দিলওয়ার : তুমিহীন যাওয়া হয় না খান মঞ্জিল
সোমবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২২, ০১:২০ অপরাহ্ন



মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম

প্রকাশ ২০২২-০১-০১ ১১:০০:২৪
দিলওয়ার : তুমিহীন যাওয়া হয় না খান মঞ্জিল

মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত গণমানুষের কবি দিলওয়ারের ৮৫তম জন্মদিন পয়লা জানুয়ারি। আমার সাহিত্য জগতে পদচারণার শুরু থেকে প্রতি বছর এই দিনটাতে কবির বাড়ি ভার্থখলার খান মঞ্জিলে ফুল নিয়ে গিয়ে কবিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছি। সেদিন রাত বারোটা থেকে সারাদিন খান মঞ্জিলে চলতো তাঁর বাসায় কবিদের আড্ডা। আড্ডায় শরিক হতাম আমিও। দীর্ঘ সময় বসে আড্ডায় কবির জ্ঞানগর্ব কথামালায় নিজেকে সমৃদ্ধ করতাম। শুধু কবির জন্মদিন নয়, এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে কবির বাসায় যাওয়া হতো। কিন্তু প্রিয় কবি দিলওয়ারের মৃত্যুর পর আর খান মঞ্জিলে যাওয়া হয় না। কবির জ্ঞানগর্ব কথাও শুনা হয় না।

গণমানুষের কবি দিলওয়ার ১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন সিলেট নগরীর সুরমা নদীর দক্ষিণ পারের ভার্থখলা গ্রামে। স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা দানকারী বহু কবিতা ও গানের স্রষ্টা একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি দিলওয়ার। স্বাধীনচেতা ও সংগ্রামী জীবনের অধিকারী কবি দিলওয়ার গ্রিক, রোম থেকে শুরু করে পুরাণকে তৃতীয় দৃষ্টির আলোকে প্রকাশ করেছেন তাঁর কবিতায়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জিজ্ঞাসা’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে।

প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ঐকতান’, ‘পূবাল হাওয়া, ‘উদ্ভিন্ন উল্লাস, ‘বাংলা তোমার আমার’, ‘রক্তে আমার অনাদি অন্থি’, ‘বাংলাদেশ জন্ম না নিলে’ উল্লেখযোগ্য। তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সংকলনগুলো হলো- ‘সমস্বর’ (১৯৬৯-৭৪), ‘উল্লাস’ (ফেব্রæয়ারি ১৯৭২), ‘মৌমাছি’ (জুন ১৯৭৫), ‘গ্রাম সুরমার ছড়া’ (১৯৭৬), ‘মরূদ্যান’ (জানুয়ারি ১৯৮১), ‘সময়ের ডাক’ (১৯৮৫), ‘সিলেট পরিদর্শক’ (প্রধান সম্পাদক ১৯৮৬)। কবি দিলওয়ার ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ ও ২০০৮ সালে একুশে পদক পান। এছাড়া লাভ করেছেন অসংখ্য সম্মাননা ও পদক। দীর্ঘ ৬০ বছরব্যাপী সাহিত্যের প্রায় সকল বিষয় নিয়ে লিখে গেছেন দিলওয়ার। সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে। সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ এ দুটো বিষয় দিলওয়ারের বিভিন্ন লেখায় প্রকাশ পেয়েছে। ‘মা-মেঘনা সুরমা যমুনা গঙ্গা কর্ণফুলী, তোমাদের বুকে আমি নিরবধি গণমানবের তুলি’ নিজের আত্মপরিচয়কে এভাবেই তুলে ধরেছিলেন কবি দিলওয়ার। সিলেটের প্রাণ ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম সাক্ষী লর্ড ক্বিন কর্তৃক নির্মিত ক্বীনব্রিজকে নিয়ে লিখেছিলেন ‘ক্বিন ব্র্রিজের স‚র্যোদয়’। তাঁর কবিতায় স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের কথা।

আর এ জন্যই সিলেটসহ বাংলা ভাষাভাষি মানুষের কাছে তিনি ‘গণমানুষের কবি’। সাধারণ মানুষকে নিয়েই ব্যাপৃত ছিল তার চিন্তার জগৎ। অতি উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না বলেই হয়তো তিনি আত্মকেন্দ্রিক না হয়ে হয়েছিলেন সবার। সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা, অনুবাদক, মুক্তিসংগ্রাম, দেশপ্রেম, আধ্যাত্মিকতা, কাব্যিকতা, প্রগতিশীলতা ও মানবিকতায় ছিলেন অনন্য। আমাদের কাছে যিনি কবি দিলওয়ার নামে পরিচিত তাঁর পুরো নাম ‘দিলওয়ার খান’। জাতি-ধর্ম-বর্ণ তথা যেকোনো বৈষম্যের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি ত্যাগ করেছিলেন পূর্ব পুরুষের ‘খান’ পদবি। তার পিতা মোহাম্মদ হাসান খান ও মাতা মোছাম্মাৎ রহিমুন্নেসা। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম। তার দুই স্ত্রী হলেন আনিসা দিলওয়ার ও ওয়ারিশা দিলওয়ার। ১৯৬০ সালে তিনি আনিসা খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর পত্নী বিয়োগ হলে ১৯৭৫ সালে ওয়ারিশাকে বিয়ে করেন।

তার জীবনী ও লেখালেখির বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৯৪৯ সালে ১২ বছর বয়সে প্রাচীনতম দৈনিক ‘যুগভেরী’তে তার ‘সাইফুল্লাহ হে নজরুল’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। তিনি অর্ধ-শতাধিক বছর কাব্যচর্চা করেছেন। কবিতা, ছড়া, গান, গল্প ও প্রবন্ধ মিলে ১৮-২০টি গ্রন্থ তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ফেসিং দ্য মিউজিক নামে তার একটি ইংরেজি কাব্যগ্রন্থও রয়েছে। কবি দিলওয়ার ১৯৬৭ সালে দৈনিক সংবাদের সহকারী সম্পাদক, ১৯৭৩-৭৪ সালে রুশ সংস্কৃতি কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘উদয়ন’ পত্রিকার সিনিয়র অনুবাদক, ১৯৭৪ সালে দৈনিক গণকণ্ঠের সহকারী সম্পাদক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৫২ সালে রাজা গিরিশচন্দ্র হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও ১৯৫৪ সালে সিলেটের মুরারীচাঁদ কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ১৯৫৭ সালে শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিএ পরীক্ষা দিতে পারেননি।

কবি দিলওয়ার ভারতের আসাম ও ত্রিপুরায় রাষ্ট্রীয়ভাবে সংবর্ধিত হয়েছেন। ১৯৮৬ সালে ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ কর্তৃক আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে হবিগঞ্জের দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা স্মৃতিপদক ও সম্মাননা অর্জন এবং ১৯৮৭ সালের ৯ আগস্ট যুক্তরাজ্য প্রবাসী কর্তৃক লন্ডনের সিলেট সেন্টারে সংবর্ধিত হয়েছেন। ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর তাঁর প্রিয় সুরমা নদীর পাড়ে ভার্থখলার নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সিলেটপ্রিয় গণমানুষের কবিকণ্ঠ দিলওয়ার। লেখক : কবি, সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক: দক্ষিণ সুরমা সাহিত্য পরিষদ।

সিলেট প্রতিদিন/এসএ

বিজ্ঞাপন স্থান


পুরাতন সংবাদ খুঁজেন

ফেসবুক পেইজ