সাকিব কেন বারবার বিতর্কিত হচ্ছেন? অনেক প্রশ্ন সাকিব আল হাসানকে নিয়ে। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই প্রচারমাধ্যমের পাদপ্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত সাকিব। আবার খবরে সাকিব নতুন বিতর্কে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফর নিয়ে বিসিবি-সাকিব ম্যারাথন নাটকে রোজ যোগ হচ্ছে নতুন অঙ্ক। তবে এর সব দায় কি একা সাকিবের, নাকি দায় আছে বিসিবির কর্তাব্যক্তিদেরও?
সাকিব আল হাসান; তর্কাতীতভাবে দেশের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া তারকা। নিজের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়ে দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করেছেন এ ক্রিকেটার। বাইশ গজে উইলোবাজি কিংবা বাঁহাতি স্পিনে বিপক্ষ দলের ব্যাটারকে কুপোকাত করতে সাকিবের জুড়ি মেলা ভার। বিশ্বজুড়ে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা সাকিব উজ্জ্বল মাঠের বাইরেও। নিয়মিত গরম রাখেন গণমাধ্যম। খেলার মাঠের সাকিবকে ছাড়িয়ে তার ব্যক্তিজীবন পর্যন্ত মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। সাকিবও যেন পছন্দ করেন এসব। মজার ছলে নিজেও অবশ্য বলেন সে কথা। তাই বুঝি মাঝে মাঝে বিতর্ক উসকে দেন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। নতুন বিতর্কে অবশ্য সাকিব হয়ে পড়েছেন কোণঠাসা। সহানুভূতি কিংবা সমর্থন কোনটাই নেই তার পক্ষে। কিন্তু সাকিব কি একা দায়ী উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য? প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কতটা পেশাদারত্বের সঙ্গে সামলিয়েছে পরিস্থিতি, তা নিয়েও। গণমাধ্যমের সামনে যেভাবে কথা বলেছে কর্তাব্যক্তিরা তাতে ক্রিকেটারদের সঙ্গে বিসিবির দূরত্ব সৃষ্টির সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটের যুগে জাতীয় দলে ক্রিকেটারদের নিয়মিত খেলাতে বেগ পেতে হচ্ছে প্রায় সব দেশের ক্রিকেট বোর্ডকেই। অঢেল টাকার ঝনঝনানিতে জাতীয় দলের ডিউটি বাদ দিয়ে ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলতে দেখা গেছে অনেককেই। এইতো বাংলাদেশের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের কথাই ধরা যাক। স্বাগতিক দলের স্কোয়াডের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের জাতীয় দল থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছেন আইপিএলে খেলবেন বলে। বোর্ডও মেনে নিয়েছে সে সিদ্ধান্ত।
সাকিবের এবারের বিতর্কের শুরুর সঙ্গেও কিন্তু আছে আইপিএলের যোগ। টুর্নামেন্টের নিলামের আগে সাকিব বোর্ডে চিঠি দিয়ে চেয়েছিলেন ছুটি। বোর্ড তখন মেনে নিয়েছিল বিষয়টি। কিন্তু খেলা ঘুরে যায় সাকিব আইপিএলের নিলামে অবিক্রিত থাকলে। সাকিবকে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে খেলতে আহ্বান জানায় বোর্ড। এর পরে খেলা না খেলা নিয়ে জল ঘোলা হলো বেশ। শেষে সাকিবকে নিয়েই দল ঘোষণা হলে শেষে এসে সাকিব যা জানালেন তা দেশের ক্রিকেটে এবারই প্রথম।
মানসিক অবসাদে জাতীয় দল থেকে ছুটি চেয়ে বসেন সাকিব। ক্রীড়াক্ষেত্রে মানসিক অবসাদে ক্রিকেট ছাড়ার প্রচুর উদাহরণ থাকলেও দেশের ক্রিকেটে সাকিবই প্রথম মানসিক অবসাদের কথা বললেন।
সাকিব যেভাবে, যে মুহূর্তে ছুটি চাচ্ছিলেন তা একদিক থেকে চরম অপেশাদারত্বের পরিচয় দেয়। কিন্তু বিসিবি সভাপতি যেভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন তা অনেকের চোখে বালখিল্য আচরণ। ক্রিকেটারের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিসিবি যে চরম উদাসীন তাও জানা গেল সাকিব ইস্যুতেই।
তবে শেষমেশ দুপক্ষের সন্ধি হলো, সাকিবও দক্ষিণ আফ্রিকা গেল কিন্তু প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলল না মোটেই।
সাকিব আল হাসান কি এখন ক্রিকেটার কম বিজনেসম্যান বেশি? -সাকিবের ব্যবসায় হাতেখড়ি ২০১৫ সালে ধানমন্ডিতে সাকিব'স ডাইন নামের রেস্টুরেন্ট দিয়ে। যদিও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা যায়, সাকিব ব্যবসায় লগ্নি শুরু করেন ২০১০ সাল থেকেই। এর পর একে একে সাকিব বাড়িয়েছেন তার ব্যবসার পরিধি। দেশের শেয়ারবাজার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রসাধনী, ট্রাভেল এজেন্সি, হোটেল, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, কাঁকড়া ও কুঁচের খামারসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে তার। দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে বড় অংকের বিনিয়োগ করেছেন সাকিব আল হাসান।
এর বাহিরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পণ্যের দূতিয়ালী করেন সাকিব।
দেশসেরা অলরাউন্ডার খেলার মাঠে সবাইকে টেক্কা দিলেও ব্যবসার মাঠে ভালো খেলতে পারেন নি। দেশের ভেতরে সাকিবের কোন ব্যবসাই লাভের মুখ দেখেনি। তাই দেশের ব্যবসা গুটিয়ে সাকিব হয়েছেন বিদেশমুখী। ইউএসএ ও আরব দেশে সাকিব বাড়িয়েছেন ব্যবসার পরিধি। আর এসবকিছুই ২০১৫ সালের পর থেকে।
সময়টা লক্ষ্য করলে দেখা যায় এই সময়ের পর থেকেই সাকিব ধীরে ধীরে জাতীয় দলে অনিয়মিত হতে থাকে। সাকিব ঘরের মাঠে মোটামুটি সব সিরিজে অ্যাভেইলেবল হলেও বিদেশ সফরে সাকিবকে পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। ২০১৭ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে প্রথমবার সাকিব জাতীয় দল থেকে ছুটি নেন। এর পরে ইনজুরি, নিষেধাজ্ঞা ও ব্যক্তিগত ছুটিতে সাকিব বারবার এড়িয়েছেন জাতীয় দলের টেস্ট সিরিজ। ২০১৭ সালের পর থেকে মাত্র ৩০ শতাংশ টেস্টে সাকিবকে পেয়েছে জাতীয় দল। পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায় ২০১৭ সালের পর থেকে সাকিব জাতীয় দলের মোট ১২টি সিরিজ মিস করেছেন। যার বেশকিছু অবশ্য ইনজুরির কারণে। বাকিটা ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে নেওয়া ছুটির কারণে। এ সময়ে সাকিবকে দেখা গেছে বিশ্ব জুড়ে ফ্রাঞ্চাইজি লিগে খেলতে। খেলা, পণ্যের দূতিয়ালী ও বিনিয়োগ থেকে আয় করা সাকিবের নিট সম্পদের পরিমাণ ৩.৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি; জানাচ্ছে গণমাধ্যম।
ক্যারিয়ারের এ পর্যায়ে সাকিবকে ক্রিকেট খেলায় কম সময় দিয়ে বরং ব্যবসা বাড়াতেই বেশি মনোযোগী মনে হচ্ছে। তাই সাকিব থোড়াই কেয়ার করেন দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তাকে নিয়ে চলতে থাকা সমালোচনাকে।
সাকিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ তো মোটামুটি খতিয়ে দেখা হলো এবার সাকিবের দিক থেকেও দেখা যাক বিসিবির ভুলগুলিও। বিসিবর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা খেলোয়াড়দের সুশৃঙ্খল রাখতে না পারা। ক্রিকেটারদের সঙ্গে বিসিবির সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক। গণমাধ্যমের সামনে খেলোয়াড় ও বিসিবিকে প্রায়ই দেখা যায় একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষদাগার করতে। দুপক্ষ মিডিয়ার সামনে যতটা স্বতঃস্ফূর্ত নিজেদের মধ্যে তাদের দূরত্ব যেন আরও বেশি। সাকিব ইস্যুতে বিসিবি সভাপতি যেভাবে গণমাধ্যমে তার খেলোয়াড়ের সমালোচনা করেছেন তা অশোভন। বিসিবির সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার কিন্তু ক্রিকেটাররাই। তাই অভিভাবক হিসেবে তার যা খুশি তাই বলাটা সমীচীন নয়।
ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে এসে সিনিয়র ক্রিকেটাররা বেছে খেলার কিছুটা স্বাধীনতা পেতেই পারেন। তাদের সে সুযোগ দিতে বিসিবি এফটিপি অনুযায়ী প্লান করে নিতে পারে বছরের শুরুতেই। যেখানে বিসিবি আরো বেশি খেলোয়াড়কে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে জায়গা দিয়ে সহজেই সমাধান করতে পারত সমস্যার, সেখানে দিনে দিনে বিসিবি সীমাবদ্ধ করছে চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়ের তালিকা। তাই সিনিয়ররা কোন সিরিজ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করলে বিপাকে পড়ছে বিসিবি। অথচ বড় দলের অন্যতম লক্ষণ নির্দিষ্ট কারো ওপর নির্ভরতা না থাকা।
ভারত বা অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড কিংবা নিউজিল্যান্ডের মত দল পরীক্ষা নিরীক্ষার উদ্দেশ্যে প্রায়ই কম গুরুত্বপূর্ণ সিরিজে দ্বিতীয় সারির দল খেলায়। এভাবে তারা অনেক খেলোয়াড়কে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। বিসিবি এখনও সে পথে হাঁটার সাহস করেনি, তাই অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও তরুণ দল খেলানোর সাহস করে না। যার কারণে তৈরি হয়নি দলের সিনিয়রদের বিকল্প।
আম্বাতি রাইডু হতে পারে এর উত্তম উদাহরণ। ক্যারিয়ারে জাতীয় দলে জায়গা পাকা না করতে পারা এই ব্যাটার কোহলিদের অনুপস্থিতিতে দলের ব্যাটিং ভরসা হয়ে ৫৫টি ওয়ানডে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেখানে পারফর্ম করে দলে বাড়াতে পেরেছিলেন প্রতিযোগিতাও। বিসিবি পারেনি এমন বিকল্প তৈরি করতে।
ক্যারিয়ার সায়াহ্নে থাকা সাকিব আল হাসানসহ বাকি সিনিয়রদের বিকল্প বের করতে হবে বিসিবিকেই। বিকল্প না থাকায় সুযোগ থাকে সর্বেসর্বা হয়ে ওঠার। তাতে দলের পরিবেশ নষ্ট হয়। দলে তৈরি হয় বৈষম্য। ভবিষ্যতের তারকাদের জন্য এমন দৃষ্টান্ত রেখে যাবেন না দেশের ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ও বাকি পাণ্ডবরা। বিসিবি ও ক্রিকেটারদের পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নতির বিকল্প নেই তাই।




স্পোর্টস ডেস্ক



