বানিয়াচংয়ে ১২৫ বছর বয়সী এক অসহায় বৃদ্ধের জীবনগল্প
বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ১১:৪২ পূর্বাহ্ন

আব্দাল মিয়া, বানিয়াচং

প্রকাশ ২০২১-০৯-২৪ ০৫:১৪:০৮
বানিয়াচংয়ে ১২৫ বছর বয়সী এক অসহায় বৃদ্ধের জীবনগল্প

 বয়সের ভারে এখন চলাফেরা করতে খুব কষ্ট হয়! ৬ ফুট লম্বা, গায়ে জুব্বা, মাথায় ৫ কল্লি টুপি ও হাতে একখানা লাঠি যে মানুষটির নিত্যসঙ্গী তিনি হচ্ছেন ক্বারী আব্দুল আজিজ। বয়স হলো ১২৫। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া থানার ভোগাপাড়া গ্রামে। পিতার নাম মৃত জবেদ আলী। বানিয়াচংয়ে ছোটবেলায় লেখাপড়া করার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। পরে ক্বারীয়ানা সম্পন্ন করে বানিয়াচং উপজেলার গ্রামে গ্রামে বাচ্চাদেরকে বিভিন্ন মসজিদ-মক্তবে আরবী শিক্ষা দিয়েছেন। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা অগণিত। আবালবৃদ্ধবণিতা সবাই তাকে ‘লম্বা মেছাব’ বলে সম্ভোধন করেন।

তিনি জমির হাজী জামে মসজিদে ১০ বছর ইমামতি করেছেন। এ মসজিদ প্রতিষ্ঠায় এবং উন্নয়নে অবদান উল্লেখযোগ্য। এরই সুবাদে বানিয়াচং উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসা কুঁড়াতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। এই ভালোবাসার টানে অদ্যবধি বানিয়াচংয়েই রয়েছেন। এক মায়াজালে বন্দীর ন্যায়।

তিনি উপজেলা সদরের দক্ষিণ-পশ্চিম ইউনিয়নের অন্তর্গত দক্ষিণ যাত্রাপাশার মোকামহাটি গ্রামের নিজ বাড়িতে বাস করছেন। সংসারে ২টি মেয়ে রয়েছে। স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অনেক আগেই মারা গেছেন। মা হারানো মেয়ে ২টিকে বিয়ে দিয়েছেন উপজেলা সদরেই। জ্যেষ্ঠ মেয়ে রিজিয়া আক্তার ও কনিষ্ট মেয়ে মোছাঃ মাহমুদা আক্তার। কনিষ্ট মেয়ে মাহমুদার স্বামী মারা গেছেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই মেয়ে চলে আসে পিত্রালয়ে। নেই কোন ছেলে-মেয়ে। তখন থেকেই কনিষ্ট মেয়ে বাবার দেখাশুনার দায়িত্ব নেন। মাঝে মাঝে জ্যেষ্ঠ মেয়ে স্বামীর ঘর থেকে এসে পিতার সেবা-যত্ন করেন। বড় মেয়ে রিজিয়া আক্তারও খুবই অসহায়। ওই মেয়ের ছোট্ট তিন ছেলে ও তিন মেয়েকে দেখভাল করতে হয় তাকেই। মেয়ের স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে সংসার করছে। একদিকে মেয়েকে দেখাশুনা করা, অপরদিকে নিজের সংসার চালানো খুবই কঠিন অবস্থার সম্মুখীন ১২৫ বছর বয়সী এ বৃদ্ধের।

সংসারে আয় রোজগার করার মতো কেউ নেই। তিনি জীবনভর আল্লাহর উপর ভরসা করেই সাংসার জীবন কাটিয়েছেন! কারও কাছে কোনদিন সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি! অথচ একটি সংসারে কতইনা খরচ! কি করে সাংসারিক জীবনে নিত্য দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব? জীবনে চলাফেরা করতে পারিবারিক, সামাজিক ও বিবিধ খরচ তো প্রতিনিয়তই করতে হয়। এসব তিনি কিভাবে করছেন?  যে সকল স্বহৃদয়বান ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে সাহায্য প্রদান করেন তার উপরই একমাত্র নির্ভরশীল তিনি! যখনই যা পান তা নিয়েই অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করেন। কিন্তু সবসময় তো আর কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন না! অভুক্ত, অর্ধাহার তাঁর নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা প্রায়!

তিনি সবসময় মসজিদে জামাতের সহিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। প্রতি রমজান মাসে ১৫ খতম আল্লাহর পবিত্র বাণী কোরআন শরিফ পাঠ করতেন। এছাড়া অন্যান্য মাসে কমপক্ষে ৫ খতম কুরআন শরিফ পাঠ করেন। এখনও তা চলমান রয়েছে।সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল ওই বৃদ্ধের দৃষ্টি শক্তি এতই প্রখর যে, চশমা ছাড়া এখনো প্রতিদিন পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতে পারেন! বয়ো-বৃদ্ধের কারণে এখন আর কোন মসজিদ-মক্তবে পড়াতে পারেন না।

তাঁর পেশা বলতে কিছুই নেই। চলাফেরা করতে অক্ষম। নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, খাবার-দাবার সবকিছুই এখন বিছানার নিত্যসঙ্গী। তবে তিনি শারীরিকভাবে প্রেসার ও দুর্বলতায় ভুগছেন। এছাড়া শরীরে আর কোন সমস্যা নেই।

দারিদ্র্যতার অতল গহবরে বসবাসকারি অসহায় ওই বৃদ্ধের কপালে সরকারি বয়স্ক ভাতা জুটলেও আর কোন সহায়তা মিলেনি! বৃদ্ধকালে শুধু কি বয়স্ক ভাতাই যথেষ্ট! এদিকে বিধবা মেয়ে ১০ টাকা কেজি ধরে চাল পেলেও বিধবা ভাতার জন্য চেষ্টা করেও কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি! এভাবেই এ বৃদ্ধ অসহায় মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন।

সিলেট প্রতিদিন/এমএনআই

ফেসবুক পেইজ