেন। প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিরাও এতে অংশ নিতে পারবেন। তবে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বিষয়ে পরে বিবেচনা করা হবে। কারণ এখন তারা সরকারিভাবেই একটি পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আছেন।

২। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সব নাগরিক পেনশন হিসাব খুলতে পারবেন। প্রাথমিকভাবে এটা হবে ঐচ্ছিক। পরে তা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা আছে।

৩। ধারাবাহিকভাবে কমপক্ষে ১০ বছর টাকা জমা দেয়া সাপেক্ষে মাসিক পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন একজন। প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি পেনশন অ্যাকাউন্ট থাকবে। ফলে চাকরি বা পেশা পরিবর্তন করলেও পেনশন হিসাব অপরিবর্তিত থাকবে। মাসিক সর্বনিম্ন চাঁদার হার নির্ধারিত থাকবে। তবে প্রবাসীদের ক্ষেত্রে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে চাঁদা দেয়ার সুযোগ থাকবে।

৪। সুবিধাভোগীরা বছরে ন্যূনতম বার্ষিক জমা নিশ্চিত করবেন। তা না হলে তাদের হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে। পরে বিলম্ব ফিসহ বকেয়া চাঁদা পরিশোধের মাধ্যমে হিসাব সচল হবে।

৫। পেনশনের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা (৬০ বছর) পূর্ণ হলে পেনশন তহবিলে পুঞ্জীভূত লভ্যাংশসহ জমার বিপরীতে নির্ধারিত হারে পেনশন দেয়া হবে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতি মাসে এই পেনশন সুবিধা ভোগ করবেন।

৬। নির্ধারিত চাঁদা জমাকারী পেনশনে থাকাকালে ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে মারা গেলে তার নমিনি সেই মাসিক পেনশন প্রাপ্য হবেন। মূল জমাকারীর বয়স যে বছর ৭৫ বছর পূর্ণ হতো, ওই বছর পর্যন্ত নমিনিকে এই পেনশন দেয়া হবে।

৭। পেনশন স্কিমে জমা করা অর্থ কোনোভাবেই কোনো পর্যায়ে এককালীন উত্তোলনের সুযোগ থাকবে না। তবে আবেদনের প্রেক্ষিতে জমা অর্থের ৫০ শতাংশ ঋণ হিসেবে তোলা যাবে, যা সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।

৮। কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা দেয়ার আগেই নিবন্ধিত চাঁদা প্রদানকারী মারা গেলে জমা অর্থ মুনাফাসহ তার নমিনিকে ফেরত দেয়া হবে।

৯। পেনশনের জন্য নির্ধারিত চাঁদা বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচনা করে কর রেয়াতের জন্য বিবেচিত হবে। পেনশন বাবদ মাসিক যে অর্থ পাওয়া যাবে তা পুরোপুরি আয়কর মুক্ত থাকবে।

১০। পেনশন কর্তৃপক্ষের খরচসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় সরকার বহন করবে। পেনশন কর্তৃপক্ষ তহবিলে জমা অর্থ নির্ধারিত গাইডলাইন অনুযায়ী বিনিয়োগ করবে এবং সর্বোচ্চ লাভের ব্যবস্থা করবে।

মন্ত্রী বলেন, এটা হচ্ছে প্রাথমিক প্রস্তাব, এর সঙ্গে আরও বাস্তবসম্মত সংশোধন ও পরামর্শ যুক্ত হবে। এদিকে এই পেনশন ব্যবস্থায় লাভের একটি আনুমানিক হিসাব সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, যদি মাসিক চাঁদা ১০০০ টাকা, মুনাফা ১০ শতাংশ ও আনুতোষিক ৮ শতাংশ ধরা হয়, ১৮ বছর বয়সে যদি কেউ চাঁদা দেয়া শুরু করে এবং ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত তা চালু থাকে, তাহলে ওই ব্যক্তি অবসরের পর ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি মাসে ৬৪ হাজার ৭৭৬ টাকা করে পেনশন পাবেন।

যদি ৩০ বছর বয়সে চাঁদা দেয়া শুরু হয় এবং ৬০ বছর পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে, তাহলে অবসরের পর প্রতিমাসে ১৮ হাজার ৯০৮ টাকা পেনশন পাবেন। তবে চাঁদার পরিমাণ ১০০০ টাকার বেশি হলে আনুপাতিক হারে পেনশনও বেশি হবে।

মন্ত্রী বলেন, এটি একটি আনুমানিক হিসাব। আইন ও বিধি প্রণয়ন এবং পেনশন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার পর প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।


সিলেট প্রতিদিন / এসএএম


Local Ad Space
কমেন্ট বক্স