‘জননেত্রী শেখ হাসিনা শিশু পার্ক’ অপেক্ষা আর কতো?
শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:১১ অপরাহ্ন

মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম

প্রকাশ ২০২১-০৯-১৪ ০৯:২৫:৪৪
‘জননেত্রী শেখ হাসিনা শিশু পার্ক’ অপেক্ষা আর কতো?

মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম:

সিলেট নগরীর দক্ষিণ সুরমার আলমপুরস্থ ‘জননেত্রী শেখ হাসিনা শিশু পার্ক’টি দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশী সময় থেকে চালু হয়নি। দীর্ঘদিন থেকে হচ্ছে হবে বলে উদ্বোধনের অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে সিলেট সিটি কর্পোরেশনে অধীনে এই পার্কটি।

নামকরণসহ নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন থেকে চালু করা না হলে সম্প্রতি ‘জননেত্রী শেখ হাসিনা শিশু পার্ক’ নামে নামকরণ করা হয় পার্কটির। এরই মধ্যে পার্কের প্রধান ফটকে ‘জননেত্রী শেখ হাসিনা শিশু পার্ক’  নামও বসানো হয়েছে।

জানা যায়, ২০০৪ সালে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্থমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রয়াত এম. সাইফুর রহমান নগরবাসীর বিনোদনের চাহিদার কথা চিন্তা করে ২০০৪ সালে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার আলমপুরে একটি পার্ক নির্মাণ কাজ শুরু করেন। সুরমা নদীর তীরঘেষা ৩ দশমিক ৭৭ একর জমির উপর ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এই পার্ক নির্মাণ কাজ শুরু করে সিলেট সিটি কর্পোরেশন। সে সময় মাটি ভরাট, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন স্থাপন, দৃষ্টিনন্দন তোরণ নির্মাণসহ পার্কের অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয়। তখন পার্কটির নাম এম. সাইফুর রহমানের নামে নামকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নিজস্ব অর্থায়নে কাজ শুরুর পর সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, মাটি ভরাটসহ গাছের চারা লাগানো হয়। পার্কটি সুরমার তীর ঘেঁষা হওয়াতে রাইড বসানোসহ নদীর সাথে নান্দনিক সিঁড়ি করারও উদ্যোগ নেয়া হয়। কাজ শুরুর তিন বছর পর অর্থ্যাৎ ২০০৭ সালে তত্ত্বাধায়ক সরকার এসে প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দিলে প্রকল্পের ১২ লাখ টাকা ফেরত চলে যায়।

সরকারের পালাবদলের সাথে সাথে পার্কটির কাজ বন্ধ হয়ে গেলে অভিযোগ উঠে, সাইফুর রহমানের নামে নামকরণ হওয়াতে সিলেট সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র এই পার্কটি চালু করতে কোনো উদ্যোগ নেননি।

এরপর ২০১৩ সালে বিএনপি দলীয় নেতা ও সাইফুর রহমানের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত আরিফুল হক চৌধুরী মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর এই পার্ক চালুর ব্যাপারে আবার উদ্যোগ নেন। ২০১৭ সালে পার্কে বিভিন্ন রাইড বসানোর কাজ শুরু হয়। এসময় চীন থেকে এনে বিভিন্ন আধুনিক রাইড বসানো, বিদ্যুৎ সংযোগ চালুসহ আনুসাঙ্গিক কাজ শেষ হয়। তবে এরপর থেকেই দেখা দেয় নামকরণ জটিলতা।

সকল কাজ শেষ হলেও এতোদিন নামকরণ জটিলতায় আটকে যায় এই পার্কের উদ্বোধন। এরআগে বিভিন্ন সময়ে ‌‘এম. সাইফুর রহমান শিশু পার্ক’, ‘সিলেট ন্যাচারাল পার্ক’, ‘দক্ষিণ সুরমা শিশু পার্ক’- এরকম বিভিন্ন নামে পার্কটির নামকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সর্বশেষ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নামে ‘জননেত্রী শেখ হাসিনা শিশু পার্ক’ নামে পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে। নতুন নামকরণের পর এরই মধ্যে এ পার্কের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। খুব শীঘ্রই এটি উদ্বোধন করা হবে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুরুর দিকে ‘এম সাইফুর রহমান’র নামে পার্কের কাজ শুরু হলেও পরে নাম বদলে ‘সিলেট ন্যাচারাল পার্ক’ নামেই পার্কটির কাজ চলে। নাম বদলের পরই ‘সুরমা ন্যাচারাল পার্ক’ এর নামে ৭ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় চীনা একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে পার্কে রাইড বসানো হয় ‘মনো রেল’সহ বিভিন্ন ধরণের রাইড। এ ‘মনো রেল’ দর্শনার্থীদের তাক লাগিয়ে দেবে। এর আগে সিলেটে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন পার্ক থাকলেও এই পার্কে সর্বপ্রথম ‘মনো রেল’ সংযোগ করা হয়েছে। মনো রেলে মাটি থেকে ১৫ ফুট উপর দিয়ে এক হাজার ৩৬১ ফুট দূরত্ব অতিক্রম করা যাবে। এটি থাকবে পার্কের চারপাশ জুড়ে।

এছাড়া রয়েছে আকর্ষনীয় ম্যাজিক প্যারাসুট। ম্যাজিক প্যারাসুটে একসঙ্গে ১৮ জন ৭০ ফুট উঁচুতে উঠানামা করতে পারবেন। নদী, প্রকৃতি আর পার্কের নানা বৈচিত্র দর্শনার্থীদের তাক লাগিয়ে দেবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

পার্কটিতে দর্শনার্থীদের জন্য আরো রয়েছে পাইরেটশিপ, টুইস্টার, বাম্পার কার, ফ্রুট ফ্লাইং চেয়ার, ক্যারসেল, জাম্পিং ফ্রগ ও ভিজিটিং ট্রেন। ভিজিটিং ট্রেন দিয়ে একসাথে ২৬ জনকে নিয়ে ৪২০ ফুট ঘোরা যাবে। এসব রাইডের সাথে আরো কিছু রাইড থাকবে। যা সিলেটের অন্যান্য পার্ক থেকে এই পার্কটিকে এগিয়ে রাখবে বলে জানা গেছে।

সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজের দাবী, যতো দ্রুত সম্ভব পার্কটি খোলে দেয়ার। তারা বলছেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে পার্কটি চালু না করতে পারা অবশ্যই কর্তৃপক্ষের জন্য ব্যর্থতা। সেজন্য তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘদিন পার্কের যন্ত্রাংশ ফেলে রাখায় নষ্ট হয়েছে। আবার কিছু যন্ত্রাংশ বিকলও হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব কাজের জন্য যাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদেরকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনা গেলে পরবর্তীতে এর সুফল মিলবে।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে পার্কটি দ্রুত উদ্বোধন করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তা আর হয়ে উঠে না, তবে আমরা আশা করবো এবার পার্কটি চালু হবে। আর পার্কটি এতো বছরেও চালু করতে না পারা অবশ্যই সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ব্যর্থতা। সেজন্য তাদেরকে জবাবদিহীতার মধ্যে আনা প্রয়োজন। কারণ এই পার্ক নির্মাণের টাকা জনগণের টাকা। জনগণের টাকা অপচয় করার অধিকার কারো নেই। দীর্ঘ দেড় যুগ থেকে পার্কটি চালু না করায় পার্কের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ বিকল হতে পারে। সেই জন্য তাদেরকে অবশ্যই জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান সিলেট প্রতিদিনকে বলেন. পার্কটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। বর্তমানে রাইড বসানোসহ প্রায় সকল কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সামান্য কিছু কাজ বাকি আছে। করোনাসহ নানা কারণে পার্কটি চালু করা যায়নি। তবে খুব শীঘ্রই এটি চালু করা হবে।

এ বিষয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী সিলেট প্রতিদিনকে বলেন, পার্কের কাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রধান ফটকে ‘জননেত্রী শেখ হাসিনা শিশু পার্ক’ নামকরণও করা হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি এটি উদ্বোধন করা হবে।

পার্ক দেরিতে চালুর কারণে রাইডগুলো নষ্ট হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে চালিয়ে এগুলোকে সচল রাখা হয়। বিধায় এগুলো ভালো আছে।

সিলেট প্রতিদিন/এমএনআই

ফেসবুক পেইজ