বয়স ৮৮ হলেও বারবার বলছিলেন ৮০। কেউ একজন বিষয়টা স্মরণ করিয়ে দিলে প্রাণবন্ত হাসিতে স্বীকার করে নিলেন তা। এমন ঢেউতোলা হাসি দেখে কে বলবে, মানুষটার বয়স প্রায় ৯০ ছুঁই ছুঁই! জীবনের অধিকাংশ সময় রাজধানী ঢাকা আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাটিয়ে দেয়া সিলেটবাসীর অভিভাবক আবুল মাল আব্দুল মুহিত গুণীশ্রেষ্ঠ সম্মাননা অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্য রাখতে গিয়ে ছেলে বেলায় ফিরে গেলেন। সবার ছেলেবেলার সাথে যেমন মা বাবা আর নানার বাড়ি বিশাল একটা স্থান দখল করে থাকে, সাবেক অর্থমন্ত্রীর ছেলেবেলাটাও এর বাইরে নয়। নিজেই তার বক্তব্যের একটা বিশাল অংশজুড়ে সেই স্মৃতিচারণই করলেন।
বয়সের ভারে শরীরটা তার কিছুটা কাবু হলেও মনটা যে এখনো সবুজ সতেজ, কথা বলতে বলতে দরাজ গলায় হাসির ঢেউ দেখে সে সত্যটাই জানলেন উপস্থিত সচেতন মহল।
বুধবার সন্ধ্যায় সিলেট মহানগরীর সুরমাতীরে আলী আমজদের ঘড়ি ও সার্কিট হাউস সংলগ্ন এলাকায় সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে সাবেক অর্থমন্ত্রীকে গুণীশ্রেষ্ঠ সম্মাননা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র কাউন্সিলর অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ ছাড়াও প্রচুর সাধারণ নাগরিক উপস্থিত ছিলেন।
মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে আবুল মাল আব্দুল মুহিত তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই সূধিজনের উদ্দেশ্যে বলেন, জানিনা কোন যোগ্যতায় আজ আমাকে এই সম্মাননা দেয়া হচ্ছে। তবে একটা বিষয় আমি খুব ভালো করেই জানি। আর তা হলো জনসেবা বা জনমঙ্গল সাধন একটি মহান কাজ। সেই কাজটি করতে পেরেছি বলেই হয়ত আজ আমি এখানে।
এরপরই এই ভাষা সৈনিক তাঁর মা ও বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ শুরু করেন। বলেন, মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁর মা ২৮ বছর বয়সী স্বামীর সংসারে এসেছিলেন এবং কঠিন একটি দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না তবে স্বামীর কাছ থেকে এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে প্রচুর শিখেছেন। তিনি যা শিখেছেন তা আবার অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সেই কঠিন সময়টাতে তিনি এমন ছিলেন। আর এমনটা হতে পেরেছিলেন আমার আব্বার সহযোগীতায়।
নিজের পরিবার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি সৌভাগ্যবান যে, এমন একটা পরিবারে আমার জন্ম হয়েছে। আমি আমার জীবন নিয়ে গর্বিত। নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করা মোটেও দোষের কিছু নয়। বরং এটি মহৎ কাজ। কারণ, সেজন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয় বা গড়ে তুলতে হয়।
এরপর চলে আসেন নানার বাড়ি নিয়ে স্মৃতিচারণে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নানার বাড়ি আমরা যেতাম বছরে দুইবার। একবার শুকনো মৌসুমে, আরেকবার বর্ষায়। দু’বারই যাওযা হতো বড় নৌকা বা জাহাজে। সকাল ১০টা সাড়ে ১০টায় সেটা ছাড়তো আর পৌঁছাতাম পরদিন ভোরে। গ্রামে যা হয়, সহজে বন্ধুবান্ধব জুটে যেতো। আমরাও তা পেয়েছিলাম।
সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেন, সৈয়দপুর গ্রামটি ( জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ) ইসলাম প্রচারের ব্যাপারে সারাদেশে বিখ্যাত। তখন পশ্চাদপদ একটি গ্রাম ছিল সেটি।
এরপর সাবেক অর্থমন্ত্রী তার বাবা এবং দাদাকে নিয়েও স্মৃতিচারণ করেন। দাদা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি একজন শিক্ষিত মানুষ ছিলেন। বাবাও। সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসাবে তারা দু’জনেই কাজ করেছেন। বাবা আইনজীবীও ছিলেন।
এছাড়াও সাবেক অর্থমন্ত্রী সেকালের সাম্প্রদায়িক সমস্যা নিযে কথা বলেছেন। তবে সিলেট যে সবসময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আদর্শস্থান তাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর পিতা যে পূজা কমিটির সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করতেন তাও উল্লেখ আবুল মাল আব্দুল মুহিত।
সম্মাননা অনুষ্ঠানের সিলেটের নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে স্বাগত বক্তব্য রাখেন নর্থইষ্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইলিয়াস উদ্দিন বিশ্বাস।
আর মেয়র আরিফের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী।




প্রতিদিন প্রতিবেদক



