আ’লীগ : হাজার অভিযোগ ব্যবস্থা হয় কয়টার
রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:৫৭ অপরাহ্ন

প্রতিদিন ডেস্ক

প্রকাশ ২০২১-১১-২২ ১২:৫২:১১
আ’লীগ : হাজার অভিযোগ ব্যবস্থা হয় কয়টার

দলীয় কোন্দল, ত্যাগী নেতাদের কোণঠাঁসা করা, নির্বাচনি সহিংসতা, মনোনয়ন বাণিজ্য ও দলীয় নেতাদের স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের হাজার অভিযোগের স্তূপ পড়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে। তবে এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই বা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব কম।

শুধু মনোনয়ন বিতর্কই নয়; এর বাইরেও সারা দেশ থেকে বিভিন্ন সাংগঠনিক অভিযোগ জমা পড়েছে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। এর মধ্যে রয়েছে তৃণমূলের সম্মেলনে এমপিদের অনুগত, অনুপ্রবেশকারী ও হাইব্রিডদের কমিটিতে রাখা, বিতর্কিত ব্যক্তিদের দলে ভেড়ানো ও দলীয় পদে থেকে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া সংক্রান্ত।

মনোনয়ন বিতর্কের অভিযোগগুলোকে শুরুতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই এখন একে অন্যের দিকে ‘রাজাকার’-এর তকমা লাগানোর চেষ্টা করছেন। যার সঙ্গে তার বনবে না, তাকে বলবে রাজাকারের ছেলে। অথবা বলবে রাজাকারের নাতি বা শান্তি কমিটির সদস্য ছিল তারা। এসব অভিযোগ করে একজন আরেকজনের প্রতিপক্ষকে। এসব অভিযোগের স্তূপ হয়ে গেছে পার্টি অফিসে।

কিন্তু দ্বিতীয় ধাপের ফলাফলে টনক নড়েছে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডের। বেশ কিছু ইউপিতে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে নৌকার প্রার্থীদের। দলীয় সূত্র জানায়, এরপরই প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ নিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদকরা কাজ করছেন।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, তৃণমূল থেকে কোনো অভিযোগ এলেই আমরা ব্যবস্থা নেই। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে, আওয়ামী লীগ না বিএনপি করত এসব ভেরিফাই (যাচাই-বাছাই) করে অপসারণ করছি। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন ইউনিট থেকে অভিযোগ আসতে হবে।

তৃণমূলে অনুপ্রবেশ ও সুবিধাবাদীদের বিষয়ে তিনি বলেন, এ রকম যখন ধরা পড়ে তখন আমরা ব্যবস্থা নেই। দলে অনুপ্রবেশ করে উদ্দেশ নিয়ে। অনেকে প্রকাশ্যে যোগদান করে। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হলে কিছু মানবসম্পদ দরকার হয়, তাকে পজিশন দিয়ে অনেক সময় দলে নিয়ে আসা হয়। আর উড়ে এসে আওয়ামী লীগের বড় পদে বসার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, তবে আমরা সুবিধাবাদীদের বিষয়ে অলওয়েজ সতর্ক। তারা এই পার্টিতে জায়গা পাবে না। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের সাংগঠনিক অবস্থা কতটা অগোছালো, চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সে চিত্র ফুটে উঠেছে। গত দুই ধাপের ইউপি নির্বাচনে ৪১১টিতে জিতেছে স্বতন্ত্র প্রার্থী, যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, দুই ধাপে ইউপিতে নৌকার প্রার্থী জিতেছেন ৭৫৩টিতে। এর মধ্যে ২৫০ জন নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন ৪১১টিতে। যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী। বিদ্রোহীদের পেছনে অনেক জায়গায় প্রভাবশালীদের মদদ ছিল। আগামী ২৮ নভেম্বর তৃতীয় ধাপে ১ হাজার ৪টি ইউপিতে ভোট। ১ হাজার ৬৯ জন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এখনও ভোটের মাঠে রয়েছেন।

কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্রোহীদের মদদদাতা মন্ত্রী-এমপিদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। গত শুক্রবার দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, একাদশ নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীরা নির্বাচিত হতে দলীয় কোনো অংশের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ুক তা আমরা চাই না। বিদ্রোহী প্রার্থী আমাদের শঙ্কার বিষয়। এখন শোকজ করা হচ্ছে, সাসপেন্ড করা হচ্ছে, নোটিসের যথাযথ জবাব না পেলে ভবিষ্যতে বহিষ্কার করার পথও পরিষ্কার হচ্ছে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের জেলা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের ৬টিতে নৌকা প্রতীক সামান্য ব্যবধানে জয়লাভ করলেও ৮টিতে দলের প্রার্থীরা হেরেছেন বিপুল ভোটের ব্যবধানে। এ ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪টিতে আওয়ামী লীগের একসময়ের ত্যাগী ও আওয়ামী পরিবারের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ‘রহস্যজনক’ কারণে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে তারা বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। একটি ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী পঞ্চম হয়েছেন। স্থানীয় নেতারা মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ না পেয়ে জামানত হারিয়েছেন। এ ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে নৌকার প্রার্থী মো. মজিবর রহমান মোল্লা পেয়েছেন মাত্র ৩২৫ ভোট।

পরাজয় প্রসঙ্গে কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপিকা তাহমিনা সিদ্দিকা বলেছেন, মাদারীপুরের জনপদ আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। এখানে আওয়ামী লীগের যত জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, সবটাতেই জয়ী হয়েছেন। কিন্তু এবার ইউপি নির্বাচনে এক প্রভাবশালী নেতার অনৈতিক বাণিজ্যের কারণে নৌকার পরাজয় হয়েছে।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার পোড়াদহ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শারমিন আক্তার নাসরিন চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছয়জনের মধ্যে পঞ্চম হয়েছেন। ইউনিয়নের ৩১ হাজার ভোটের মধ্যে তিনি ৪২৭ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন। ‘স্বাধীনতাবিরোধীর’ মেয়ে নৌকা পেয়েছেন, এমন অভিযোগ তুলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা বিভক্ত হয়ে পড়েন।

দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় ১১ ইউপির মধ্যে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীকের চার প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন। ইউনিয়নগুলো হলো- রায়নগর, আটমুল, মাঝিহট্ট ও সৈয়দপুর।

শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল ইসলাম এমদাদ জানান, দলীয় কোন্দল, বিদ্রোহী প্রার্থী ও আর্থিক অস্বচ্ছলতার জন্য নৌকার পরাজয় হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী নৌকা প্রতীকের ওয়াসিম আহমেদ তার জামানত হারিয়েছেন।

এ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন প্রথমে বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখিকে দেয়। কিন্তু নাসিরনগরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও মন্দির ভাঙচুর মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়ায় গণমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখির বদলে ওই ইউনিয়নে ওয়াসিম আহমেদকে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন প্রদান করে।

দ্বিতীয় ধাপে পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নৌকার দুই প্রার্থী। তারা হলেন- উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী মো. হারুন অর রশিদ লিটন (নৌকা-১১৫৯ ভোট), বুড়াবুড়ি ইউনিয়নে মো. শেখ কামাল (নৌকা-৩৩৪ ভোট)।

কক্সবাজারে ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জামানত হারিয়েছেন নৌকার দুই মাঝি। তারা হলেন- উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মনজুর আলম ও রামুর রশীদ নগর ইউনিয়নের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মোয়াজ্জেম মোর্শেদ।

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরকাদিরা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জামানত হারিয়েছেন নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী নুরুল ইসলাম সাগর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।

ঢাকার ধামরাই, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরসহ দ্বিতীয় ধাপের ভোটে আরও কয়েকটি ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীরা জামানত হারিয়েছেন। দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নৌকা প্রতীক দেওয়া হলেও কীভাবে দলের প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়; সেটা নিয়ে আওয়ামী লীগে অস্বস্তি কাজ করেছে।

মাদারীপুরসহ কয়েকটি স্থানের এমন অবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের শুক্রবারের বৈঠকে আলোচনাও হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বিষয়গুলোকে শঙ্কার বলে মন্তব্য করেছেন।

দলের নেতারা বলছেন, তৃণমূলের এমন বেহাল অবস্থা দেখে সারা দেশ থেকে আসা সব অভিযোগ খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক নেতাদের।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, বিগত দুই ধাপসহ আগামী তিন ধাপের ইউপি নির্বাচনে যারা বিদ্রোহী প্রার্থীদের মদদ দেবে। তাদের তালিকা তৈরি হবে। পরে দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় দফতরে জমা পড়া অভিযোগগুলোও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা দেখবেন বলে জানান তিনি।

সিলেট প্রতিদিন/এমএ

ফেসবুক পেইজ