কৃষিতেই হাসি বাদেআলী গ্রামের রজব আলীর
রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:১৬ অপরাহ্ন

এনামুল কবীর

প্রকাশ ২০২১-১১-২৪ ১০:৩৫:৪২
কৃষিতেই হাসি বাদেআলী গ্রামের রজব আলীর

সন্তানের একটি ভালো বিয়ে সব বাবা মা-ই চান। নিজের অবস্থা যাই হোকনা কেন, জামাই বা পুত্রবধূর সাথে সাথে বেয়াইর বাড়িটিও হতে হবে দৃষ্টি নন্দন- এমন একটা ধারণা বৃহত্তর সিলেটসহ প্রায় সারাদেশে খুব প্রচলিত। আর তাই একটা উন্নত বা মানসম্পন্ন বাড়ি তৈরির মানসিক তাগাদা অভিভাবকদের অনেক সময় ব্যাকুল করে তুলে। 

তেমনি ব্যাকুল করে তুলেছিল সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেয়ালী গ্রামের কৃষক ষাটোর্ধ্ব রজব আলীকে (৬৫)। ৪ ছেলে আর ৩ মেয়ের জনক রজব আলীর ছিল দুটি কুঁড়েঘর। তবে সন্তানদের ভালো বিয়ের প্রত্যাশায় স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলেন, যে করেই হোক, একটা দালান তাকে তুলতেই হবে। 

সেই চেষ্টা শুরু করেছিলেন ১০/১১ বছর আগে। ছেলে- মেয়েদের নিয়ে নিজের তিন কেদার জমির সাথে শুরু করলেন বর্গাচাষ। প্রায় সারাবছর ক্ষেতের জমিতেই পড়ে থাকতেন তিনি এবং তার ছেলেরা। কাজ করতেন স্ত্রী এবং মেয়েরাও। কঠোর পরিশ্রমের ফলে সোনার ফসলে ভরে উঠে মাঠ। সেই ফসল বিক্রি করে সংসারের যাবতীয় খরচের পরেও বেঁচে যাওয়া টাকা জমাতে শুরু করলেন। জমাতে জমাতেই একসময় দালান তোলার মতো অবস্থায় পৌঁছে গেলেন রজব আলী। তার স্বপ্নের দালান! 

তবে এই দালানকোঠা তৈরিতে জমানো টাকার সাথে সাথে বিক্রি করতে হয়েছে তার কিছু জমিও। সেই সত্যটাও স্বীকার করলেন অকপটে।

ছোট বেলা থেকেই তিনি কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। সম্পৃক্ত এখনো। তবে বয়স হয়ে যাওয়ায় এখন আর নিজে অতটা কাজ-টাজ করতে পরেন না। ৪ ছেলের তিনজন ক্ষেত-খামার চালাচ্ছেন। অপরজন বিদেশে। নিজে এখন কেবল সার্বিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। 

কৃষিতে তার যে অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখনো তার ছেলেরা ভালো ফসল উৎপাদন করেন। আয়ও হচ্ছে ভালো। 

রজব আলী এক মেয়ে আর এক ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন নিজের পছন্দ মত। আর বছর তিনেক আগে এক ছেলেকে পাঠিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে। তার আয়ও যথেষ্ট ভালো। এসব কিছুই হয়েছে কৃষিতে তার অসাধারণ সাফল্যের কারণে। 

পরিবারের সদস্যদের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখে তৃপ্তি পান তিনিও। এমনসব অর্জন যার কেবল কৃষি থেকে, তাকে একজন সফল কৃষক বলতে দ্বিধা নেই কারও। এমনকি এলাকার লোকজনও এ কারণে তাকে বিশেষ সম্মাণ প্রদর্শন করেন। কৃষি সংক্রান্ত কোন বিষয়ে পরামর্শের প্রয়োজন হলে তারা ছুটে আসেন রজব আলীর কাছে। বাদেয়ালী গ্রামে প্রবেশ করে সফল একজন কৃষকের সাক্ষাত পেতে কাউকে জিজ্ঞেস করলে তারা যার কথা সবার আগে বলেন, তিনি রজব আলী। 

রজব আলী একসময় প্রায় সবধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদনের সাথে জড়িত ছিলেন। ধানের পাশাপাশি বছরের বিভিন্ন মৌসুমে যেসব সব্জি উৎপাদন হয়, তিনি তার সবগুলোই চাষ করতেন। এখন করছেন তার ছেলেরা। ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গার সাথে শীতকালীন প্রায় সবধরনের সব্জিই তিনি উৎপাদন করেন। তিনি বলেন, 'হারাবছর ক্ষেতো থাকি। আমি কাম না করলেও ছেলেরা করে। ঝিঙ্গা চিচিন্দা শিম টমেটো লাউ- সবতাউ ফলাই।'

এবার রজব আলী লাউ টমেটো আর শিম চাষ করেছেন প্রায় ৩ কেদার জমিজুড়ে। এরমধ্যে দেড় কেদার নিজের আর ভাড়া নিয়েছেন আরও দেড় কেদার। সবমিলিয়ে তার বিনিয়োগ ৬০ হাজার টাকার কাছাকাছি। লাউয়ের ফলন ভালো হয়েছে খুব। ইতিমধ্যে বেশ ভালো দামে বিক্রি করতেও শুরু করেছেন। শিম আর টমেটোও খুব ভালো হবে বলে আশাবাদী তিনি। 

সবদিক বিবেচনায় এবং দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দীর অভিজ্ঞতার আলোকে জানালেন, এবার কম হলেও কেবল শীতকালীন সব্জি থেকে তার লাভ অন্তত ৮০/৯০ হাজার টাকার মত হবে।

অবশ্য লাউ ছাড়া এখনো আর কোন সবজি বাজারে তুলতে পারেন নি রজব আলী। বললেন, আরও ১০/১২ দিন পর শিম এবং ২০/২২ দিন পর টমেটোও বাজারে নিতে পারবেন।

বর্তমান সরকার কৃষিকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃষকদের ভর্তুকি দিয়ে নানা সুযোগ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। তবে সার, বীজ আর কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের লাভ কিছুটা কমেছে। আর সিলেট সদরের কৃষি কর্মকর্তারা তাদের তেমন একটা সহযোগীতা করছেন না বলেই তার কথাবার্তায় মনে হলো। 

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‌'কৃষি কর্মকর্তা একবার আইছিল। বাক্কা মানুষ দলা করল। অতা দিবো হতা দিবো কইল কিন্তু পরে আর তার কোন খবর পাইলামনা। টুকটাক সরকারি সাহায্য আইলেও পাইরা মেম্বার চেয়ারম্যান হকলর কাছার মানষে। তারা আবার কেউ প্রকৃত কৃষকউ নায়।'

রজব আলীর বয়স হয়েছে। সেই সাথে শরীরে নানা রোগও বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। আগের মতো নিজে মাঠে সময় দিতে না পারলেও জানালেন, বাড়িতে থাকা তার তিন ছেলেও কঠোর পরিশ্রম করছেন। তাদের একজন একটা কলেজে অনার্স পড়ছে। নিজের কলেজ আর পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে কৃষিকাজে অন্য দুই ভাইকেও যথেষ্ট সহযোগীতা করে সে। ঘরে বিবাহযোগ্য একটা মেয়ে আছে। সব ছোট মেয়েটি স্কুলে পড়ছে। নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সে।

৯ সদস্যের একটা বড় সংসার চালানোর পর দালান তৈরি আর এক ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। এখন তার জীবন-যাপনের মানও অনেক উন্নত। তার মতো সাফল্য প্রত্যাশী কৃষকদের জন্য রজব আলীর পরামর্শ, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করলে কৃষিতেই তৃপ্তির হাসি মিলতে পারে যে কারও মুখে।

সিলেট প্রতিদিন/ইকে

ফেসবুক পেইজ