রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০১:৫১ অপরাহ্ন

নাম প্রকাশ করবে সার্চ কমিটি

  • প্রকাশের সময় : ১৪/০২/২০২২ ১১:৫৯:০৯
এই শীতে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের
Share
12

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার পদে জমা হওয়া সব নামের তালিকা প্রকাশ করবে সার্চ কমিটি। গতকাল রোববার বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে সভার শুরুতে সার্চ কমিটির সভাপতি বিচারপতি ওবায়দুল হাসান একথা বলেন। বিএনপি, সিপিবিসহ যেসব রাজনৈতিক দল এখনো প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার পদে নাম প্রস্তাব করেনি তাদের সোমবার বিকাল ৫টার মধ্যে নাম দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সার্চ কমিটির সভাপতি বলেন, শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যই এই সময় বাড়ানো হলো। মন্ত্রিপরিষদের ওয়েবসাইটে সেগুলো প্রকাশ করা হবে এবং গণমাধ্যমেও বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করা হবে।

মূলত বিশিষ্টজনদের অনুরোধেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সার্চ কমিটির বেঁধে দেয়া সময় ১০ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ ২৪টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নামের সুপারিশ করেছে। কিন্তু বিএনপি, সিপিডি, বাসদসহ নিবন্ধিত বেশকিছু রাজনৈতিক দল এখনো নামের তালিকা দেয়নি। রোববারের সার্চ কমিটি প্রধানের ঘোষণা অনুযায়ী, এখন ৩৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে বাকি ১৫টি সোমবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত নাম প্রস্তাবের সুযোগ পাবে।

এতে করে বিএনপি চাইলে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার হিসেবে তাদের নাম প্রস্তাব করতে পারবে। রোববার বিকাল ৪টা ২০ মিনিটে ১৮ জন বিশিষ্ট নাগরিককে নিয়ে তৃতীয় সেশনের বৈঠক শুরু করে রাষ্ট্রপতির গঠন করে দেয়া সার্চ কমিটি। এ সেশনে অংশ নিতে ২৩ জন বিশিষ্ট নাগরিককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে সভায় অংশ নেন ১৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক।

এরা হলেন- শিক্ষাবিদ জাফর ইকবাল, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাজ্জাদ আলী জহির (বীরপ্রতীক), সাবেক এডিশনাল আইজিপি নুরুল আলম, সুরকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, সুজনের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, শিক্ষাবিদ আইনুন নিশাদ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখওয়াত হোসেন, অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান, প্রজন্ম-৭১ এর ডাক্তার নুজহাত চৌধুরী, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ড. তোফায়েল আহমেদ এবং কবি মহাদেব সাহা উপস্থিত আছেন। মিটিং শেষে সার্চ কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালনকারী মন্ত্রী পরিষদ সচিব গণমাধ্যমকে বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার পদে এখন পর্যন্ত ৩২৯ জনের নামের তালিকা পাওয়া গেছে। জমা হওয়া নামের তালিকা সোমবার ওয়েব সাইটে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হবে।

তিনি বলেন, বিশিষ্ট নাগরিক ডা. জাফরুল্লাহ শনিবার মিটিং-এ সার্চ কমিটিকে আহ্বান করেছিলেন যেসব রাজনৈতিক দল ইসি কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে না তাদেরকে ফের আহ্বান করতে, বিষয়টি আমলে নিয়ে সার্চ কমিটি যেসব রাজনৈতিক দল এখনো প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার পদে নাম প্রস্তাব করেনি তাদেরকে সোমবার বিকাল ৫টার মধ্যে নাম জমা দেয়ার আহ্বান করা হচ্ছে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে জমা দেয়া কাউকে না নেয়া, রাষ্ট্রপতির কাছে দেয়া নামের তালিকা প্রকাশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, নারী প্রতিনিধিত্ব, আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে প্রধানমন্ত্রীকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে- এমন সৎ ও সাহসী ব্যক্তির নাম নির্বাচন কমিশনার হিসেবে সার্চ কমিটির কাছে প্রস্তাব করেছেন বিশিষ্টজেনরা।

মিটিং শেষে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, শুধু নির্বাচন কমিশন চাইলেই সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক দলসহ অনেক বিষয় জড়িত। তাই আমি মনে করি, সার্চ কমিটিকে এমন ব্যক্তি খুঁজে বের করতে হবে যিনি সৎ এবং সাহস নিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যক্তি পাওয়া যাবে না। নিরপেক্ষ বলেও কোনো ব্যক্তি নেই। ইসিতে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হলেই চলবে।

বাংলাদেশে নিরপেক্ষ লোক পাওয়া কঠিন। মুনতাসীর মামুন বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন কমিশন চেয়েছি। সেখানে আমলাতন্ত্র ও জুডিশিয়ারির যে ধারায় কমিশনে নিয়োগ দেয়া হয় সেটা বাদ দিতে বলেছি। আমরা চাই কমিশনে সিভিল সোসাইটি এবং নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকুক। সবকিছু সার্চ কমিটির ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী নন এমন কাউকেও কেউ চাইবে না। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রশ্নে রাজনৈতিক দলের প্রস্তাব নেয়ার ক্ষেত্রে আপত্তির কথা জানান সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।

তিনি বলেন, যদি স্বাধীন নির্বাচনের কথা বলেন তাহলে দলের প্রস্তাব নিতে আমার আপত্তি আছে। কোনো দলের প্রস্তাব আমি নিতে চাই না। তিনি বলেন, আমি বলেছি সার্চ কমিটি ৪০০/৫০০ লোক বের করুন এটা বড় কথা নয়। মূল কথা হচ্ছে আমাদের নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। নির্বাচনে মানুষের কোনো বিশ্বাস নেই। বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে যে লোকগুলো প্রয়োজন, তাদেরকে সার্চ করুন। এবং যাদের দ্বারা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, সেই সাহস তারা রাখবে এমন লোক খুঁজে বের করতে হবে। রাজনীতি যত খেলাই হোক না কেন, নির্বাচন যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য না হবে, দেশে এবং বিদেশে- আর আগামী নির্বাচন যদি আগের মতো হয়, তাহলে আমরা বাংলাদেশিরা একটা বিপদের মুখে পড়তে যাচ্ছি।

নির্বাচন কমিশনে যারা আসবেন, তাদেরকে মনে রাখতে হবে- এটা আবেগে ধরতে হবে, অনুরাগে ধরতে হবে যে, আপনি এই সংস্থাকে ধরে রাখবেন এবং যা করণীয় সেটার জন্য যা যা দরকার করবেন। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন যেন গত দুই নির্বাচনের মতো না হয়। নির্বাচন হতে হবে সর্বজন গৃহীত। শতভাগ গৃহীত কোনো নির্বাচন হয় না। নির্বাচন হতে হবে- জনগণের কাছে যারা ভোট দিচ্ছে, ভোট দিতে পারছে, ভোট দিতে পারবে তাদের মতামত যেন প্রতিফলিত হয়। সেটা যেভাবেই হোক। এক্ষেত্রে যেসব রাজনৈতিক দল যে নামগুলোর প্রস্তাব করেছে তা প্রকাশ করা উচিত। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানে বলা আছে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। এখানে কিন্তু বলা নেই দলীয়ভিত্তিক নির্বাচন কমিশন। বিশ্বে তিন-চার রকমের নির্বাচন কমিশন আছে।

দলীয়ভিত্তিক আছে, সরকারি নির্বাচন কমিশন আছে, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন আছে। এখানে কোনো দল যদি নাম দিয়ে থাকে, তিনি যত ভালো ব্যক্তিই হন না কেন, তিনি অত্যন্ত সাহসী ব্যক্তি হতে পারেন, ভালো ব্যক্তি হতে পারেন, অথবা তার চাইতে সৎ ব্যক্তি কেউ নেই, তার ওপরে দলের লেভেল পড়ে যাবে। যেটা আমরা গত নির্বাচন কমিশনে দেখেছি। তাহলে কি প্রস্তাবকারী দলের নাম প্রকাশের প্রয়োজন মনে করছেন না, এমন প্রশ্নে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমি তা-ই মনে করি। তবে যতগুলো নাম দিয়েছে সবগুলো নাম প্রকাশ করা হোক। আর যদি স্বাধীন নির্বাচনের কথা বলেন তাহলে দলের প্রস্তাব নিতে আমার আপত্তি আছে।

কোনো দলের প্রস্তাব আমি নিতে চাই না। এদিকে শাহরিয়ার কবির বলেছেন, ইসিতে জমা দেয়া ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ প্রসঙ্গে আমরা বলেছি তা প্রকাশ করা ঠিক হবে না। কারণ, কে কোন নাম দিলো এটা প্রকাশ করলে কথা উঠবে। তবে যাকেই নির্বাচিত করা হবে তিনি যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে হন, তিনি সংবিধানে বিশ্বাসী হন। তিনি আরও বলেন, যোগ্য ব্যক্তি বাছাইয়ে কোনো সময় নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলে তালিকা পাঠাতে সার্চ কমিটিকে সময় নিতে বলেছি। কমিশনে যোগ্য ও সাহসীদের দেখতে চাই। তাকে অবশ্যই সৎ, সাহসী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। শিক্ষাবিদ ড. জাফর ইকবাল বলেন, দেশে এখনো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের লোক রয়েছে। তাই কোনো ব্যক্তি এককভাবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এই অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পাশাপাশি সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের এমন একটা দেশ হবে। যে দেশে যারা রাজনীতি করবে, তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে হতে হবে। যতদিন সেটা না হচ্ছে আমরা বুঝবো আমাদের দেশের রাজনীতি সঠিকভাবে হচ্ছে না। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন হবে এমন যার অনন্য গুণাবলি থাকতে হবে। তাকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক হতে হবে। আমরা যারা সার্চ কমিটির মিটিংয়ে ছিলাম সবাই একবাক্যে গুরুত্বসহকারে শুনেছে।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করা নাম, কোন যোগ্যতাবলে তাদের নাম সুপারিশ করা হয়েছে সে সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদনসহ যেন প্রকাশ করা হয়।

অনুসন্ধান কমিটির কাছে আমার চারটি সুস্পষ্ট সুপারিশ করেছি- ১. আইনে বর্ণিত ‘স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার নীতি’ অনুসরণের জন্য কমিটি কী পদ্ধতি গ্রহণ করেছে এবং ‘সুনামের’ অধিকারী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার জন্য কী মানদণ্ড চিহ্নিত করেছে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে বলেছি। ২. যে ৩২৯ জনের নাম এরই মধ্যে অনুসন্ধান কমিটির কাছে প্রস্তাবিত হয়েছে, স্বচ্ছতার খাতিরে সে তালিকা এবং কোন ব্যক্তি, দল বা সংগঠন কর্তৃক তারা প্রস্তাবিত হয়েছে তাদের নাম অনতিবিলম্বে গণবিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করতে বলেছি। ৩. সর্বোচ্চ সতর্কতা ও বিবেচনা ব্যবহার করে ২০ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করে, যার মধ্যে পাঁচজন নারী, এটি গণবিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করতে বলেছি। ৪. সততা ও সুনাম-দুর্নামের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অন্তত তিনজন নারীসহ ১০ জনের চূড়ান্ত তালিকা একটি প্রতিবেদনসহ তৈরি করতে বলেছি। অর্থনীতিবিদ ড. খলীকুজ্জমান বলেন, ইসিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লোকদের নিয়োগ দিতে হবে। এ ব্যাপারে ছাড় দেয়া ঠিক হবে না। পাশাপাশি নারী ও সংখ্যালঘু সদস্যও কমিশনে রাখতে হবে।


সিলেট প্রতিদিন / এসএ


Local Ad Space
কমেন্ট বক্স