রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২২ পূর্বাহ্ন

দেড় মাসের সন্তান কোলে নিয়ে সুমির ৬ ঘণ্টার নিষ্ফল চেষ্টা

  • প্রকাশের সময় : ১৪/০৩/২০২২ ১১:২৪:৫৫
এই শীতে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের
Share
9

নবজাতক শিশু রাইসা মণি। বয়স মাত্র ৪২ দিন। মা সুমি বেগম কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অপেক্ষা করছেন টিসিবি’র ট্রাকের জন্য। হাতিরঝিলের মধুবাগে সকাল ৮টা থেকে তার এই অপেক্ষা। রোদের মধ্যে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ১১টার পর দেখা মিলে ট্রাকের। কর্মীরা সুমির হাতে কলমের কালি দিয়ে ১৮ নম্বর সিরিয়াল লিখে দেন। কিন্তু ৩০ মিনিট অপেক্ষার পর সেখানে আর পণ্য দেয়া হলো না।

ট্রাক চলে গেল রামপুরার মিরবাগে।

রাইসাকে কোলে করে সুমিও ছুটলেন সেখানে। মিরবাগে ১০ মিনিট দাঁড়ানোর পর সড়কে জ্যাম লাগার কারণে ট্রাক সেখান থেকেও চলে গেল। সুমি আবার ট্রাকের পেছন পেছন ছুটলেন। মিরবাগের নতুন রাস্তার মোড় পর্যন্ত গিয়ে ট্রাকটি চোখের নজর থেকে হারিয়ে ফেলেন সুমি। আশেপাশে খোঁজাখুঁজির পর ট্রাক না পেয়ে তিনি বাড়ি ফিরে যান। তার মতো অনেকেই ট্রাকের পেছন পেছন ছুটেছেন। উষ্মা প্রকাশ করে সুমি জানান, দুই মাস আগে একবার টিসিবি ট্রাক থেকে পণ্য নিয়েছিলেন তিনি। এরপর গতকাল যান। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করেও টিসিবি’র কোনো পণ্য নিতে পারেননি। পরে ২০ টাকার তেল কিনে নিয়ে আলুভর্তা আর ডাল দিয়ে দুপুরে ভাত খেয়েছেন।

সুমি হাতিরঝিলের মধুবাগে থাকেন। স্বামী আল-আমিন রিকশাচালক। তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে অভাবের সংসার তার। তিনি বলেন, চাল-ডালের দাম বাড়াই দিলে তো আমাগো মতো গরিবগো সমস্যা হয়। যাদের টাকা-পয়সা আছে তাদের কোনো সমস্যা নাই। আমরা এক বোতল তেল কিনতে পারি না। ১০ থেকে ২০ টাকার তেল তো দিতে চায় না, তাও অল্প অল্প কইরা নিয়া আসি। ২০ টাকার তেল দিয়া একদিন রান্না করতে পারি। এতক্ষণ রোদ্রের ভেতরে সিরিয়ালে দাঁড়াই থাকলাম বাচ্চা নিয়া, তাও কিছু পাইলাম না। পরে ২০ টাকার তেল কিনে আনলাম। আলুভর্তা আর ডাল দিয়া ভাত খাইলাম। কিছু করার নাই।

এদিকে দক্ষিণ সিটির সবুজবাগ থানাধীন রাজারবাগ কালীমন্দির পানির পাম্পের আশেপাশে টিসিবি’র ট্রাকে পণ্য দেয়ার কথা ছিল। এ জন্য সকাল ৯টা থেকে অনেকেই ট্রাকের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু দুপুর ১টা পর্যন্ত সেখানে কোনো ট্রাকের দেখা মিলেনি। তাদের মধ্যে একজন মর্জিনা বেগম। অন্যের বাড়িতে কাজ করেন তিনি। বলেন, সকাল ৯টার দিকে একবার ট্রাকের জন্য দাঁড়াইয়া ছিলাম। ট্রাক আসে নাই দেখে কাজ করতে গেছিলাম। এখন এক ঘণ্টা ধইরা আবার আইসা বইসা রইছি। কিন্তু ট্রাক আসে নাই। এখন দোকানে দাম বেশি। দুইশ’ টাকা কেজি তেল। চাল-ডাল সবকিছুর দাম বেশি। এককেজি পিয়াজ আনতে গেলেও ৬০ টাকা চায়। রোজগার হয় না ঠিকমতো। ট্রাক থেকে কিনতে একটু কম দামে পাওয়া যায়। তাই অপেক্ষা করি।

গার্মেন্টস কর্মী মাজেদা আক্তারও অপেক্ষা করছেন ট্রাকের জন্য। তিনি বলেন, অসুস্থতার কারণে তিন দিন ধরে অফিসে যাই না। এই তিন দিনই টিসিবি’র পণ্য কিনতে এসেছি। একদিনও নিতে পারি নাই। গাড়ি আসে নাই। আজকে আসবো কিনা জানি না। নায়েব আলী নামের এক বৃদ্ধ বলেন, সকাল ৯টায় এখানে আইছি। এখন একটা বাজে গাড়ি আহে নাই। তিনদিন আইসা ঘুইরা গেছি নিতে পারি নাই। আজকে পাই কিনা সেই আশায় বইয়া আছি।

টিসিবি’র পণ্য নিতে এসে ভোগান্তির কথা উল্লেখ করে এক নারী বলেন, ট্রাক ঠিক সময়মতো আসে না। আসলেও সুশৃঙ্খল ভাবে দেয় না। অনেক মানুষ প্রতিদিন এসে ঘুরে চলে যায়। গাড়ি সপ্তাহে কোন কোন দিন আসবে সেটাও বলে না। এগুলা মানুষের ভোগান্তি। কোনোদিন ৯টা বাজে আসে, কোনোদিন ৩টা বাজে আসে। মানুষ তো ৯ টায় এসেই বসে থাকে। না খেয়ে অনেকে তিনটা পর্যন্তও অপেক্ষা করে। প্রতিদিনই মানুষ হয়রানি হচ্ছে।

এ ব্যাপারে টিসিবি’র মুখপাত্র হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের ওয়েবসাইটে যে কয়টা স্থানের নাম দেয়া আছে সেগুলোর সব জায়গায় ট্রাক যাবে। হয়তো একটু দেরি হতে পারে। আমরা সকাল সাড়ে সাতটা থেকে গাড়ি ছাড়া শুরু করি। আমাদের কার্যক্রম আরও আধাঘণ্টা আগে থেকে শুরু হয়। গুদাম থেকে একটা একটা করে সিরিয়াল করে গাড়ি বের করি। সর্বশেষ গাড়ি বের করতে সাড়ে ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত বেজে যায়। আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই।


সিলেট প্রতিদিন / এমআরএম


Local Ad Space
কমেন্ট বক্স