মাহমুদুর রহমান নামে বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী মারা গেছে কিনা তা ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ-এমনটি জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হাফিজ আক্তার। সকালে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানান তিনি।
হারিছ চৌধুরীর পরিবারও পরিচয় নিয়ে দ্বিধা দূর করতে ডিএনএ পরীক্ষায় সম্মতি দিয়েছেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাররে চিঠি পাঠিয়েছেন, হারিছ চৌধুরীর লন্ডন প্রবাসী মেয়ে ব্যরিস্টার সামিরা চৌধুরী। একই চিঠি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিআইডি প্রধানকেও পাঠানো হয়েছে। এর আগে, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হারিছ চৌধুরী মারা গেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে রাজধানীর পান্থপথে মাহমুদুর রহমান নাম নিয়ে ছদ্মবেশে অবস্থান করছিলেন, এমন তথ্য প্রকাশ পায়। মৃত্যুর পর তাকে সাভারের বিরুলিয়ায় দাফন করা হয়েছে। এরপর থেকেই তার মৃত্যু ঘিরে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হাফিজ আক্তার বলেন, তার পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ টেস্টের কাজ চলছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব ও বিএনপির এক সময়ের দাপুটে নেতা ভয়াবহ একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি হারিছ চৌধুরীর মৃত্যু ঘিরে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। গ্রেনেড হামলা, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা ও বিস্ফোরক মামলার এই আসামিকে গত ১৪ বছর ধরে হন্যে হয়ে খুঁজেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সম্প্রতি তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লেও পুলিশ বলছে, এ ব্যাপারে এখনো তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে পুলিশ সদর দফতর চিঠি পাঠিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত (সিআইডি) বিভাগকে। সিআইডির তত্ত্বাবধানে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে, সহায়তা করছে সিলেট জেলা পুলিশ। তদন্তে হারিছ চৌধুরীর মৃত্যু নিশ্চিত হলে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে লাশ তুলে ডিএনএ পরীক্ষা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।
অপরদিকে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে ঢাকা নগরের প্রাণকেন্দ্র পান্থপথে পরিচয় গোপন করে আত্মগোপনে ছিলেন ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত ও ইন্টারপোলের রেড নোটিশধারী মোস্টওয়ান্টেড আসামি হারিছ চৌধুরী। কীভাবে তিনি কথিত মাহমুদুর রহমান নামে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ২০১৩ সালে পাসপোর্ট করে পাঁচ বছর পর একই নামে পাসপোর্ট নবায়ন করেছিলেন। এ গুরুত্বপূর্ণ কাজে তাকে কে বা কারা সহযোগিতা করেছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, সাবেক বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরীর মৃত্যু ও তার দাফনের বিষয়টি সামনে আসায় নতুন করে খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, ইন্টারপোলে রেড নোটিশভুক্ত কোনো আসামির পরোয়ানা প্রত্যাহারের করতে হলে পুলিশের সদর দফতরের এনসিবি শাখা থেকে জানাতে হয়। হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হতে এনসিবি তাগিদ দেয়ার পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত (সিআইডি) বিভাগকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এর পরই তদন্তে নেমেছে সিআইডি ও হারিছের নামে থাকা মামলাগুলোর তদন্তের দার্য়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা। এদিকে সিআইডির একটি সূত্রের দাবির, তাদের ধারণা ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অভিযান শুরুর পর হারিছ চৌধুরী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাকে নিজ চোখে দেখেছেন দাবি করা লোকজনও আছে।
পুলিশ সদর দফতরের (ডিআইজি) উপমহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড অপারেশনস) হায়দার আলী খান বলেন, হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুসংবাদ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে। তার বিরুদ্ধে মামলাগুলোর তদন্তকারী কর্মকর্তারা এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরো বলেন, সাভারের একটি মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে ‘মাহমুদুর রহমান’ নামের এক ব্যক্তিকে ৪ সেপ্টেম্বর দাফন করা হলেও সেই ব্যক্তিই হারিছ চৌধুরী কি না, তা নিশ্চিত হতে কাজ চলছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নিরুদ্দেশ ছিলেন। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হারিছকে হন্য হয়ে খুঁজে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও গোয়েন্দারা। এমনকি ইন্টারপোলের রেড লিস্টেও ছিল তার নাম।
পরিবারের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে খবর চাউর হয়, ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে মারা যান তিনি। এরও প্রায় দুই মাস পর গণমাধ্যমের নতুন খবর হারিছ চৌধুরী নন, মারা গেছেন মাহমুদুর রহমান। অর্থাৎ নাম বদলে হারিছ চৌধুরী হয়েছিলেন মাহমুদুর রহমান। তার মৃত্যু হয় ঢাকাতেই।
এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের দাবি, ১৪ বছর ধরে হারিছ চৌধুরী থাকতেন ঢাকার পান্থপথ এলাকায়, ওই এলাকার মসজিদে নামাজ পড়তেন, এমনকি মাঝে মাঝে নামাজও পড়াতেন। তিনি অংশ নিতেন ধর্মীয় আলোচনায়ও। ২০১৩ সালে মাহমুদুর রহমানের নামে করা পাসপোর্টে ২০১৪ সালে ওমরাহ করার জন্য ভিসা নিয়েছিলেন হারিছ চৌধুরী। হারিছ চৌধুরীর আইনজীবী প্রয়াত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ আত্মগোপনের এই বিষয়টি জানতেন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শুধু চাচাত ভাই আশিক চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তার।
গত বছর সেপ্টেম্বরে ৩ তারিখ করোনায় আক্রান্ত হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর সাভারের লালাবাদ কমলাপুরে জামিয়া মাদ্রাসা কবরস্থানে দাফন করা হয় হারিছ চৌধুরীকে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, মাহমুদুর রহমান নামের একজনকে দাফনের বিষয়টি। তখন সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা অনুদানও দেন কথিত মাহমুদুর রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার সামিরা চৌধুরী।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকালে ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা মামলায় হারিছ চৌধুরীর যাবজ্জীবন সাজা হয়। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা ও বিস্ফোরক মামলারও আসামি ছিলেন হারিছ চৌধুরী।




প্রতিদিন ডেস্ক



