মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪২ অপরাহ্ন

এখনো স্বীকৃতির অপেক্ষায় শহীদ নেওয়ার আলীর পরিবার

  • প্রকাশের সময় : ১৩/০৩/২০২২ ০৮:১৭:৪১
এই শীতে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের
Share
9

এনামুল কবীর :: স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও স্বীকৃতি মিলেনি অকুতোভয় এক বীর মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ আর বীরত্বগাঁথার। সন্তানের অপেক্ষায় প্রহর গুণে ধুঁকে ধুঁকে মারা গাছেন তার গর্ভধারিনী জননী। বাবা গত হয়েছেন আরও আগে। সন্তানের জন্য ধুঁকতে হয়েছে তাকেও। আর এখন ধুঁকছেন শহীদ নেওয়ার আলীর জীবিত পাঁচ ভাই ও এক বোন। যদিও তারা প্রবাসে, তবে দেশের জন্য লড়তে লড়তে প্রাণ বিসর্জন দেয়া ভাইয়ের স্বীকৃতি মিলছেনা- এ যন্ত্রণা, এ কষ্ট আর সইতে পারছেন না তারা।

শহীদ নেওয়ার আলীর সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার থানার শরষপুর গ্রামের মৃত হাজী আকবর আলীর ছেলে। একাত্তরে তিনি কলেজপড়–য়া এক টগবগে যুবক। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের পরপরই নেওয়ার আলী সহপাঠী বন্ধুদের নিয়ে কঠিন এক লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন।

অগ্নিঝরা মার্চের সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে করতে তাঁর ছোট ভাই মনোহর আলী বলেন, একাত্তরের ২৫ মার্চের পরপরই তার ভাই বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন। তখন তিনি ১১ বছরের এক শিশু। জানালেন, ইংল্যান্ড যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছিল নেওয়ার আলীর। এরই মধ্যে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ২৫ মার্চের পরপরই ভাই নিখোঁজ হন। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি আর কান্নাকাটি। মা খুব কাঁদতেন। একদিন খবর পান তিনি সীমান্ত পেরিয়ে আরও কয়েকজন বন্ধু বান্ধবের সাথে ভারতে চলে গেছেন। সেখানে ট্রেনিং সম্পন্ন করেন।

সেই নেওয়ার আলীকে পরিবারের সদস্যরা আর না দেখলেও দেখেছিলেন ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাঁও এলাকার ধারণ গ্রামের এক রাজাকার। নেওয়ার আলী জানতেন না যে, তিনি রাজাকার বাহিনীতে যোগদান করেছেন। এ অবস্থায় তার বাড়িতে রাত কাটানোর প্রস্তাব পেয়ে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। সঙ্গে আসা অপর এক মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে ঐ রাজাকারের বাড়িতে রাত কাটাতে রাজী হন। কিন্তু সকালে নিজেদের আবিষ্কার করেন পাক বাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর রাজাকারের ঘেরাও অবস্থায়। বিশ্বাসঘাতকতার শিকার বুঝতে পেরে তিনি তার সহযোদ্ধাকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যেতে চাইলেও পারেন নি। শেষ পর্যন্ত ওদের হাতে ধরা পড়েন এবং তাকে তুলে দেয়া হয় পাকিস্তানী হানাদারদের ক্যাম্পে।

এরপর তার বাবা ভাইসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বারবার ধর্না দিলেও নেওয়ার আলীর হদিস মিলেনি। তবে লোকমুখে জানতে পেরেছেন, তাকে হায়েনার হত্যা করেছে। যেদিন তাকে আটক করে ক্যাম্পে পাঠিয়েছিল রাজাকার আলবদররা, তার আগের রাতে তিনি ফেঞ্চুগঞ্জের পিআইডিসি বা বর্তমান বিআইডিসি ব্রিজটি ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তার পরের লক্ষ্য ছিল ফেঞ্চুগঞ্জ রেলসেতু ধ্বংস। এই অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েই তাকে দেশে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়ার কারণে।

সোনাহর আলী জানান, এসব কথা তারা জানতে পেরেছিলেন পরে। পরে তারা পরিবারের সব সদস্য যুক্তরাজ্য চলে যান। এখনো তারা সেখানে স্থায়ীভাবে বসোবাস করছেন। তবে দেশে ফিরে সম্প্রতি মনোহর আলী এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে বিস্তারিত তুলে ধরেন।

তিনি জানান, এমন একজন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার সহদোর হিসাবে নিজে গর্ববোধ করলেও এখনো তাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্য আক্ষেপ আর হতাশার আগুনে পুড়ছেন। কারণ, বীর মুক্তিযোদ্ধা নেওয়ার আলীর অবদানের সরকারি স্বীকৃতি মিলেনি। মুক্তিযোদ্ধার ভারতীয় তালিকা এবং লাল বইয়ে তার নাম আছে বলে দাবি করেছেন মনোহর আলী। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া একটা চিঠি ও এককালিন একটা অনুদান পেয়েছিলেন বটে, তবে সেই চিঠিটিও তারা হারিয়ে ফেলেছেন অনেক আগে।

মনোহর আলী কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমার ভাই মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হলেও মা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, তাঁর ছেলে আবার ফিরে আসবে তাঁর বুকে। এমনকি তিনি মাঝে মাঝে চমকে উঠে ছেলেকে ডাকতেন, আইছতনিরে বাবা, ও নেওয়ার....। তারপর আবার কান্নায় ভেঙে পড়তেন।

শুধুই কি মা? তার ৭ ভাই ও এক বোনের প্রত্যেকের বুকেই ভাই হারানোর কঠিন শোক আর যন্ত্রণার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে।

সরকারি স্বীকৃতি না পেলেও সামাজিক স্বীকৃতি পাচ্ছেন তারা। দক্ষিণ সুরমা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ গোটা এলাকাবাসী জানেন, নেওয়ার আলী একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা।

সোনাহর আলী আরও জানান, ৭২ সালের শেষের দিকে তাদের বাড়ির পাশে একটি শহীদ মিনার তৈরি করা হয়েছিল যদিও, কিন্তু ৭৫ পরবর্তিতে তার আর থাকেনি। ধ্বংস হতে হতে শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল তার মাত্র একটি খুঁটি। অতি সম্প্রতি তাদের পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগে সেখানে আবারও একটি শহীদ মিনার তৈরি করা হয়েছে। 

শনিবার ( ১২ মার্চ ) সিলেট-৩ আসনের সাংসদ হাবিবুর রহমান হাবিব মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির একদল দেশপ্রেমিককে নিয়ে সেই শহীদ মিনারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন।

শহীদ নেওয়ার আলীর জীবিত পাঁচ ভাই আনোয়ার আলী, মনোহর আলী, সিরাজ  আলী, মো. শাহনুর আলী, নিমার আলী ( দিলওয়ার হোসেন) ও একমাত্র বোন রুকসানা বেগম এবং তাদের অন্যান্য উত্তরসুরীর একমাত্র চাওয়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ নেওয়ার আলীর অবদানের সরকারী স্বীকৃতি। এ ব্যাপারে তারা সিলেটের জেলা প্রশাসকের বরাবরেও একটি আবেদন করেছেন। তবে তার কোন জবাব এখনো পাননি। সেই অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন তারা।



সিলেট প্রতিদিন / ইকে


Local Ad Space
কমেন্ট বক্স