পরকীয়ার কারণে সাবেক এসপি বাবুল আক্তার ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে তার স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন তার শ্বশুর, শাশুড়ি ও শ্যালিকা। মঙ্গলবার রাতে ঢাকার বনশ্রীর বাসায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) জিজ্ঞাসাবাদে এ অভিযোগ করেন তারা। এর আগে গত বছরে মে মাসে নগরের পাঁচলাইশ থানায় দায়ের হওয়া মামলায়ও একই অভিযোগ করেছিলেন মামলাটির বাদী বাবুল আক্তারের শ্বশুর মোশাররফ হোসেন।
সেই সময় বাবুল আক্তারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার নারী কর্মকর্তার সঙ্গে পরকীয়ার জেরে তার মেয়েকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই চট্টগ্রামের পরিদর্শক আবু জাফর মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘তদন্তের অংশ হিসেবে বাবুলের শ্বশুর, শাশুড়ি ও তার শ্যালিকাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’
গত বছরের ১২ মে স্ত্রী হত্যায় বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করেন মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন। পাঁচলাইশ থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে মাহমুদা খানম মিতুর বাবা মোশাররফ অভিযোগ করেন, কক্সবাজারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন বাবুল আক্তার আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএনএইচসিআর’র কর্মকর্তা ভারতীয় এক নাগরিকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। বিষয়টি জেনে যাওয়ার পর মিতুর সঙ্গে তার দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। এর জেরে বাবুল আক্তার মিতুকে খুনের পরিকল্পনা করেন এবং সহযোগীদের নির্দেশ দিয়ে মিতুকে খুন করান।
এজাহারে আরও বলা হয়, বাবুল আক্তারের মোবাইলে পাঠানো ওই কর্মকর্তার ২৯টি মেসেজ খুনের শিকার হওয়ার আগে মিতু তার ব্যবহৃত একটি খাতায় লিখে যান। এছাড়া বাবুল আক্তারকে ওই নারী কর্মকর্তার উপহার হিসেবে দেওয়া দু’টি বইয়ে তাদের দু’জনের মধ্যে সম্পর্কের কিছু লিখিত তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। বইগুলো পরে জব্দ করে পিবিআই। পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদের একই অভিযোগ করেন তিনি। মিতুর মা সাহেদা মোশাররফ ও বোন শায়লা মোশাররফও একই অভিযোগ করেন। জানতে চাইলে মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি, পরকীয়ার কারণে বাবুল আক্তার আমার মেয়েকে হত্যা করেছে।
যার সমস্ত তথ্য প্রমাণ তদন্ত সংস্থার হাতে দিয়েছি।’ তবে বাবুল আক্তারের আইনজীবী ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, ‘হত্যার পর বাবুল আক্তার তাদের বাসায় ছিলেন। তখন এসব অভিযোগ করেননি। উল্টো মেয়ের জামাইয়ের সুনাম করেছিলেন। এখন তিনি কেন এসব অভিযোগ করছেন। বাবুল আক্তারকে এ মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার।’ ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় সড়কে খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। খুনিরা গুলি করার পাশাপাশি তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। ঘটনার সময় বাবুল আক্তার ঢাকায় ছিলেন।
হত্যার পর বাবুল আক্তার নিজে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলা তদন্ত করতে গিয়ে বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা পায় পুলিশ। এ ঘটনায় গতবছরের ১২ মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয় পিবিআই। প্রতিবেদনে পিবিআই বলছে, মিতু হত্যা ছিল ‘কন্ট্রাক্ট কিলিং’। বাবুল আক্তারের পরিকল্পনায় এটা সংঘটিত হয়। মিতুকে হত্যার জন্য তিন লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।
এরপর একইদিন নগরীর পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা করেন মিতুর বাবা মোশারফ হোসেন। মামলায় আসামি করা হয়- বাবুল আক্তার, তার ‘সোর্স’ কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুছা, এহতেশামুল হক ভোলা, মুছার ভাই সাইদুল আলম শিকদার ওরফে শাক্কু, মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম, মো. আনোয়ার হোসেন, শাহজাহান ও খায়রুল ইসলাম কালুকে। এর আগে গত ১০ মে মামলার বাদী হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ে ডেকে আনা হয় বাবুল আক্তারকে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ১২ মে তাকে মিতুর বাবা মোশারফ হোসেনের করা মামলায় গ্রেফতার করে পিবিআই।
গত বছরের ১৪ অক্টোবর বাবুলের করা মামলায় পিবিআইর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন করেন তার আইনজীবী। ৩ নভেম্বর আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি গ্রহণ না করে পিবিআইকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের এই আদেশের পর পিবিআই বাবুলের শ্বশুরের করা মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এটির বিরুদ্ধে শ্বশুর নারাজি আবেদন করলে আগামী ৬ মার্চ শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন আদালত।




প্রতিদিন ডেস্ক



