সিলেটের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের নদী সুরমা। সিলেট নগরী সুরমা নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে। এক সময় নদী-সাগরকে ঘিরেই বন্দরনগরী গড়ে উঠতো। সিলেটও সেভাবে গড়ে উঠেছে। উজানে ভারত থেকে নেমে আসা বাংলাদেশের সীমান্ত জকিগঞ্জের বরাক মোহনায় এর উৎপত্তি। সেখান থেকে ভাগ হয়ে বাংলাদেশে প্রবাহমান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারা।
সুরমা সিলেট নগর ও সুনামগঞ্জের উপর দিয়ে প্রবাহিত। ২৪৯ কিলোমিটার বা ১৫৫ মাইল দৈর্ঘ্যের নদীটি সুনামগঞ্জ জেলার বাউলাই নদীর মোহনায় মিশেছে। বর্ষায় বন্যাপ্রবণ সুরমায় শীতে দেখা দেয় নাব্যতা সংকট। নাব্যতা সংকটে সুরমা নদীর অস্থিত্ব হুমকির মুখে। নদীর অনেক স্থানে চর জেগেছে। বাচ্চারা খেলাধুলা করছে।
অনেক জায়গায় এমন অবস্থা হয়েছে যে, বোঝাই যায় না এক সময় সেখানে নদী ছিল। মনে হয় যেন- এটা নদী নয়, বাচ্চাদের ফুটবল, ক্রিকেট খেলার মাঠ। অথচ- বর্ষাকালে ওই নদীতে জাহাজ চলে। শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ বন্ধ থাকায় বন্ধ রয়েছে অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল।
এর অন্যতম কারণ হিসেবে রয়েছে- নদীর দু’পাশ দখল এবং দূষণ। নদীর চারদিকে ময়লা আবর্জনা আর দখলের ফলে ফাল্গুন মাস আসার আগেই শুকিয়ে যায় সুরমা। জানা যায়, সুরমাকে ঘিরেই বৃহত্তর সিলেটের হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র গড়ে উঠেছে। সঙ্গত কারণেই নদীতে চর জাগায় হাওরের জীববৈচিত্রও সংকটে পড়ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়- সুরমা নদীর সিলেটের অংশ নাব্যতা হারাচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে ফেলা নগরের আবর্জনায়। বর্জ্যের স্তুপ আর পলিথিনে জমে ভরে গেছে নদীর তলদেশ। নদীর সিলেট জেলার বিভিন্ন অংশে পলিমাটি জমে চর সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়াও সুরমা নদীতে উপর শাহজালাল (র.) ১ম, ২য় ও তৃতীয় সেতু রয়েছে। যার পিলারে প্রায় অর্ধেক নদী দখল করে রয়েছে। ফলে জমে উঠেছে চর। দিন দিন ভরাট হচ্ছে নদী। পরিবেশবিদরা বলছেন, বর্জ্য, পলি মাটি সহ নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে সুরমা নদী ভরাট হলেও খননের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে উজানে বরাক মোহনা ভরাট হওয়ায় এই মৌসুমে ৭০ শতাংশ পানি চলে যায় কুশিয়ারায়। যে কারণে নদীর মোহনা খনন জরুরি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর এ অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে নৌকা ও ইঞ্জিনের ছোট ট্রলার ছাড়া বড় নৌযান চলাচল করতে পারে না সুরমার বুকে। আর সুরমায় পানি না থাকায় শাখা-প্রশাখাও শুকিয়ে প্রাণ হারিয়েছে জলজ উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন- সুরমা নদী সিলেট মহানগরীর মানুষের আবর্জনার ভাগাড়। নগরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত বিভিন্ন খাল ও ছড়া দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার পলিথিন ও প্লাস্টিক বোতল সুরমা নদীতে ফেলা হচ্ছে। ছড়া ও খাল সিটি করপোরেশন থেকে একাধিকবার পরিষ্কার করা হলেও মানুষের অসচেতনতা সুরমার জীবন বিপন্ন করে তুলছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের কাজিরবাজার মৎস্য ও কলার আড়তের ফেলা বর্জ্যে সিসিকের খাল হয়ে আসা আবর্জনায় নদী ভরাট হচ্ছে। একইভাবে নগরের ছড়ারপার খালের আবর্জনা ও এলাকার শুটকি আড়তের ফেলা বর্জ্যে ভরাট হচ্ছে নদীর তলদেশ।
এ ব্যাপারে নদী পরিব্রাজক দল সিলেট জেলার সভাপতি মোঃ আদিল হোসেইন সিলেট প্রতিদিনকে বলেন, সুরমা নদী নাব্যতা হারিয়ে অস্তিস্থ সংকটে। নদীকে বাঁচাতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, সিলেট মহানগরীর মাংস ব্যবসায়ীরা রাতে হাড্ডি সহ ময়লা আবর্জনা নদীতে ফেলে দেন। এছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলায় মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা কিছুদিন পূর্বে কোতোয়ালী থানা পুলিশকে সাথে নিয়ে রাতে অভিযান করে মাংস ব্যবসায়ী সহ সবজিওয়ালা ও ময়লা আবর্জনা পরিস্কারকদের সুরমা নদীতে এগুলো না ফেলার জন্য নিষেধ করেছিলাম। কিছুদিন তারা সুরমা নদীতে ময়লা আবর্জনা ফেলছিলেন না। এখন আবার সেই আগের মতই হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আমরা সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বরাবরেও মৌখিক অভিযোগ করেছি। নগরের ময়লা আবর্জনা নদীতে না ফেলে অন্য ব্যবস্থা করলে সুরমা নদী ভরাট থেকে রক্ষা পেত। আগামী ১৪ মার্চ নদী কৃত্য দিবস উপলক্ষ্যে আমরা মিডিয়ার সামনে সব তুলে ধরবো।




শামীম আহমদ



