“কোনো দায়িত্বশীল হিন্দু বা মুসলিম এমন কাজ করতে পারে না”
বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ১১:৩১ পূর্বাহ্ন

প্রতিদিন ডেস্ক

প্রকাশ ২০২১-১০-১৩ ১১:৪৫:২১
“কোনো দায়িত্বশীল হিন্দু বা মুসলিম এমন কাজ করতে পারে না”

মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান ::

কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে বুধবার (১৩ অক্টোবর) পবিত্র কোরআন অবমাননার একটি সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ব মিডিয়ায়। নানুয়ার দিঘীরপাড় পূজামণ্ডপে হিন্দু দেবতা হনুমানের কোলে পবিত্র কোরআন রাখা হয়েছে বলে জানা যায়।

এ ঘটনাটি ঘটল এমন এক সময়ে, যখন হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন আরম্ভ হয়ে গেছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটলেই আমাদের সাধারণ মুসলিমরা স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। পবিত্র কোরআনের জন্য মুসলমান জীবন বাজি রাখতে পারেন। কোরআনের পবিত্রতা রক্ষা করা তাদের ঈমানি কর্তব্য বটে। কিন্তু আরেকটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখাও অত্যন্ত জরুরি।

সংখ্যালঘু হিন্দু ভাইয়েরা আমাদেরই প্রতিবেশী। মুসলিম হিসেবে অমুসলিম প্রতিবেশীর প্রতিও আমাদের কিছু কর্তব্য রয়েছে। তাদের সুরক্ষা দেওয়া মুসলমানদেরই কর্তব্য। কোনোভাবেই তাদের ভীত সন্ত্রস্ত করার অধিকার কারো নেই। তাদের ধর্মীয় উৎসব পালনে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করারও নেই কোনো হক। ইসলামের শিক্ষা এ ক্ষেত্রে খুব কঠোর। রাসূল সা. নাগরিক হিসেবে অমুসলিম ও মুসলিমদের সমান অধিকারের কথা বলেছেন। তাদের জান মালের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়েছেন মুসলিমদেরকে। এধরনের বিশৃংখল পরিস্থিতিতে যদি একজন অমুসলিমও মারা পড়ে বা মাজলুম হয় তাহলে তার জন্য কঠোর শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে সহিহ হাদীসে।

এক হাদীসে রাসুল সা. বলেন, ‘জেনে রেখ, কেউ যদি কোনো (মুসলিম সমাজে অবস্থিত) অমুসলিমকে জুলুম করে, বা তার অনুমতি ছাড়া তার কোনো বস্তু গ্রহণ করে তাহলে কাল কেয়ামতে আমি তার বিরুদ্ধে বাদী হব। (আবু দাউদ শরীফ, হাদীস নং ২৬২৬)

অন্য বর্ণনায় রাসূল সা. বলেন, ‘কেউ কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা করলে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না, অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৩১৬৬)

আবহমান কাল থেকে এদেশে হিন্দু মুসলিম একসাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে আসছে। পরস্পরের সাথে তাদের রয়েছে অনন্য সুন্দর সম্পর্ক। ধর্মের ভিন্নতার কারণে তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দে কোনো ত্রুটি দেখা যায়নি কখনও। অনেক এলাকায় পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দিরে একসাথে হিন্দু মুসলিম যার যার ধর্ম পালন করে এসেছে। হাজার বছরের এই সৌহার্দপূর্ণ সহাবস্থান এককথায় অনন্য।

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কবছর ধরে আমাদের এই সুন্দর ঐতিহ্য নষ্ট করার অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কুমিল্লার ঘটনা স্পষ্টতই এমনই একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঘটনা ছাড়া কিছু নয়। কোনো দায়িত্বশীল হিন্দু বা মুসলিম কখনও এধরনের কাজ করতে পারে না। এমন উসকানিমূলক কাজ মূলত কোনো হিন্দু বা মুসলিমের কাজ নয়। এ হচ্ছে কোরআন ও আল্লাহর ভাষায় মুনাফিকদের কাজ। অনেক সময় নামধারী মুসলিম বা নামধারী হিন্দুও একাজ করতে পারে। হিন্দু মুসলিম মুখোমুখি করে দেওয়ার এক সহজ অপকৌশল। এমন ঘটনা ঘটার সাথে সাথে উত্তেজিত জনতার মিছিল বের করা সহজ। কয়েকটি পূজামণ্ডপে ভাঙচুর চালানো সহজ। হিন্দু ভাইদের বাড়ি ঘর লুটপাট করাও কঠিন কিছু নয়। কিন্তু এসব কাজ কোনো ইসলামি বা ঈমানি চেতনার কাজ নয়। ইসলাম এমন পরিস্থিতিতে কখনও বিশৃংখলা বৃদ্ধির কথা বলে না। আল্লাহ ফাসাদ সৃষ্টি পছন্দ করেন না।

পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে- ওয়াল্লাহু লা ইউহিব্বুল ফাসাদ। আল্লাহ বিশৃংখলা সৃষ্টি পছন্দ করেন না। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২০৫)। বিশৃংখলা সৃষ্টিকে মুনাফিকদের কাজ বলা হয়েছে পবিত্র কোরআনে। নবীজীর যুগে মদীনা মুনাওয়ারায় যেসব মুনাফিক বাস করতো তাদের স্বভাবের কথাও কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তারা রাসূল সা.-এর কাছে থাকতো। রাসূল সা.-এর সাথে একসাথে নামাজ পড়তো। রাসূলের সাথে থেকে যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করতো। ইসলামি সব কাজই তারা করতো। বাহ্যিকভাবে একেকজন বড় পরহেজগার, ইসলামের সেবক। কিন্তু এরাই এধরনের বিশৃংখলা সৃষ্টি করতো। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদের সম্পর্কেই বলেছেন, ‘যখন তারা আপনার কাছ থেকে ফেরে তখন তারা দেশের মধ্যে অনিষ্ট ঘটাতে এবং ফসলাদি ও জীবজন্তু ধ্বংস করতে চেষ্টা করে, আল্লাহ বিশৃংখলা ও অশান্তি সৃষ্টি পছন্দ করেন না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২০৫)

উচ্ছৃংখল উত্তেজিত জনতার ভাংচুর, আবেগি মিছিল ও সভা সমাবেশের চরম উত্তেজনার ফলে অনেক সময় মূল অপরাধীকে খুঁজে বের করাই কষ্টকর হয়ে যায়। পরস্পরের প্রতি সন্দেহ ও সংশয় বেড়ে যায়। মনে করুন, যদি এ ঘটনার পেছনে কোনো নামধারী মুসলিমকে পাওয়া যায়, যে অশান্তি সৃষ্টি করতেই এমন ঘটনা ঘটিয়েছে, তাহলে আইন শৃংখলা বাহিনী যতই প্রুফ করার চেষ্টা করুন না কেন, উত্তেজিত জনতা তা মানতে রাজি হবে না। মণ্ডপের কোনো পূজারিকে দোষী সাব্যস্ত করা হলে সে প্রকৃত অর্থে একেবারে নির্দোষ হলেও আমরা শতভাগ বিশ্বাস করে ফেলবো। একজন নির্দোষ হিন্দুকে ফাঁসির দড়িতে ঝোলাতে পারলে আমাদের আনন্দের সীমা থাকবে না। এই মানসিকতা কোনো ইসলামী মানসিকতা নয়। এ থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। মুসলিম কখনও না-ইনসাফি করতে পারে না। মুসলিমকে অবশ্যই ন্যায়বান হতে হবে। ইনসাফ শিখতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও। কোনো জাতির প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ন্যায় বিচার করবে না। তোমরা ন্যায়বিচার করো, এটা পরহেযগারির অধিকতর নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে পূর্ণ ওয়াকিবহাল।’ (সুরা মায়েদা আয়াত: ৮)

পবিত্র কোরআন অবমাননার দ্বারা ইসলাম বা কোরআনের কোনো ক্ষতি করতে পারে না অবমাননাকারী। কিন্তু অবমাননার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং এর ভিত্তিতে অমুসলিমদের মণ্ডপে বা বাড়ি-ঘরে যে সব হামলা করা হয় বা অমুসলিমদের ত্রস্ত করা হয় তাতে ইসলামকে ছোট করা হয় এবং মুসলিমদের বদনাম ছড়িয়ে যায় বিশ্বব্যাপী। এজন্য আমাদের অবশ্যই সতর্কভাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা উচিৎ। এবং শান্তভাবে মূল দোষীকে খুঁজে বের করে শাস্তির সম্মুখীন করার চেষ্টা করা কর্তব্য। অনর্থক মিছিল মিটিং ও উত্তেজিত বিবৃতি ও শ্লোগানের কোনোই ফায়দা নেই। এক কণা ফায়দাও কেউ দেখাতে পারবে না। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদেরকে কোরআন সুন্নাহর শিক্ষা অনুসারে চলার তাওফিক দান করুন। অন্ধ আবেগ রেখে সুস্থ সুন্দর সামাজিক কর্তব্য আদায়ের তাওফিক দিন। আমীন।

লেখক : ইসলামি গবেষক,মুফতি,মুহাদ্দিস।

সিলেট প্রতিদিন/এসএএম

ফেসবুক পেইজ