সিলেটে চারুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান চারুপাঠ'র পথচলা
সোমবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২২, ০১:২৬ অপরাহ্ন



প্রতিদিন ডেস্ক

প্রকাশ ২০২১-১২-১৮ ১০:৫৬:১৯
সিলেটে চারুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান চারুপাঠ'র পথচলা

ছবি আঁকার সাথে মনুষের সম্পর্ক ঠিক কত বছরের তা সঠিকভাবে বলা অসম্ভব। তবে গবেষকদের মতে, আনুমানিক আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার বছর থেকে চারুকলার জন্ম হয়েছিল। অর্থাৎ সেই আদি যুগ থেকে চারুকলার সাথে মানবজাতির সম্পর্ক। ফ্রান্সের সাতান উপকূলে অবস্থিত আলতামিরা গুহার আদিম মানুষের আঁকা ছবিগুলোই তার সাক্ষ্য বহণ করে। সেই পঞ্চাশ হাজার আগের চারুকলার অনেক ইতিহাস, ঐতিহ্য বহন করে আজকের এই অবস্থানে এসে পৌঁছেচে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চারুকলা জগতে বাংলাদেশ আজ খুবই ভাল ও সম্মানজনক অবস্থানে থাকলেও সিলেট এক্ষেত্রে বেশ কিছুটা পিছিয়ে। আর এর প্রধান কারণই হচ্ছে সিলেটে একটি আর্ট কলেজের অভাব। এ বিষয়ে সিলেটের সচেতন নাগরিকগণ চিন্তাভাবনা করছেন এবং অচিরেই সিলেটে প্রতিষ্ঠিত হবে চারকলা কলেজ বা উচ্চ শিক্ষা  প্রতিষ্ঠান। আর এ চিন্তাভাবনা থেকেই সিলেটে শিশু কিশোরদের জন্য ছবি আঁকার একটি ভাল পরিবেশ তৈরি করে চারুশিক্ষায় বিশেষ অবদান রাখতে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চারুপাঠ চারুবিদ‍্যালয়।

চারুপাঠ একটি সৃজনশীল চাকা। যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল সিলেটের কোমলমতি শিশুদের ভিতরে লুকায়িত সুপ্ত ও সৃজনশীল প্রতিভাকে জাগিয়ে তোলা। আর সেই বৃহৎ ও মহৎ উদ্দেশ্য সফল করতে সৃজনশীল চারুশিক্ষায় যোগ হয়েছে প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকদের অন্তরিক প্রচেষ্টা। পড়ালেখার পাশাপাশি শিশুদের যথাযথ ভাবে গড়ে তোলা এবং সংস্কৃতিচর্চা ও সৃজনশীল কাজের মধ্যে দিয়ে প্রতিভার বিকাশ সাধন করার স্কেচ আাঁকার দায়িত্বটা তারাই নিয়েছেন। সিলেটের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সংস্কৃতিচর্চা ও সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে প্রতিভার বিকাশ ঘটানো এবং শিশুমনকে পরিচ্ছন ও সুন্দরে প্রভাবিত করার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছে চারুপাঠ। পড়াশুনার পাশাপাশি ছবি আঁকার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রকৃতির সাথে পরিচয় করে দেয়া, যা এই কৃত্রিম পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত  সময়োপযোগী। যুগের সাথে তালমিলিয়ে

শিশু-কিশোরদের সুপ্ত জ্ঞান এবং সৃজনশীলতাকে নতুনত্বের মাধ্যমে চলমান, পরিবর্তনশীল এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিমণ্ডলে তোলে ধরা। রঙের সাহায্যে অনুভূতি ও ভাবনার বিকাশ ঘটিয়ে প্রতিভাকে উন্মোচিত করা। সর্বোপরি দেশ ও জাতিকে একটি সুন্দর ভবিষ্যত উপহার দেয়ার লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে চারুপাঠ।

চারুপাঠের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মার্জিয়া হোসাইন পপি বলেন, অত্যন্ত সফলতার সাথে ১৫টি বছর অতিক্রম করল আমাদের স্বপ্নজয়ী“চারুপাঠ”। মনে হয় এইত সেদিন আমরা তিনজন বসে চিন্তা করছিলাম সিলেটে কোন ভাল ছবি আঁকার প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে শুধুছবি আঁকার মাধ্যমে শিশুদের কল্পনার জগৎটাকে জানা যায়। কেবল চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা ও স্কুলের পরীক্ষায় পাশ করানোর জন্য ছবি আঁকা শেখানো আমাদের কাছে কখনো পছন্দের ছিলনা। আমাদের মনে হতো শিশুরা যা দেখবে তাই তারা তুলির আচড়ে প্রকাশ করবে। আর এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে মাত্র তিনজন ছোট্ট শিক্ষার্থী নিয়ে আমাদের চারুপাঠের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এখন অবধি সফলতার সাথেই চলমান আছে। সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় আমাদের সর্বক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন চারুপাঠের উপদেষ্টা পরিষদ এবং সিলেটের গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। এই গুণীজনদের পেয়ে“চারুপাঠ” কর্তৃপক্ষ গর্বিত ও কৃতজ্ঞ। শুরু থেকে আজপর্যন্ত এই গুণী ব্যক্তিত্ব আমাদের চারুপাঠ পরিবারের সাথে যুক্ত রয়েছেন। ২০০৭ সাল থেকে চারুপাঠ যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে ১ যুগপূর্ণ হলো। অনেক প্রতিকুলতার মধ্যে চারুপাঠ সকলের দোয়া আশীর্বাদে তার সফলতার দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁচেছে। 

'চারুপাঠ' এর চারুশিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক প্রশান্ত কুমার দাশ বলেন, চারুপাঠে রয়েছে প্রতি ব্যাচের জন্য আলাদা আলাদা কক্ষ, সময় ও শিক্ষক-শিক্ষিকা।

চারুপাঠের নিজস্ব সিলেবাসি অনুযায়ী শিক্ষা দান। শিক্ষার্থীদের প্রতিটি ব্যাচে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনুপাত ১ : ৬। 

শিক্ষার্থীদের মধ‍্যে প্রতিযোগিতামূলক  মনোভাব গড়ে তোলার লক্ষ্যে বছরের উল্লেখ যোগ্য দিবস গুলাতে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা।

প্রত্যেক মাসের প্রথম সপ্তাহে মাসিক পরীক্ষার আয়োজন করা হয় এবং বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার প্রদান। এছাড়া প্রতিবছর তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ‘স্টুডেন্ট অব দ্যা ইয়ার’পদক প্রদান। সম্পূর্ণ কোর্স সমাপ্তির পর আনুষ্ঠানকি ভাবে শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর শিক্ষার্থীদের শিল্পকর্ম নিয়ে চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন ও বিজয়ীদের মধ্যে পদক প্রদান করা হয়ে থাকে। পঞ্চম বর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থীদের কোর্স সমাপ্তির পর দু’বছর তৈল রঙের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। 

প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক নন্দিতা দেব জানান, ২০২০ সালে 'চারুপা' বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে তার যুগপূর্তী উৎসব পালন করেছে। 

যুগপূর্তীতে অনুষ্ঠানমালায় ছিল আমাদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা ও চিত্রপ্রদর্শণী। এই চিত্রপ্রদর্শণীতে চারুপাঠের ২৫৩ জন শিক্ষার্থীর তৈল রং, জল রং, রং পেন্সিল, পেন্সিল স্কেচ, কোলাজ, পেনস্কেচ, ওয়েল প্যাস্টেল সহ বিভিন্ন মাধ্যমে আঁকা মোট ৬৫০টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। তারমধ্যে থেকে সেরা ৫টি শিল্পকর্মকে 'শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পদক' ও ১৫টি শিল্পকর্মকে 'চারুপাঠ পদক' প্রদান করা হয়েছে। এই প্রদর্শনী সফল হয়েছে আমাদের অভিজ্ঞ শিক্ষকমন্ডলীর অক্লান্ত শ্রম, সম্মানীত অভিভাবক বৃন্দের সহযোগিতা আর শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়। যুগপূর্তি উৎসব ছাড়াও অতীতে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অনেক সাফল্য এনে দিয়েছ্ েযেমন: ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিশুি দবস ও জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করে সামির ইসতিয়াক। যার ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে চারুপাঠের শিক্ষার্থী ত‚র্য্য দত্ত উক্ত দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করে। এছাড়াও ‘চারুপাঠ’ থেকে কোর্স সমাপ্ত করে অনেক শিক্ষার্থী তাদের শৈল্পিক মেধা ও দক্ষতা দিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়ণরত এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত রয়েছে। 

পরিচালকগণ জানান, অনেক গতিশীল ধারায় চলছিল আমাদের কার্যক্রম। কিন্তু ২০২০ সালের মার্চ মাসে এসে শুধু আমরাই নয় গোটাবিশ্ব জুড়ে যেন একটা আতংক কাজ করছিল সবার মাঝে। করোনার ছোবলে গ্রাস করে নিয়েছে যেন সবকিছু। কত আপনজন হারানোর বেদনা। প্রকৃতিও যেন স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। কখন যে কিহবে কেউই যেন বুঝে উঠতে পারছিলনা। এমন পরিস্থিতিতে ‘চারুপাঠ’ কিন্তু বসে থাকেনি। নতুন ধারায় চলতে শুরু করে। আমরা ঠিক করলাম যে বাচ্চাদের কিভাবে ব্যস্ত রাখা যায়। যাতে তাদের সৃজনশীলতা হারিয়ে না যায়। শুরু হলো অনলাইনে ছবি আঁকার ক্লাস। আমাদের শিক্ষক মন্ডলীর পারদর্শীতায় চারুপাঠকে আমরা এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছি এবং কোমল মতি ছাত্রছাত্রীদেরকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে মহামারী নামকযন্ত্রনা থেকে ছবি অংকনের মাধ্যমে তাদের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তুলতে সর্বাত্বক চেষ্টা করেছি মাত্র। সময়ের পরিক্রমায় আমরা আবারও অনলাইন মাধ্যমের পরিবর্তে সরাসরি ছবি আঁকা পুরোদমে শুরু করে তাদেরকে নতুন উদ্দ্যমে নতুন আঙ্গিকে নতুন পরিবেশে সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করতে পারি এটাই আমাদের অঙ্গীকার। 

চারুপাঠের ৬ষ্ঠ বর্ষের ডোনাটেলো ব‍্যাচের শিক্ষার্থী তাহলিদা ইয়াছমিন তার অনুভূতি ব‍্যক্ত করে জানায়, চিত্রকলা এমন একটি শিল্প যা আমাদের বাস্তব জীবনের পাশাপাশি কাল্পনিক জগতকেও  স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। আমি খুব ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন রেখা টেনে ছবি আঁকার চেস্টা করি। কখনো তা ফুল পাখির রুপ নেয়, কখনো অজানা কোন বস্তু। আস্তে আস্তে ছবি আঁকা আমার শখ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ভালো করে আাঁকতে পারতাম না বলে সিলেটের স্বনামধন্য আর্ট স্কুল 'চারুপাঠ চারুবিদ‍্যালয়' এ ভর্তি হই। অতি দক্ষ শিক্ষকদের সাহায্যে ভালো করে আঁকতে শিখি এবং আমার ছবি আঁকার শখের জগতে আজ আমি একজন ক্ষুদে শিল্পী।

অভিভাবকদের মধ‍্যে কথা হয় স্বর্নালী দাসের সাথে। তিনি বলেন বাচ্চাদের নরম মনে যদি সঠিকভাবে শিল্পের ছোঁয়া পায়, তাহলে  তাদের শিল্পী মনের বিকাশ চরিত্রেও ফুটে উঠে। এই ধারণা থেকে যখন আমার দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে যখন চিন্তায় ছিলাম তাদের ছবি আঁকার শখ কিভাবে পূরণ করবো,  তখনই জানতে পারলাম চারুপাঠের কথা। চারুপাঠের অবর্ননীয় সাফল‍্যের কথা। আজ আমার ধন‍্যবাদ শব্দটা কম হয়ে যাবে "চারুপাঠের" জন‍্য।  আমি এর চেয়েও বেশি কিছু বলার ইচ্ছা থাকলেও ভাষার সীমাবদ্ধতা আমাকে আটকে দিয়েছে। আমার দুই সন্তান কৃষ্ণ এবং গুনগুন  চারুপাঠের সহযোগিতায় রং ও তুলি নিয়ে ছবি আঁকতে আঁকতে আজ ধৈর্যশীল ও সৃজনশীল হয়ে উঠেছে। তাদের রং-তুলির ব‍্যবহার দেখে আমার নিজেরও ছবি আঁকার ইচ্ছে জাগত। চারুপাঠ এমন নিখুঁতভাবে ছবি আঁকা শেখায় যেন ছবির ক‍্যানভাস জীবন্ত হয়ে উঠে। রঙের ব‍্যবহার শিখতে শিখতে আজ আমার ছেলে-মেয়েরা নিজেদেরকে গোছানো রাখতে শিখে গেছে। যার জন‍্য আমি চারুপাঠের শিক্ষক ও কলাকৌশলীদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আমি চারুপাঠের উত্তরোত্তর উন্নতি কামনা করি।'

সিলেট প্রতিদিন/ইকে

বিজ্ঞাপন স্থান


পুরাতন সংবাদ খুঁজেন

ফেসবুক পেইজ