গ্রাম্য রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব
রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:৪১ অপরাহ্ন

প্রতিদিন ডেস্ক

প্রকাশ ২০২১-১১-০৮ ১১:১৮:৩২
গ্রাম্য রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব

মিলন মাহমুদ : 'মানুষে মানুষে টান' ওসব পুরানো গান। গ্রামের মানুষ সহজ সরল; বিবর্ণ পাড়া, বেরং বাড়ি, নোংরা সরুগলি যেখানে দু'জনের যাওয়ার মতো জায়গা নেই, রঙের সমাহার নেই, নেই ঝলমলে আলোর রোশনাই, প্রাকৃতিক পরিবেশ,মেঠোপথ, ভেজালমুক্ত খাবার, অতিথি পরায়ণতা, কোন সরকারি চাকুরিজীবী বা শিক্ষিত মানুষকে দেখলে চোখে সম্মান ও শ্রদ্ধার উন্মত্ততা প্রভৃতি অকৃত্রিমতা তাদের বৈশিষ্ট্য।

সেখানে রয়েছে শুধু হৃদয়ের টান, যেন এক অকৃত্রিম টান। কোনো পাড়ায় কেউ বিপদে পড়লে সবাই খুব আন্তরিকভাবে সাহয্যের জন্যে ঝাপিয়ে পড়েন। কিন্তু এইগুলার বাহিরেও রয়েছে ভিলেজ পলিটিক্স বা গ্রাম্য রাজনীতি যা নোংরা রাজনীতি বা নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার হয়। অতীতে গ্রামে যে কোনো ধরনের সমস্যা গ্রামীণ সালিশেই সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই গ্রামীণ সালিশ ব্যবস্থা পরিবর্তন হয়েছে এখন তাতে ঢুকে পড়েছে স্বার্থপরতা, পক্ষপাতিত্ব ও অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেন ইত্যাদি। দেশে প্রায় ৭৮.৬% মানুষ গ্রামে বাস করে। নব্বইয়ের দশক থেকে মুক্ত বাজারের অর্থনীতির প্রভাব সম্পর্কে সকলেই কমবেশি জানি।

নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য যত অসাধু পথ খোলা আছে গ্রামের রাজনীতিবিদগণ তা সবই করে থাকেন। গ্রামের মসজিদ, মন্দির,কবরস্থান, শ্মশান, বিদ্যালয় এমনকি যুব সংঘটনের সাথেও তারা জড়িত। ওইসব ফান্ডের যতটাকা পয়সা আছে তার সবকিছুই তাদের হাতে কুক্ষিগত থাকে। তাঁরা তাদের ইচ্ছা মতো সেই টাকা ব্যবহার করে। তাদের নিজেদের সুবিধার কথা ভেবেই কাজকর্ম করে থাকে। মসজিদের টাকা নিয়েও এই সমাজে রাজনীতি হয় যেটার আমি প্রত্যক্ষদর্শী। এটা কিভাবে সম্ভব? তাহলে শুনুন, যদি মসজিদের টাকার হিসাব আমার কাছে থাকে তাহলে আমি গ্রামের মানুষজনকে অনেক সুযোগ সুবিধা দিতে পারবো। যেমন ধরেন মসজিদের নামে পুকুর, জমি ও বিভিন্ন খাসজমি থাকে। উক্ত সম্পত্তি যখন বছর শেষে ইজারা দেওয়া হয় তখন সালিশের আয়োজন করে গ্রামের সবাইকে ডাকা হয় এবং ঐসব সম্পত্তি এক বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়।

একটা নির্দিষ্ট দরকষাকষির মাধ্যমে দাম নির্ধারণ করা হয় এবং নির্দিষ্ট তারিখ থাকে। ইজারা নেওয়া সম্পত্তির পাওনা যখন ওই ব্যাক্তি নির্দিষ্ট সময়ে দিতে না পারে। তখন সে গ্রাম প্রধানের কাছে যায়। তখন গ্রাম প্রধান বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি গোপনে অবৈধপন্থা অবলম্বন করে তাকে বলে যে যখন পারিস দিস।

কিন্তু খবরদার কেউ যেন না জানে। ঐ ব্যক্তি একটু সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করলো এবং সে ভাবে সেই ব্যক্তি বা গ্রাম প্রধান কত মহৎ। (যে তাকে অবৈধভভাবে সময় বাড়িয়ে দিলো) তাই সে আর কখনোই গ্রাম প্রধানের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না এমনকি গ্রাম প্রধান যদি খুব অন্যায় কাজও করে। সে সর্বদা তার পিছনে লাঠি নিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করে। গ্রামীণ বিচারেও চরম পক্ষপাতিত্ব করা হয়। এখানে ধনীদের তেমন সমস্যা হয় না কিন্তু সাধারণ মানুষ একটু ভুল কিছু করলে তাদেরকে একঘরে করে দেওয়া হয়। তাদের সাথে সমাজ-জামাত ত্যাগ করে চলা হয়। সামাজিক কোনো অনুষ্ঠান ও অন্যান্য বিষয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয় না। গরীবের সুন্দরী মেয়েদের প্রতি এবং বউয়ের দিকে কুদৃষ্টি পড়ে গ্রামে ওই বদমাশ মাতব্বরদের। এইসব মাতব্বরদের হাত থেকে রেহায় পায় না যুবসমাজও, তাঁরা নিজেদের দ্বন্দ্ব চাপিয়ে দেয় তাদের সন্তানদের উপর, সন্তানদের বলে দেয় ওদের সাথে মিশবে না, ওরা আমাদের শত্রু।

দেখা যায় এক পাড়া, এক মহল্লায় বসবাস করা সত্ত্বেও যুবসমাজের মধ্যে দলাদলি হয়ে যায়। কিন্তু যদিও তাঁরা চায় একসাথে চলতে, একসাথে বাঁচতে। দেখা যায় অনেক শিক্ষক ও ধনী পরিবারের সন্তান শিক্ষিত হতে পারে না। অথচ গরীবের সন্তান শিক্ষিত হয়ে যাচ্ছে। এতে তাঁদের প্রতিহিংসার আরও বেড়ে যায় এবং মাথায় কুবুদ্ধির জঞ্জাল তৈরি হয়। কারণ শিক্ষক, ধনী, মাতব্বর, ও ক্ষমতাবানদের করা আজীবনের ভণ্ডামির বিষয়গুলা একদিন গরীব ঘরের শিক্ষিত সন্তানেরা জেনে যাবে আর তাতে তাদের শোষণ করার পথ বন্ধ হয়ে যাবে চিরতরে। তাই মাতব্বর ও ধনীরা পদে পদে গরীবদের সন্তানদেরকে বাঁধা দেয় এবং সর্বক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করে। তাদের বাবাদেরকে আর কাজ দেওয়া হয় না, চড়া সুধে ঋণ নিতে বাধ্য করে। যা পরিশোধ অসম্ভব হয়ে পড়ে অনেকের পক্ষে। ফলে তাঁরা মৃত্যুর অভিমুখেও ওইসব মাতব্বরের অনুগত থাকতে বাধ্য হয়।

একসময় এইসব অন্যায় ও অবিচারের জন্য মানুষ অনেক আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কেউবা শহরে চলে আসে। কেউ অভিমানে দাঁতে-দাঁত চেপে গ্রামকে ভালোবেসে গ্রামেই থেকে যায়। গ্রাম্য রাজনীতিবিদগণ এখন খুবই সচেতন তাঁরা তাদের ক্ষমতা শুধু এখন নিজ গ্রামে মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না পাশ্ববর্তী গ্রামপ্রধানদের সাথেও যোগাযোগ রাখছে কারণ তারা একই শাসকগোষ্ঠী। তাদের একই লক্ষ্য একই উদ্দেশ্য আর তা হলো শোষণ। একদিন একজন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বলেই দিল মামা শোনেন আপনার গ্রামে কিন্তু আপনিই নেতৃত্ব দিবেন আপনি ছাড়া আর কেউ দিতে পারবে না। আমি আসলে সেদিন আরও অবাক হয়েছিলাম তাঁরা বাহিরে বাহিরে লোক দেখানো পোশাকের লেভেজে থাকে অথচ কাজ করে বেমানান। আগে গ্রামে অনেক খালবিল ছিল এখন তা ভরাট হয়ে গেছে।

ঐগুলা কিন্তু খাস জমিজমা ঐগুলো দখল করার জন্য লাঠির দরকার হয় আর তারজন্য দরকার হয় নিজের সন্তানকে গ্রামেই বিয়ে দেওয়া। কারণ তাতে দল বড় হয়, শক্তি বাড়ে। দখলদারেরা এই দখলকৃত খাসজমির ধান মসজিদে দানখয়রাতও করে অনেকসময় মসজিদ, মাদ্রাসা, বিদ্যালয়ে যায়গা ও টাকা পয়সাও দেয়। আর তা দেখে মানুষজন ভাবে মহাশয় কতই না ভালো মানুষ। জানি না তাঁরা কবে বুঝবে এর জবাবদিহিতা একদিন দিতে হবে। কখনো কখনো শহরের ডার্টি পলিটিক্স বা নোংরা রাজনীতির চেয়েও ভিলেজ পলিটিক্স বেশি মারাত্মক হয়ে ওঠে। আমাদের মনে রাখা দরকার মানুষ রাজনৈতিক জীব। এবং জগতে রাজনীতি ব্যতীত কিছুই হয় না।

যা কিছু কল্যাণকর এবং অকল্যাণকর তার সব রাজনীতিরই প্রভাব, রাজনীতির মাধ্যমেই সমস্তকিছু হয়। আর এই রাজনীতি তখনই ভালো হবে যখন রাজনীতি ভালো মানুষের হাতে যাবে এবং রাজনীতিতে সার্বজনীন অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজনীতিতে অংশ নিবে।

লেখক শিক্ষার্থী,

লোকপ্রশাসন বিভাগ

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

সিলেট প্রতিদিন/এসএএম

ফেসবুক পেইজ