ছোটবেলার দুর্গাপূজা
বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ন

প্রতিদিন ডেস্ক

প্রকাশ ২০২১-১০-১১ ১২:১২:১৯
ছোটবেলার দুর্গাপূজা

আলপনা দেব মুক্তা ::

শরতকালে আগমনীর আমেজে এর আকাশ-বাতাস ভরপুর। আকাশে ভেড়ার পালের মতো শ্বেত-শুভ্র মেঘমালা শিউলির মন মাতানো স্নিগ্ধতায় আর অন্যান্য ফুলের সুবাসে চারদিক মউ মউ করত।

ষড়ঋতুর পালাবদলে ঋতুচক্রকে বড়ই ঐশ্বর্যময়ী, অপূর্ব আর প্রাণবন্ত মনে হতো। একেকটা ঋতু স্বমহিমায় আবির্ভূত হতো 

আজকাল পূজার কথা মনে হলেই ছেলেবেলাকার কথা খুবই মনে পড়ে। তখন এখানকার মতো হয়ত পূজায় এত জাঁকজমক ঐশ্বর্য ছিল না তবে একটা নির্ভেজাল আনন্দ ছিল, যা ছিল একেবারে ষোলোআনা খাঁটি।

ছোটবেলার দূর্গাপূজা  নিয়ে লিখতে গিয়ে  অনেক স্মৃতি, অনেক  কষ্ট, পরিবারে যারা পূজোতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন  হারিয়েছি অনেকে কে ,জীবনের সবচেয়ে মূল‍্যবান সন্তান হারিয়েছি, ওর স্মৃতি বুকে ধারণ করে আমি যক্ষের মতো বেঁচে আছি।

আজ  আনন্দের কিছু লিখতে গিয়ে কলম চলে না।।দু:খ টা আমার  জীবনের পাথেয় হয়ে আছে।এই লিখাটা কয়েকটা বছর আগে লিখলে অনেক  আনন্দের স্মৃতি লিখা হয়ে যেতো।

মনে পড়ে মহালয়ার পুণ্য তিথিতে সেই কাকভোরে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের সুললিত কণ্ঠের মহালয়ার স্তোত্রপাঠ। সত্যিই আবছা সকালের আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হয়ে একটা অদ্ভুত আমেজের সৃষ্টি করত।

আর পূজার আগে আকাশবাণীতে কলকাতার আগমনী গান শুনতাম। দেবী দুর্গার আরেক রূপ শিব-পার্বতীর দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখের আধারে এগুলো রচিত হতো। পূজার আগে এর আবেদন তাই মধুর।

মহালয়ার দিন থেকে পূজার উৎসব শুরু হয়। আমাদের  বাড়ীতে  সিলেট শহরে চৌহাট্টায় অবস্থিত, (সেন্ট্রাল ফার্মেসী'র বাড়ীর পূজা হিসেবে আজ ও খ্যাত)

পূজার কাপড় কেনা কাপড়ের থান আসতো এক ই ধরনের শুধু কালার আলাদা,শাড়ি,পাঞ্জাবী  আত্মীয়স্বজন,বন্ধুবান্ধব যারা পূজোতে আসতো সবার জন‍্য উপহার হিসেবে দেওয়া হতো।আমাদের জামাগুলো বাসায় বড় বোন রা তৈরী করতো এবং আমরা বার বার তাগাদা দিতাম আমার জামা যেনো আগে বানানো হয়।

ষষ্টীর দিন মা দূর্গা কে আনতে যাওয়া কি যে আনন্দ।আমরা হেঁটে হেঁটে ঠাকুর কে এনে, সারারাত ধরে কাপড় পরাতেন আমাদের  মামা।আমরা জেগে থাকতাম,আমাদের কাজ ছিল চা এর অর্ডার দেওয়া।পরদিন পূজো শুরু। বিকেলে ঠাকুর দেখতে লোকজনের ভীড়।বাড়ীতে কারিঘর মিষ্টি বানাতো আর আমরা প্লেটে সাজিয়ে সবাই কে দিয়ে আসতাম।।সবাই যেনো প্রসাদ পায় আমাদের কে ছোটকাকুর অর্ডার ছিল।।ভোরে প্রভাত এর গান "জাগো জাগো রে নয়ন মেলে চাওরে জাগিয়া হরি নাম গাও রে""সন্ধায় গানের অনুষ্ঠান তারপর আরতী প্রতিযোগিতা।বাড়ীর গৃহপরিচারক/গৃহপরিচারিকা রা শিব,দূর্গা কাত্তীর্ক,গনেশ,অসুর সাজতেন,।অনেকে খুশী হয়ে টাকাপয়সা দিতেন।

বছরে এই সময় টা উনাদের ভালো ইনকাম হতো।সপ্তমী,অষ্টমী,নবমী এই তিন দিন বাসা থেকে বের হওয়া কঠিন ছিল কেননা এতো লোকের সমাগম হতো। 

বাহিরে যাবার সুযোগ ই ছিল না আমাদের সবাইকে প্রসাদ খাওয়ানো হতো পূজার এই তিনদিন। আমারা বাড়ির মেয়েরা পুজোর সব কাজে সহযোগিতা করতাম মা,  জেঠিমা, কাকীমা দের ।

দশমীতে বিসর্জন।।মূর্তি নিয়ে ট্রাকে উঠানো হতো। আর আমরা লাল পাড় শাড়ি পরে হেঁটে  হেঁটে ঢোলের বাজনার সাথে গান করতে করতে ট্রাকের পিছনে পিছনে সুরমা নদী তে বিসর্জন দিতাম মাকে।ফেরার পথে গান ধরতাম "মাকে ভাসিয়ে  জলে কীওর্ন লইয়া যাই ঘরে" কিছুক্ষণ সিলেটের ঐতিহ্য ধামাইল গানের সাথে নাচ চলে।লুটের বাতাসা কলা।শান্তির জল ছিটানো  আর মন্ত্র পড়ে রাখী পরানো, সবার মংগলের জন‍্য প্রার্থনা শেষ করে আমরা সবার আর্শীবাদ নিতাম।।পুরো উঠোন জুড়ে লোকজনের ভীড়।।।এই দিনগুলির কথা মনেহলেকষ্ট হয় এখনো পূজো হয়,নেই আগের মতো লোকসমাগম,নেই আগের আনন্দ।। মংগল কামনা জগতের  মানুষের কল‍্যানে,আবার আসুক, আনন্দে ভরে যাক্ পৃথিবী আর পৃথিবীর সকল প্রানী।

লেখক

আলপনা দেব মুক্তা 

ঢাকা বাংলাদেশ

সিলেট প্রতিদিন/এসএএম

ফেসবুক পেইজ