বোন জামাইকে গুলি করে থানায় হাজির শ্যালক
রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:৫৩ অপরাহ্ন

প্রতিদিন ডেস্ক

প্রকাশ ২০২১-১১-২২ ১২:৫৮:৩৩
বোন জামাইকে গুলি করে থানায় হাজির শ্যালক

ঘাতক জাসফিকুর রহমান রাজধানীর দারুস সালামে বোন জামাইকে গুলি করে হত্যার নেপথ্যে কোটি টাকার সম্পত্তির বিষয়টি ঘুরেফিরে সামনে আসছে। মুক্তিযোদ্ধা বাবার লাইসেন্সকৃত শটগান দিয়ে গুলি করে দুলাভাই ফারুক হোসেনকে হত্যা শেষে মা এবং ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে অস্ত্রসহ নিজেই থানায় হাজির হন প্রধান অভিযুক্ত নিহতের শ্যালক জাসফিকুর রহমান অশ্রু।

গত শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দারুস সালামের কোটবাড়ী এলাকার একটি বাসায় এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ফারুকের মা আজমেরী বেগম বাদী হয়ে দারুসসালাম থানায় আটজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুদ্ধাহত মৃত হাজী লুৎফর রহমান এবং জাহানারা দম্পতির চার ছেলে মেয়ে। ১৪২/১ কোটবাড়ী নামাপাড়ার ৫ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ৫ তলা ভবন, মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের দোকান ভাড়া, কল্যাণট্রাস্ট থেকে প্রাপ্ত অর্থ এসবকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক কলহ চলছিল। বাড়ি, দোকান ও অন্যান্য সম্পত্তিসহ কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে তাদের। যার পুরোটাই এখন তাদের মা, ছোট দুই ভাই-বোন ভোগ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিহত ফারুক হোসেন এবং শাকিলা জাহান অপু দম্পতির সংসারে ১২ বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে।

জীবনে অনেক ন্যাপি পাল্টিয়েছি, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করলেন তিনি ছয় সন্তানের বাবা

বাবার মৃত্যুর পর স্বামী ফারুক হোসেনকে নিয়ে অপু তার বাবার বাসার পাঁচতলা ভবনের নিচতলার একটি ইউনিটে থাকেন। বাকিগুলো ভাড়া দিয়েছেন। এ ছাড়া দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তলায় তার মা, ভাই এবং আরেক বোন থাকেন। চতুর্থ এবং পঞ্চমতলা পুরোটাই ভাড়া দেয়া হয়েছে। ফারুক হোসেন দারুসসালাম এলাকায় ইট বালুর ব্যবসা করতেন। গত চার বছর আগে তাদের বাবা মারা গেলে অপুর ছোট ভাই, মা এবং ছোট বোন পুরো সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা করে। তাদের ছোট মামা মিনহাজ উদ্দিন এবং তার স্ত্রী শামীমা বেগমের সহায়তায় অপু এবং তার বড় বোনকে বাবার সকল সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিহত ফারুকের স্ত্রী অপু এবং তার বড় বোনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতিয়ে নেয়া হয়। পরবর্তীতে বলা হয় অপুর ছোট দুই ভাই-বোন এবং তাদের মা সকল সম্পত্তির মালিক। তাদের নামে কিছু নেই।

সম্প্রতি অপু তার ছোট মামিকে সম্পত্তির বিষয়ে ঝামেলা সৃষ্টির অভিযোগে বকাঝকা করেন। পরবর্তীতে ছোট মামি তাদের মা’কে ফোন দিয়ে পুরো বিষয়টি জানায়। এ সময় মা জাহানারা বেগম একমাত্র ছেলে জাসফিকুর রহমান অশ্রুকে ঘুম থেকে ডেকে তার নামে লাইসেন্সকৃত শটগান সিন্দুক থেকে বের করে ছেলের হাতে তুলে দেন। নিহত ফারুকের পারিবারিক সূত্র জানায়, সিন্দুকের চাবি সাধারণত তার মায়ের কাছে থাকে। এ ছাড়া বাবা মারা যাওয়ার পর তার মায়ের নামে এটি নতুন করে নবায়ন করা হয়। ঘটনার দিন দুপুর ১২টার পরে প্রথমে তাদের মা জাহানারা বেগম ও ছোট বোন নিচতলায় নামেন। এ সময় জাসফিকুর সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে শটগানের ট্রিগার চেপে ধরে মেজো বোন অপুকে লক্ষ্য করে বুকে গুলি তাক করেন। এ সময় অপুর স্বামী ফারুক কাজ শেষ করে বাসায় প্রবেশ করেন। অপু তার স্বামীকে জানায়, জাসফিকুর অস্ত্র নিয়ে তাকে গুলি করতে এসেছে থানায় ফোন দিতে হবে।

ফারুক ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বাইরে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাসফিকুর তার বুকে গুলি চালায়। গলার নিচে বুকের বাঁ’পাশে গুলি লাগায় সঙ্গে সঙ্গে ফারুক মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়। এ সময় তাকে উদ্ধার করে গুরুতর আহত অবস্থায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ ঘটনার পরপরই জাসফিকুর, তার মা জাহানারা বেগম এবং ছোট বোন থানায় এসে পুলিশের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে বোন জামাইকে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেন।

এ বিষয়ে নিহত ফারুকের স্ত্রী শাকিলা জাহান অপু স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অপু মানবজমিনকে বলেন, ফ্ল্যাটের সামনে মেঝেতে এখনো আমার স্বামীর বুকের রক্তের দাগ লেগে আছে। বাবার কোটি টাকার সম্পত্তি থেকে বড় বোন এবং আমাকে বঞ্চিত করতেই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আমার ভাই এবং মা মূলত আমাকে হত্যা করতে চেয়েছে। আমাকে মেরে ফেললে একজন অংশীদার কমবে সেই উদ্দেশ্যেই জাসফিকুর গুলি করতে আসে। বর্তমানে একমাত্র ছেলেকে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে অবস্থান করছেন অপু। তিনি বলেন, ছোট ভাই জাসফিকুর মাদকাসক্ত। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে এসএসসি এবং এইচএসসি সম্পন্ন করে বর্তমানে বেকার জীবনযাপন করছিলেন। সে মাদক সেবনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে জানান জাসফিকুরের মেজো বোন এবং নিহত ফারুকের স্ত্রী অপু।

এজাহারের বরাত দিয়ে সূত্র জানায়, এ ঘটনায় গত শনিবার রাতে ৮ জনকে আসামি করে পেনাল কোর্টের ৩০২,১১৪ এবং ১০৯ ধারায় অস্ত্র এবং হত্যা মামলা হয়েছে। মামলা নম্বর ৩৩। মামলার ৮ আসামি হলেন, জাসফিকুর রহমান অশ্রু, মা জাহানারা বেগম, ছোট বোন জয় জাহান মিম, আবু রায়হান, রাব্বি, ফরিদ আহমেদ, মিনহাজ এবং শামীমা। এ ঘটনায় জাসফিকুর, জাহানারা বেগম এবং মিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আসিফুর রহমান তুষার বলেন, এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা এবং একটি অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে। হত্যা মামলায় ৮ জন আসামির মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার শেষে আজ (সোমবার) আদালতে তুলে পাঁচদিনের রিমান্ড আবেদন করা হবে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

সিলেট প্রতিদিন/এসএএম

ফেসবুক পেইজ