বহিস্কার কী পারবে সিলেটে আ.লীগের বিদ্রোহ ঠেকাতে?
রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:২৬ অপরাহ্ন

মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম

প্রকাশ ২০২১-১১-২৫ ০৫:০০:৪৫
বহিস্কার কী পারবে সিলেটে আ.লীগের বিদ্রোহ ঠেকাতে?

মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম:: তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীর বিরুদ্ধে নিজ দলের নেতারা প্রার্থী হওয়ায় সিলেটে ১০ প্রার্থীকে বহিস্কার করেছে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ। তবে বারবার সতর্ক করার পরও এসব বিদ্রোহী প্রাথীরা নিজেদের মনোনয়ন প্রত্যাহার না করে নির্বাচনী মাঠে বহাল থাকায় দলীয় প্রার্থীদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্রোহীদের মোকাবেলা করা। তৃণমূলে এখন আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত ইউপি নির্বাচনে হয়েছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহ। নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের মাঝে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। তারা প্রশ্ন রাখছেন আওয়ামী লীগ থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিস্কার করলেই কী দলীয় প্রার্থী জিতে যাবে? বহিস্কার করলেই কী বিদ্রোহ ঠেকানো সম্ভব?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণ সুরমার সিলাম ইউনিয়নের তৃণমূল আওয়ামী লীগের একজন কর্মী বলেন, দল করতে হলে দলের নিয়ম মেনেই করতে হবে। কিন্তু ইউনিয়ন নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা প্রার্থী হয়েছেন তারা দলের শৃংখলা পরিপন্থি কাজ করেছেন।

তবে কেউ কেউ অবশ্য অন্য কথাও বলছেন। দক্ষিণ সুরমার মোগলাবাজার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সানুর মিয়া বলেন, তৃণমূলের ভোটে বিজয়ী প্রার্থীদের কেন্দ্র যেহেতু মনোনয়ন না দিবে তাহলে এই ভোটের কী প্রয়োজন ছিলো? আমরা অনেক দিক বিবেচনা করে আমাদের প্রার্থী নির্বাচন করেছিলাম। কিন্তু কেন্দ্র তাকে মনোনয়ন না দিয়ে আমাদের অবমূল্যায়ন করেছে।

আওয়ামী লীগ নেতা সানুর মিয়ার মতো বেশ কয়েকজন তৃণমূল নেতারই এই মত। তারা মনে করেন, তৃণমূলকে অবমূল্যায়নের কারণেই বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন অনেকে। আর তার খেসারত দলকেই দিতে হবে।

জানা যায়, তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে সিলেটের ৩ উপজেলা দক্ষিণ সুরমা, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরের ১৬টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আসছে ২৮ নভেম্বর। ইতোমধ্যে নির্বাচনী এলাকায় চলছে জোর প্রচারণা। এই তিন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীদের রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে নির্বাচন করছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা। দলের প্রার্থীর বিজয় ঠেকাতে এরাই শেষ পর্যন্ত দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারেন বলে মনে করছেন ভোটাররা।

অন্যদিকে, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় ৩ উপজেলায় ১০ নেতাকে বহিস্কার করেছে জেলা আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগেই তাদের বহিস্কার করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিলেটের দক্ষিণ সুরমার সিলাম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শাহ ওলিদুর রহমানের মুখোমুখি হয়েছেন বিদ্রোহী মুজিবুর রহমান। জালালপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ওয়েছ আহমদের সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী নেছারুল হক চৌধুরী মোস্তান। মোগলাবাজার ইউনিয়ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হয়েছেন সদরুল ইসলাম। তার সঙ্গে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন ফখরুল ইসলাম শায়েস্তা। দাউদপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল হককে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে প্রার্থী হয়েছেন নুরুল ইসলাম আলম, লালাবাজার ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী তোয়াজিদুল ইসলাম। যদিও এখানে তৃণমূলের ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন আছাব আহমদ। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র থেকে তোয়াজিদুল ইসলামকে নৌকা প্রতিক দেয়ায় তিনি নির্বাচন থেকে সওে দাঁড়ান।

গোয়াইনঘাটের রুস্তুমপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মাসুক আহমদ। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী আব্দুল মতিন। ফতেহপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন বিদ্রোহী আমিনুর রহমান চৌধুরী। লেঙ্গুরা ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী মুজিবুর রহমান। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া রাসেল। নন্দিরগাঁও ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কামরুল হাসান আমিরুল। তার সঙ্গে বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে রয়েছেন সিরাজুল ইসলাম। ডৌবাড়ি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সুভাস দাশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়েছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এম নিজাম উদ্দিন। তোয়াকুল ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী লোকমান আহমদের বিদ্রোহী হয়েছেন শামসুদ্দিন আহমদ।

সীমান্তবর্তী জৈন্তাপুর উপজেলার জৈন্তাপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুর রাজ্জাক রাজা। তার সঙ্গে বিদ্রোহী হয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন আব্দুল কাইয়ূম। চা বাগান অধ্যুষিত চিকনাগুল ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কামরুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুর রশিদ বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন।

এদিকে, দলীয় শৃঙ্খলা অমান্য করে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় দক্ষিণ সুরমার ৫ জন, জৈন্তাপুরের একজন ও গোয়াইনঘাটের চার নেতাকে বহিস্কার করেছে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ।

বহিষ্কৃতরা হলেন- দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নে বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোহাম্মদ নেছারুল হক বুস্তান, মোগলাবাজার ইউনিয়নে বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা ফখরুল ইসলাম সাইস্তা, একই ইউনিয়নে আরেক বিদ্রোহী প্রার্থী ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা শামিনুল হক শেবুল, সিলাম ইউনিয়নের বিদ্রোহী প্রার্থী ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুর রহমান, দাউদপুর ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলাম আলম।

গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক, ফতেহপুর ইউনিয়নের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী আমিনুর রহমান চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক, ডৌবাড়ি ইউনিয়নে বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী এম নিজাম উদ্দিন, নন্দীরগাঁও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম এবং উপজেলা যুবলীগের সদস্য ও লেঙ্গুরা ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া রাসেল।

এছাড়া জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নে বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আমিনুর রশিদ।

তাদের বহিস্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান।

তাঁরা জানান, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় গঠনতন্ত্রের ৪৭ ধারার ১১ উপধারা অনুযায়ী শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দলে নিজ নিজ পদ ও দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে ১০ আওয়ামী লীগ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, তৃতীয় ধাপে আগামী ২৮ নভেম্বর সারাদেশের এক হাজার সাতটি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ দিন সিলেট জেলার ১৬টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণ অনুষ্টিত হবে।

সিলেট প্রতিদিন/এমএনআই

ফেসবুক পেইজ