গোলাপগঞ্জের সেই সেলিমের মৃত্যুরহস্য: হুমকি এসেছিল যুক্তরাজ্য থেকে!
শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:৩২ পূর্বাহ্ন

এনামুল কবীর

প্রকাশ ২০২১-০৮-৩১ ১৭:৩০:০৮
গোলাপগঞ্জের সেই সেলিমের মৃত্যুরহস্য: হুমকি এসেছিল যুক্তরাজ্য থেকে!

দেড় মাসের বেশী, প্রায় ৪৮ দিন পেরিয়ে গেছে গোলাপগঞ্জের রাজমিস্ত্রি সেলিম উদ্দিনের (৫১) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের। কিন্তু এখনো পুরো ঘটনা রহস্যের চাদরে মোড়া। কোন সুরাহা হয়নি আজও। তবে তার ঘনিষ্ঠজন এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, মৃত্যুর আগে সেলিম উদ্দিনকে পরোক্ষভাবে হুমকি দেয়া হয়েছিল। আর সেই হুমকি এসেছিল এশিয়া পেরিয়ে সুদুর ইউরোপের যুক্তরাজ্য থেকে। হুমকি দাতা, তিনি যে বাড়ির কেয়ারটেকার ছিলেন সেই বাড়ির মালিকের ভাগ্না জুনেদ আহমদ। সিলেট প্রতিদিনের অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে। আর পুলিশ প্রশাসন বিষয়টির তদন্ত চলছে বলে জানান। এটি হত্যা না আত্মহত্যা ময়না তদন্ত রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত এ ব্যাপারে তারা কিছুই বলতে পারছেন না।

গোলাপগঞ্জের বাদেপাশা ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের খাগাইল গ্রামের মৃত আলা উদ্দিন টেইলারের ছেলে সেলিম উদ্দিনের লাশ গত ১৪ জুলাই পাশের বাড়ির একটি নির্মানাধিন ভবনের দেয়ালে ঝুলন্ত অবস্থায় পেয়েছেন গ্রামবাসী ও তার পরিবারের সদস্যরা। পরে গোলাপগঞ্জ থানার কুশিয়ারা পুলিশ ফাঁড়িকে খবর দিলে তারাসহ গোলাপগঞ্জ থানার ওসি ( ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ) এবং অন্যান্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তার উপস্থিতি লাশের সুরতহাল তৈরি করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়। সেদিনই বিকেল প্রায় ৫টার দিকে গোলাপগঞ্জ থানায় সেলিমের ছোট ভাই নাদিম আহমদ একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেন। তবে এ ব্যাপারে নাদিম জানিয়েছেন, তিনি হত্যা মামলাই দায়ের করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গোলাপগঞ্জ থানা পুলিশের এসআই আশিষ তাদের বুঝিয়েছেন, হত্যা করা হয়েছে বলেতো নিশ্চিত না। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এলে এবং হত্যার বিষয়টি পরিস্কার হলে তখন সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তর হবে। এরপর স্বাক্ষর করেন নাদিম।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত হন কুশিয়ারা পুলিশ ফাঁড়ির এসআই ফখরুল ইসলাম। তিনি মাত্র একদিন নিহত সেলিমের বাড়িতে গিয়ে তার বিধবা স্ত্রীর সাথে কথা বলেন। তখন এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে তিনি জানিয়েছিলেন ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ছাড়া তারা কিছুই বলতে পারবেন না। সেটি পেতেও দেরি হবে অন্তত ২/৩ মাস।

বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে মঙ্গলবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ফখরুল জানান, নাদিমের দেয়া সেই অভিযোগটিই মামলা হিসাবে রেকর্ড করা হয়েছে ( তবে তিনি তাৎক্ষনিক নম্বর উল্লেখ করতে পারেন নি)। আর তদন্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা আন্তরিকভাবে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাসহ সবাই মিলে কাজ করছি। তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এলে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।

এদিকে মৃত্যুর আগে সেলিম আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তার পারিবারিক একাধিক সূত্র। এমনকি পাশের আছিরগঞ্জ বাজারেও যেতে ভয় পেতেন তিনি। নিজের জীবনের পাশাপাপশি দুই সন্তানের জীবন নিয়েও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন সেলিম। এরমধ্যে ছেলে নিরবকে কেউ মেরে ফেলতে পারে এমন আতঙ্কে তিনি নাকি তাকে তার শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

বিষয়টির খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে জানা যায়, সেলিম একই গ্রামের মৃত আখলুছ হাজির বাড়ির কেয়ারটেকারের দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তাদের সাথে তার সম্পর্কের অবনতি হয়। আখলুছ হাজির ছেলে যুক্তরাজ্য প্রবাসী মনিয়া তার সৌর বিদ্যুতের ছোটখাটো ব্যবসা দেখাশোনার পাশাপাশি বাড়িসহ অন্যান্য সম্পদ দেখাশোনার দায়িত্বও দিয়েছিলেন। তাও প্রায় ৯/১০ বছর আগে। এরপর থেকে সেলিম তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। এদিকে সেলিমের সাথে ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, তার খুব বিশ্বস্ত একজনের প্ররোচনায় নাকি সেলিম একটি জাল ডিড বা চুক্তিপত্র তৈরি করেছিলেন যাতে তার বেতন সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল। তিনি সেটি মনিয়া বা তার আত্মীয়দের কাছে না পাঠালেও তার ঐ বিশ্বাসঘাতক বন্ধুই নাকি সেটি মনিয়ার আত্মীয় স্বজনের কাছে পাঠিয়েছিলেন। এমনকি এর কোন কপিও তার কাছে ছিলনা। আর এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে সেলিমকে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে হিসেব নিকেষ সমঝে দিতে চাপ দিচ্ছিলেন যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত মনিয়ার বোন, ছোট ভাই কাদির ও ভাগ্না জুনেদ। এজন্য সেলিমের সাথে ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে তারা সালিশও মেনেছিলেন। 

এরপর থেকে সেলিম কার সাথে কি আলাপ করেছেন বা কথা বলেছেন ইত্যাদি সবকিছু নাকি পাচার হয়ে যেত যুক্তরাজ্যে থাকা মনিয়ার বোন ও ভাই- ভাগ্নাদের কাছে। মৃত্যুর অনেক আগে থেকেই সেলিম তার পরিবারের সদস্যদের কাছে বারবার আক্ষেপ করেছেন, তিনি বিশ্বাসঘাতকতার শিকার। সেলিমের স্ত্রী জানান, যুক্তরাজ্যে বসোবাসরত মনিয়ার ভাগ্না জুনেদ আহমদ প্রায়ই মোবাইলে তাকে বলতেন, মামা ( সেলিম ) আপনি কখন কোথায় কি বলছেন, না বলছেন, তা আমাদের কাছে আসছে এবং আমরা তা শুনছি। তবে মামা মনে রাখবেন, কোন প্রয়োজনে ১০/১২ লাখ খরচ করতে আমাদের সমস্যা হবেনা। এই পরোক্ষ হুমকির পর থেকেই সেলিম এলোমেলো হয়ে পড়েছিলেন বলে তার পরিবারের সদস্যদের দাবি। বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য এই প্রতিবেদকের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের অনুরোধ জানালেও জুনেদ বা  তার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে কোন সাঁড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে সেলিমের ভাই নাজিম উদ্দিনও জানিয়েছেন, তিনি বারবার তাদের জানিয়েছেন যে, কে বা কারা তাকে হুমকি দিচ্ছে। তবে তিনি কারও নাম প্রকাশ করেননি।

সেলিমের স্ত্রী ভাইসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, মনিয়াদের বাড়ির চাবিসহ অন্যান্য সম্পদ সালিশানদের কাছে হস্তান্তরের কয়েকদিন পরই তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারের সময় তার লাশ যেভাবে পাওয়া গেছে- তাতে আত্মহত্যার ঘটনা বলে বিষয়টিকে মানতে পারেন নি কেউই। শুরু থেকেই তারা গণমাধ্যমে বিষয়টিকে হত্যাকান্ড বলে দাবি করেছেন। যুক্তরাজ্য প্রবাসী জুনেদ আহমদের কাছ থেকে একটি পরোক্ষ হুমকিও তিনি পেয়েছিলেন। সবদিক বিবেচনায় নিয়ে তাদের দাবি, সেলিম যাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা করতেন তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে এই মৃত্যুরহস্য উদঘাটন হতে পারে। 



সিলেট প্রতিদিন/ইকে

ফেসবুক পেইজ