বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘প্যানেলভিত্তিক রাজনীতি’ থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ।
আর তাই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ পলিসিতে চলেন বলে মন্তব্য করেছেন এক শিক্ষক।
ওই শিক্ষক বলেন, উপাচার্য প্রশাসনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষক প্যানেলকে খুশি রাখতে গতানুগতিক ধারা অনুসরণ করে আসছেন। প্যানেলে যোগ্য শিক্ষক না থাকা সত্বেও সেই প্যানেল থেকে বিভিন্ন মাঠ প্রশাসনের দায়িত্ব দিয়ে আসছেন, এ জন্যই তৈরি হচ্ছে সমস্যা। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক রয়েছেন। মূল কথা, দায়িত্বে অযোগ্য মানুষ আসলে তো সমস্যা হবেই।
মাঠ প্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বদায় আগে পদে থাকা নির্ধারিত প্যানেল থেকেই নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। গতানুগতিক প্যানেল থেকে নিয়োগ দিতে গিয়ে ‘অযোগ্য’ শিক্ষকদেরকে দায়িত্ব দেওয়ার ফলেই নানাবিধ সমস্যা হয়ে থাকে বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ শাবিতে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ২০১৭ সালে আগস্ট মাসে। ২০২১ সালের জুন মাসে প্রথম মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ পান তিনি। উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে রদবদল হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও পূর্বের পদধারী শিক্ষকদের প্যানেল থেকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া থেকে বের হতে পারেননি।
শিক্ষার্থীদের উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সর্বশেষ গতকাল (১০ ফেব্রুয়ারি) ‘ব্যক্তিগত ও পারিবারিক’ কারণ দেখিয়ে প্রক্টর ড. আলমগীর কবীরকে অব্যাহতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
কিন্তু সেখানে আগের ন্যায় প্রক্টর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আওয়ামী-বামপন্থী শিক্ষক প্যানেল ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তচিন্তা চর্চায় ঐক্যবদ্ধ শিক্ষকবৃন্দ’ থেকে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইশরাত ইবনে ইসমাইলকে। এমনকি ড. আলমগীর কবীরের আগে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলেন একই প্যানেল থেকে ইংরেজি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক আবু হেনা পহিল।
এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে ছিলেন (একই প্যানেল) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক জহীর উদ্দিন আহমদ।এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্যানেল মেইনটেইন করা হয়। আন্দোলন চলাকালীন এ দায়িত্বে ছিলেন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক জহীর উদ্দিন আহমদ। তিনিও আওয়ামী-বামপন্থী ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তচিন্তা চর্চায় ঐক্যবদ্ধ শিক্ষকবৃন্দ’ প্যানেলের শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের দাবি পূরণে গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালকের পদেও নিয়ে আসা হয়েছে রদবদল।
‘অসুস্থতার’ কারণ দেখিয়ে অধ্যাপক জহীর উদ্দিনকে অব্যাহতি দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে (একই প্যানেল) সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক আমিনা পারভীনকে। এমনকি অধ্যাপক জহীর উদ্দিন আহমদ ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগের আগে এ দায়িত্বে ছিলেন (একই প্যানেল) গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ তালুকদার।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে পাঁচটি আবাসিক হল রয়েছে। হলগুলোতেও নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা গেছে একই চিত্র। যে প্যানেল থেকে আগে শিক্ষক দেওয়া ছিল যেসব হলে, সেসব হলে একই প্যানেল থেকে প্রভোস্ট নিয়োগে এক অদ্ভুত চিত্র বহাল রেখেছেন উপাচার্য।উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হলো বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হল।
এই হলে বর্তমানে প্রভোস্ট হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজিয়া চৌধুরী। তিনি আওয়ামীপন্থী ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষকবৃন্দ’ প্যানেলের শিক্ষক। আন্দোলনের মুখে ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল (একই প্যানেল) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জুবাইদা কনক খানকে। যাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু। এই হলের প্রভোস্ট ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জাফরিন আহমেদ লিজাও একই প্যানেলের শিক্ষক ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী হলের প্রভোস্ট হিসেবে রয়েছেন পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের বর্তমান বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. জায়েদা শারমিন। তিনি আওয়ামী-বামপন্থী ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তচিন্তা চর্চায় ঐক্যবদ্ধ শিক্ষকবৃন্দ’ প্যানেলের শিক্ষক।
এর আগে এ হলে প্রভোস্টের দায়িত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক অধ্যাপক আমিনা পারভীন। তিনিও একই প্যানেলের শিক্ষক।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেও দেখা গেছে এমন চিত্র। বর্তমানে এ হলে প্রভোস্টের দায়িত্বে রয়েছেন লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সামিউল ইসলাম। তিনিও ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তচিন্তা চর্চায় ঐক্যবদ্ধ শিক্ষকবৃন্দ’ প্যানেলের শিক্ষক।
এমনকি এ হলে এর আগে দু’মেয়াদে দায়িত্বে ছিলেন একই প্যানেলের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম হাসান জাকিরুল ইসলাম।সৈয়দ মুজতবা আলী হলে বর্তমান প্রভোস্টের দায়িত্বে রয়েছেন ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সাইদ আরফিন খান নোবেল। তিনি আওয়ামীপন্থী ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষকবৃন্দ’ প্যানেলের শিক্ষক। এমনকি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদে উপাচার্য থাকাকালীন এ হলের প্রভোস্টের দায়িত্বে ছিলেন (একই প্যানেল) জেনেটিং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ ইকবাল।
শুধুমাত্র ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে শাহপরান হলের প্রভোস্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে। বর্তমানে প্রভোস্ট হিসেবে রয়েছেন ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষকবৃন্দ’ প্যানেলের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান খান। তবে এর আগে দায়িত্বে ছিলেন ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তচিন্তা চর্চায় ঐক্যবদ্ধ শিক্ষকবৃন্দ’ প্যানেলের শিক্ষক পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মোহাম্মদ শাহেদুল হোসাইন।
তবে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান খান বর্তমান উপাচার্যের ঘনিষ্ঠজন বলে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে নিয়োগ পেয়েছেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক জানিয়েছেন, উপাচার্য আসলে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ পলিসিতে চলেন। তিনি প্রশাসনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষক প্যানেলকে খুশি রাখতে গতানুগতিক ধারা অনুসরণ করে আসছেন। প্যানেলে যোগ্য শিক্ষক না থাকা সত্বেও সেই প্যানেল থেকে বিভিন্ন মাঠ প্রশাসনের দায়িত্ব দিয়ে আসছেন, এ জন্যই তৈরি হচ্ছে সমস্যা। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক রয়েছেন। মূল কথা, দায়িত্বে অযোগ্য মানুষ আসলে তো সমস্যা হবেই।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ওমর ফারুক বলেন, আমাদের আন্দোলনে দাবির প্রেক্ষিতে বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্ট, ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক এবং প্রক্টর পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্ত এ পরিবর্তন আসলেও নিয়োগ হয়েছে ‘গুরুর পরিবর্তে শিষ্যের কিংবা শিষ্যের পরিবর্তে গুরুর’। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক রয়েছেন। গতানুগতিক ও প্যানেল ভিত্তিক প্রশাসনিক পদে শিক্ষক নিয়োগের কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ এ পরিস্থিতি। অথচ তিনি সেই গতানুগতিক ও প্যানেলভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি।
এই ভিসিকে আমরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক মুহূর্তের জন্য দেখতে চাই না। দ্রুতই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বর্তমান ভিসিকে সরিয়ে নতুন যোগ্য ও দক্ষ কাউকে নিয়োগের জন্য সরকারকে আহ্বান জানান শিক্ষার্থীরা।-আরটিভি




প্রতিদিন ডেস্ক



