বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০১৯, ০৭:৫০ অপরাহ্ন

মনের যখন অসুখ হয়! – ফারজানা ভূঁইয়া

মনের যখন অসুখ হয়! – ফারজানা ভূঁইয়া

লেখিকা

কিছুক্ষন আগেই উজান তার স্ত্রী দ্বীপ কে বলল যাও রেডি হয়ে এসো। দ্বীপ রেডি হতে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই কেন যেন মনটা খারাপ হয়ে গেল । মনে হলো একটা আচমকা হাওয়া এসে তাকে পাল্টে দিয়ে গেল ।

 

ছবিঃ লেখিকা

তার মন মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেল। তবে সে তার মন পাল্টায় নি বরং মনই পালটে দিয়েছে দ্বীপ কে ঐ সময়ের জন্য।আপনাদের কাছে আপাতদৃষ্টিতে কয়েক মিনিট খুব অল্প সময় মনে হলেও আপনার মনের অলি-গলিতে মহাযুদ্ধ ঘটে যেতে এই কয়েক মিনিট অনেকখানি সময়! এই যে এত দ্রুত মনের অবস্থা বদলে যাচ্ছে, কোন কিছুই নিয়ন্ত্রণে থাকছে না , এই অসুখের নাম জানেন কি কেউ? এটি কে বলা হয় ‘মুড সুইং’ বা সহজে বললে বলতে হবে ‘দোল খাওয়া মেজাজ’ । আপনাকে একটা দোলনায় বসিয়ে দিলে যেমন করে আপনি দোল খাবেন এটিও তেমন পার্থক্য হলো মনের দোল খাওয়া কেউ দেখে না। যেমন দেখেনি উজান, দ্বীপের মন যে আজ কাল বড্ড বেশি দোল খাচ্ছে তা সে বুঝতেই পারে নি। দুদিন পরই দ্বীপ বলল ,এই চলো না আমরা দেশের বাইরে থেকে ঘুরে আসি। আমার কত শখ ছিল স্বামীর হাত ধরে সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়াব। উজান বলল ,আমার এত শখ নেই , তুমি ঘোর গিয়ে পারলে। এই কথা টি শুনতে দ্বীপ মোটেও প্রস্তুত ছিল না।

 

উজানের কথা শুনে দ্বীপের মন এত খারপ হলো যে সে নিজেকে সামলাতে পারে নি। বাথরুমে গিয়ে চিৎকার করে কান্না করে। উজান মনে মনে বলতে লাগলো, মন খারাপের কোন প্রতিযোগিতা হলে সেখানে যে দ্বীপ অনায়েসে প্রথম হতো সে ব্যপারে কোন সন্দেহ নেই। বলে নেই যে উজান আর দ্বীপের সংসারে একটি সন্তান।তাদের আদরের মেয়ে টুকটুক। উজান কিছুদিন যাবত লক্ষ্য করছে কিছু নির্দিষ্ট সময়ে দ্বীপের মন – মেজাজ এতোটাই হাইপার থাকে যে ওর আচরন তখন স্বাভাবিক থাকে না। দ্বীপের এমন আচরনে উজান মহা বিরক্ত । কোন মানে নেই এমন পাগলামী করার। উজান কিছুটা পুরুষ শাসিত সমাজের পুরুষদের মতো । স্ত্রী দের এমন আজব আচরন কেন করতে হবে ? তারা ঘর -সংসার করে , বাচ্চা লালন- পালন করে ব্যাস এতো কিসের চিল্লাচিল্লি? সারাদিন অফিস করে এসে বৌয়ের সাথে এই সব ঢং করার সময় উজানের নেই। তার মধ্যে উজানের ইগো প্রবলেম অনেক বেশি।ভাঙ্গবে তবু মচকাবেনা টাইপের। তাই দ্বীপের মন মেজাজ যত খারাপ থাকুক না কেন সে কোন দিন তার কাছে বসে, তার হাতে হাত রেখে জানতে চায়নি তোমার মন খারাপ কেন? কি সমস্যা আমায় খুলে বল? তাই সচরাচর দ্বীপ যখন চিল্লায় তখন উজান ও চিল্লাচিল্লি করে দুজন দুই দিকে মুখ করে যার যার পথে হাটতে থাকে। এমন করে ঘন্টা, দিন এমনকি সপ্তাহ হয়ে যায় অনেক সময় তবু যেন মন ভাল হয় না দ্বীপের। সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় টি হলো উজান খুব যত্ন সহকারে দ্বীপের দুর্বল জায়গায় আঘাত করে তাকে হারিয়ে দিতে চায়।ঝগড়ায় জিতে যাওয়ার জন্য উজান অনেক সময় ঝগড়ার টপিকের বাহিরের বিষয় নিয়ে আসে আর দ্বীপ কে বিব্রতিকর অবস্থায় ফেলে দেয়। উপায় না পেয়ে দ্বীপই স্যরি বলে দিয়ে মাফ চেয়ে নেয়। উজান তখন ভিলেনের হাসি হাসে মনে মনে। একটা রাজা রাজা ভাব করে দ্বীপ কে এইবারের মতো ক্ষমা করে দিয়েছে ভঙ্গীতে তার হাত ধরে কিছুক্ষণ বসে থাকে । পরে বলেও দেয় আর কোনদিন যেন দ্বীপ এমনটি না করে। উপরের ঘটনাটি কোন গল্প নয় এটি আমাদের সমাজের হাজারও পুরুষের, হাজারও নারীর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা। মূলত আমরা মেয়েদের এই মন খারাপের বিষয়গুলো নিয়ে অনেকটা মজা করি, অবহেলা করি এমনকি তাদের মন খারাপের কারন না যেনেই তাদের সাথে এমন আচরন করি যে তাকে আরো বেশি করে মন খারাপের দিকে ঠেলে দিই।

 

“মুড সুইং “ খুব একটা অপরিচিত টার্ম নয়। মানুষের একটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক পর্যায় এই মুড সুইং। যখন একজন মানুষের মেজাজে খুব দ্রুত পরিবর্তন হয় এবং চলতেই থাকে, সেই অবস্থাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা মুড সুইং নামে অভিহিত করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি যে যদি আপনার মেজাজ এই মুহূর্তে ভাল কিন্তু পরক্ষণে ই বিগড়ে যাচ্ছেন, একটু আগে যেই আপনি ছোট্ট বিষয়ে হাসছেন অথচ পরক্ষণেই হতাশায় চুপসে যাচ্ছেন, ক্রমাগত নানা বিপরীতমুখী সব আবেগের মুখোমুখি হচ্ছে আপনার মন; তবে আপনাকে বুঝতে হবে আপনি ‘ মুড সুইংয়ে ‘ আক্রান্ত। কেন এই মনের অসুখ? কি কারন তার? এর থেকে মুক্তির উপায় ই কি হতে পারে ? তাহলে একটি বিষয় ভালভাবে জানা দরকার যে ‘মুড সুইং’ কিন্তু যে কোন মানুষের যে কোন সময় হতে পারে ।এবং ‘মুড সুইং’ এ আক্রান্ত ব্যক্তি অনবরত বিপরীতধর্মী সব আবেগের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। হঠাৎ মন ভাল থেকে একটু খারাপ, অনেক বেশি খারাপ,সেই খারপ লাগা থেকে তীব্র হতাশা, আবার বিনা কারনেই অনেক খুশি হয়ে যাওয়া এইসব ঘটতে পারে অল্প সময়ের মধ্যে। এবার মূল বিষয়টি তে আসা যাক। স্বাভাবিক ভাবেই মেয়েদের হরমোন এর ওঠানামা ছেলেদের থেকে কিছুটা জটিল ধরণের হয়ে থাকে। একে অনেকটা আবহাওয়ার সাথে তুলনা করা যেতে পারে ।আবহাওয়া যেমন পরিবর্তন হতেই থাকে মিনিটে মিনিটে ঠিক তেমনি মন ও তাই। সাধারণত মেয়েদের মুড একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে পরিবর্তন হয়। মেয়েদের (Menstrual cycle) মেনস্ট্রুয়াল সাইকেল সম্পর্কে বর্তমানে মোটামুটি সবাই কিছুটা হলেও জানে আশা করি। এই সাইকেলের জন্য মূলত দায়ী প্রধান দুটি হরমোন হচ্ছে( Estrogen) ইস্ট্রোজেন এবং (Progesteron ) প্রজেস্টেরন। মাসের নির্দিষ্ট একটি সপ্তাহে (Menstrual cycle) মেনস্ট্রুয়াল সাইকেল চলাকালীন সময়ে এই ‘ মুড সুইং’ বেশি লক্ষ্য করা যায় ।

 

সেই নির্দিষ্ট দিনগুলোতে (Estrogen ) ইস্ট্রোজেন এবং (Progesterone ) প্রজেস্টেরন হরমোন মোটামুটি পাগলের মত দিক-বেদিক ছোটাছুটি করে। ফলে তখন ভয়াবহ ‘মুড সুইং’ হয়। তবে ‘মুড সুইং’ বেশি দেখা যায় নারীদের গর্ভাবস্থায় । ঐ সময় তাদের মুড সুইং অনেক বেশি হয়ে থাকে।এসময় শরীরে হরমোনের নানা পরিবর্তন হতে থাকে। সেই তারতম্যের কারণে একজন নারী মানসিকভাবে অনেকটা বিপর্যস্ত হয়ে পরে ।যার কারণে সে সময় হালকা বা চরম মাত্রার ‘মুড সুইং’ ও হতে পারে। এতে করে হঠাৎ প্রচন্ড রাগ, কান্না, খিটখিটে মেজাজ, অবসাদ ,নির্জীবতা , ব্যথা – সবই হয় মাত্রাতিরিক্ত। এই সময় সব কিছুই অসহ্য লাগে। হাতের কাছে যা থাকে তাই ছুঁড়ে ফেলতে পারলে বরং শান্তি মনে হয়। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন অনেক মেয়ের মধ্যে আত্নহত্যার প্রবনতাও কাজ করে দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত ‘মুড সুইংয়ের ‘ কারনে। তাহলে এই মুহূর্তে মনে একটা প্রশ্ন উকি দিচ্ছে নিশ্চয় যে এই ভয়াবহ মনের অসুখে আপনার আমার কি করণীয় ? তবে আপনাকেই বলছি ‘মুড সুইং ‘ খুবই সাধারন একটি বিষয় যদি তা নিয়ন্ত্রনে রাখা যায়। তাই প্রথমেই ঘাবরে যাবার কিছু নেই শুধু সচেতনতাই পারে আমাদের কে এর খারাপ দিক গুলো থেকে বাঁচিয়ে রাখতে। আর এর জন্য হাসপাতেলে দৌড়ে গিয়ে বস্তা ভর্তি করে ঔষধ ও সেবন করতে হবে না যদি আমরা নিজেরা একটু সচেতন হই তবেই মুড সুইং কে টাটা বাই বাই বলতে পারি। আর সেই সচেতনতার প্রথম কাজ হলো কাছের এবং প্রিয় মানুষটির বিশেষ দিন গুলোতে মানসিক ভাবে সাহায্য করা। সেই মানুষটি (Estrogen )ইস্ট্রোজেন এবং (Progesterone ) প্রজেস্টেরন হরমোনের এর উঠা নামায় দিনের পর দিন ‘মুড সুইংয়ের’ মধ্যদিয়ে যেতে যেতে হয়তো ক্লান্ত হয়ে পরছে অথচ আপনি একই বিছানায় , একই ঘরে থেকেও টেরই পান নি। যা হবার তা তো হয়েছে কিন্তু আর নয়, এই মুহূর্ত থেকে প্রিয় মানুষটির পাশে দাঁড়ান।তার কাঁদে একটি নির্ভরতার হাত রাখুন, তার মন খারাপের সময়টি তে তার ভাল লাগার কাজটি করুন, সে যেন আনন্দ পায় সেই সুযোগটি করে দিন। সেই মানুষটি যে কেবল আপনার স্ত্রী ই হবে তা কিন্তু নয় যে কোন মানুষের মুড সুইংয়ের সময়টি তে তা করা উচিত। সেই প্রিয় মানুষটি হতে পারে আপনার মা, বোন, বান্ধবী, বউ অথবা প্রেমিকা। আবার হতে পারে আপনার বাবা, ভাই, স্বামী কিংবা বন্ধু বা কাছের কোন মানুষ। যেহেতু এটি মনের অসুখ তাই মনের তো আর নারী – পুরুষ হয় না তাই না?? চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে এই হরমোন মানব দেহের ৪৫-৪৭ বছর পর্যন্ত কাজ করে এর পর এর কার্যকারীতা বন্ধ হয়ে যায়।তাই আপন মানুষগুলো খুব বেশি দিন এই বিষয়ে বিরক্ত করার সুযোগ পাবে না । আর একটি বিষয় ,আপনি যাকে অনেক ভালবাসেন, এই সময়টাকে আর একটু বেশি ভালবাসুন, আর একটু বেশি সচেতন হোন, আপনার বোন বা ভাইয়ের সাথে আপনার খুনসুটি লেগেই থাকে, এই সময়টা তে না হয় কষ্ট করে জানিয়ে দিন যে সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বোন অথবা ভাই।আপনার সহধর্মিণী কে’ মুড সুইংয়ের’ সময়টাতে আর ও একটু বেশি সাপোর্ট দিন, তাকে কষ্ট করে না হয় বলুন আপনি কত ভাগ্যবান তাকে পেয়ে। দেখবেন সেই ছোট্ট কথাটির জন্য সে আপনার জন্য কতটা শান্তি বয়ে নিয়ে আসবে। সব কিছুর বিনিময়েও যদি তারা খিটখিটে মেজাজ দেখায় আর বকা খেতে হয় দয়া করে সেটিও একটু মেনে নিন, তাও হাসিমুখে বলুন “তুমিই সেরা”। আপনার একটু ধৈর্য, আর আপনার সহযোগিতার বিনিময়ে প্রিয় মানুষের মুখের হাসি ফোটে উঠবে। এর চেয়ে ভাল প্রতিশেধক আর কি হতে পারে’ মুড সুইংয়ের ‘ জন্য চিন্তা করা যায়? সবশেষে যে কথাটি না বললে সম্পূর্ন হবে না তা হলো এই ‘মুড সুইং ‘নিয়ে অপরাধবোধে ভোগার কিছুই নেই। কারন আপনার দেহে যেমন রোগ হতে পারে তেমনি মনেও রোগ হতে পারে । খুবই প্রাকৃতিক এবং খুবই সাধারণ বিষয় এই ‘মুড সুইং ‘।তাই উদ্ধিগ্ন না হয়ে বরং সচেতন হওয়া জরুরী। সচেতনতাই পারে ‘মুড সুইং’ এর মতো মনের অসুখ কে সারিয়ে তোলতে।

 

লেখিকাঃ ফারজানা ভূইয়া

সাবেক শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

 

নিউজটি শেয়ার করুন






© All rights reserved © 2019 sylhetprotidin24