শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪, ০৫:২৭ পূর্বাহ্ন

প্রবাসীদের কষ্ট ও বিড়ম্বনা

  • প্রকাশের সময় : ২৩/০১/২০২৪ ০৫:৪৬:৪৩
এই শীতে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের
Share
84

প্রবাসীদের কষ্ট, হয়রানি আর বিড়ম্বনার শেষ নেই। প্রবাসীদের বলা হয় রেমিট্যান্স যোদ্ধা। কিন্তু প্রবাসীদের নানাবিধ সমস্যার কোন সমাধান কেউ খোঁজে বের করতে পারেনি। বরং সমস্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে।


ইদানীং যেকোন বিষয়ে লিখলেই সব কিছুতেই মানুষ রাজনীতির মারপ‍্যচ খোঁজে বেড়ায়। কিন্তু রাজনীতির আড়ালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মানুষ বুকে চাপা দিয়ে রেখে জীবন কোনমতে চালিয়ে দিচ্ছে। সে হিসেব অনেকেই রাখেনা। 


যারা প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছেন বা দীর্ঘদিন থেকে পরবাসী হয়ে থাকেন, দীর্ঘদিন থেকে আছেন কিংবা নতুন এসেছেন তাদের জীবন ধরণ, দিনাতিপাত, স্বপ্ন, কল্পনার সাথে পরিবার স্বজনদের আচরণ, সংশয়, সমন্বয়হীনতা, অতিরিক্ত প্রত‍্যাশার চাপ কল্পনা আর বাস্তব জীবনের হিসেব কষতে গিয়ে অনেক স্বপ্নের সমাধী হয় তা অনেকেই জানেনা। 

   

প্রবাসীরা যখন দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান তখন পরিবার স্বজনরা অনেক আশায় বুক বাধে। কিন্তু স্বপ্ন আর কল্পনার সাথে যখন বিপরীত মুখী বাস্তবতা তৈরি হয় তখনই দেখা দেয় বিপত্তি। এই সমস্যাটি এখন মারাত্মক ব‍্যধীতে পরিনত হয়েছে। 


বিষয়টি এমন পর্যায় পৌঁছেছে যে পারিবারিক বন্ধনে আঘাত আসতে শুরু করেছে। তৈরি হচ্ছে পারিবারিক কলহ। ভাই ভাইয়ের সাথে দ্বন্দ্ব বাবার সাথে সন্তানের  মতানৈক্য।


গত কয়েক দিনে কয়েকজন প্রবাসীর ম‍্যসেজ আর ফোন কল পেয়ে আমি রীতিমতো হতবাক ও মর্মাহত হয়েছি। শুধু তাই নয় একজন প্রবাসীর ম‍্যসেজ পড়ে  আমি কেঁদেছি। 


বাবা তার ছেলেকে প্রাপ‍্য সম্পদ থেকে বঞ্চিত করছে, ভাই তার ভাইয়ের সম্পদ দখল করছে, ভাই তার বোনের হক আত্মসাত করছে, সময়ে অসময়ে প্রবাসীদের কাছে চাহিদার বেশি অর্থ চাওয়ার পর সময় মতো দিতে না পারলেই পারিবারিক ফেতনা তৈরি করা হচ্ছে। এসবের পিছনে কিছু মানুষ উস্কানি  দিয়ে কৌশলে পারিবারিক অশান্তি তৈরি করছে।


অনেকেই জানেন না আর জানলেও বুঝতে চাননা প্রবাসের বাস্তবতা,  ইনকাম আয় ব‍্যয়ের সামঞ্জস্য সমন্বয় করে প্রত‍্যাহিক জীবন পরিচালনা করে স্বজনদের চাহিদা পূরন করাটা অনেক কঠিন। বিশেষ করে নতুন প্রবাসীরা এসবের ভূক্তভোগী। 


সেদিন একজন জানালেন, লন্ডনের ভিসা হয়ে গেছে বা লন্ডন চলে এসেছি শুনার পর সবাই খুব খুশি হয়। কিন্তু আসার  পর কয়েক মাসের পরেই শুরু হয় টাকা অর্ডার। কিন্তু এখানে ইনকাম আর ব‍্যয়, পড়ালেখার খরচ, থাকা খাওয়া, গ‍্যস বিল ইলেকট্রিসিটি বিল, কাউন্সিল ট‍্যক্স, আনুসঙ্গিক খরচাদি চালানোর পর একজন নতুন প্রবাসী স্বজনদের চাহিদা কতটুকু পূরণ করতে পারে তা কারো ধারনাই নেই। 


সেদিন  একজনের ম‍্যসেজের লেখা আমকে কাদিয়েছে। জন্মদাতা বাবা হয়েও সন্তানের প্রতি এত অবিচার জুলুম করতে পারে এই যুগে!  কি আজব জঘণ্য  এক সমাজ ব‍্যবস্থা তৈরি হয়েছে। 


এইতো কিছু দিন আগে সৌদি  আরব থেকে এক তরুণের হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর খবর পেলাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম পারিবারিক অশান্তি থেকেই তরুনটি হার্ট এটাক করেছে। 


এই যুক্তরাজ‍্যেও আমি অনেকের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম নিজের পরিবারের মানুষজন আত্মীয় স্বজন থেকে যে পরিমাণ চাপ, মানসিক যন্ত্রণা  ও প্রত‍্যশা পূরন করতে না পারার অপবাদ সহ অসংখ্য যন্ত্রণা বুকে চাপা দিয়ে মানুষ প্রবাসের যাপিত জীবনে মানিয়ে নিয়েছে। 


এই বিষয়টি সমাজের নতুন ভাইরাস ব‍্যাধি হিসেবে পরিনত হচ্ছে। এবিষয়ে সচেতন মানুষকে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। দেশে প্রবাসী বিনিয়োগে ধ্বস নামার এটিও একটি বড় কারণ। ভবিষ্যত প্রজন্ম দেশ বিমুখতার এটি একটি বড় কারন। 


সেদিন বাংলাদেশী বংশদ্ভূত ২২ বছরের এক বৃটিশ তরুণ আমাকে বলেছে, তার বাবা সারা জীবনের ইনকাম  দিয়ে দেশে সকল সম্পত্তি তৈরি করেছেন। কিন্তু লাষ্ট ইয়ার তার আঙ্কেল  আর কাজিনরা মিলে তা দখল করেছেন। তার বাবা গত বছর দেশে গিয়ে ঘরেই থাকতে পারেননি। অথচ সেই টাকা দিয়ে এখানে দুটি বাড়ি ক্রয় করলে মাসে দুই থেকে তিন হাজার পাউন্ড ভাড়া পেতেন। 


এমন অসংখ্য  উদাহরণ  আছে যেসব কারনে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলাদেশ বিমুখ হয়ে পড়ছে। হলিডে যখন  আসে নতুন প্রজন্ম মরক্কো, তার্কি সহ ইউরোপ আমেরিকা ঘুরতে চলে যায় কিন্তু বাংলাদেশে তারা যেতে চায়না। কেন নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশ বিমুখ তার রয়েছে বহুমাত্রিক কারন। 


বিশেষ করে মধ‍্যপ্রাচ‍্য প্রবাসীদের  অন্য দৃষ্টিতে দেখা হয়। কিছু দিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ‍্যমে মধ‍্যপ্রাচ‍্য প্রবাসীদের নিয়ে একটি শর্ট ফিল্মে দেখলাম  এমন ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেনো প্রবাসীরা খুবই নিম্নমানের!  অথচ বর্তমান বাংলাদেশের ধংসপ্রায় অর্থনীতির চাকা সচল করে রেখেছেন শুধু মধ‍্যপ্রাচ‍্য প্রবাসীরা। 


সেই সাথে প্রবাসী ভাই ও বোনদেরও সময়ের আলোকে চিন্তা চেতনা  পরিবর্তন করা প্রয়োজন। সুস্থ চিন্তা আর সুন্দর মানসিকতা এবং দীর্ঘ মেয়াদী ভবিষ্যত পরিকল্পনা  একটি সুন্দর গোছানো জীবন গঠনে সহায়ক। পাশাপাশি নীতি নৈতিকতাহীন জীবন ধংসের কারন হয়ে দাড়ায়। সুতরাং বর্তমান আকাশ সংস্কৃতির ছোবল থেকে নিজে এবং নিজের পরিবারকে বাচাতে নিজের  অনুপস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের যেকোন বিপজ্জনক পথ রোধ করতে ধর্মীয় অনুশাসন  ও খোদাভীতি অর্জনের মাধ‍্যমে একটি সুন্দর পরিবার ও সমাজ গঠন সম্ভব। 


এই সুন্দর সমাজ, একটি আদর্শ পরিবার গঠনে প্রবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রবাসীরা চাইলে যার যার পরিবারে এই ভূমিকা পালনে সচেষ্ট হতে পারেন। যদিও কোন কোন ক্ষেত্রে সম্ভব হয়ে উঠে না।


এই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ‍্যম এবং মিডিয়ায় সচেতনতা তৈরি করা এখন খুবই জরুরি। যার যার অবস্থান থেকে সবাইকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।


লেখক: এনামুল হক

সাংবাদিক, কলামিস্ট

সদস্য-বাংলা প্রেসক্লাব, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ‍্য।


সিলেট প্রতিদিন / এমএ


Local Ad Space
কমেন্ট বক্স
© All rights reserved © সিলেট প্রতিদিন ২৪
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরি