বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০১৯, ০৭:২১ অপরাহ্ন

প্রসঙ্গ : মা দিবস

প্রসঙ্গ : মা দিবস

জেসমিন চৌধুরী : আমার মা নেই, তাকে শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ হারিয়েছি প্রায় সাত বছর হলো। সন্তান হিসেবে যেমন শুভেচ্ছা জানাতে পারিনি, মা হিসেবেও আজ আমার ভাগ্যে শুভেচ্ছা জোটেনি।

সন্তানকে গর্ভে রাখার এবং প্রসবের কষ্ট সব মা-ই করেন; নেহাত সাইকোপাথ নারী না হলে সন্তানকে আদরযত্নের সাথে লালনপালনও সব মা-ই করেন। নিঃসন্দেহে এজন্য কৃতজ্ঞতা এবং ভালোবাসা তাদের সবারই প্রাপ্য।

কিন্তু যেসব মায়েরা তাদের সন্তানদের ভিন্নতাকে, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে সাহস এবং স্বাধীনতার স্বপ্নকে, ইচ্ছামত বাঁচার আকাঙ্ক্ষাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেন তারা নমস্য। যদি তাদের ছেলেমেয়েদের জীবন দর্শন তাদের থেকে অনেকটা ভিন্ন হয়ে থাকে তাহলে তো কথাই নেই। যেসব মায়েরা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও সন্তানদের সমস্ত চাহিদা পূরণ করার মাধ্যমে তাদেরকে অক্ষত অবস্থায় জীবনের হাতে তুলে দিতে পারেন, তাদেরকেও একটু বেশি ক্রেডিট দিতেই হয়।

আজ এধরনের অনেকগুলো পোস্ট পড়ে আমার ভীষণ অভিমান হচ্ছে কারণ আমাকে নিয়ে এইরকম একটা পোস্ট লেখা উচিৎ ছিল, কিন্তু তা হয়নি, কখনো হবেও না। গত উইকেন্ডে বেড়াতে এসে মেয়ে আমাকে সতর্ক করে দিয়ে গেছে- ‘বাংলাদেশের মা দিবসের পোস্টগুলো দেখে যেন মনে করো না আমি ভুলে গেছি, আমাদের এখানে মা দিবস আলাদা।’

কিন্তু ঘটনা সেখানে নয়। ইউকের মা দিবসেও আমাকে নিয়ে কিছু লেখা হবে না কারণ আমার ছেলেমেয়েরা ফেসবুক ব্যবহার করে না। মেয়ে আগে ছিল, ইদানিং সেও ফেসবুক ডিলিট করে দিয়েছে। তাছাড়া আমার ছেলেমেয়েরা একটু প্রাইভেট কিসিমের মানুষ, ব্যক্তিগত অনুভূতি তারা পাবলিকলি শেয়ার করে না। আমার মত খোলা বইয়ের মত একজন মায়ের বাচ্চা দুইটা তাদের ‘সৎ’বাবার মত রিজার্ভড কী করে হলো, ভেবে পাই না।

আমি নিজেকে আদর্শ মা মনে করি না। বাচ্চাদের জন্য সবসময় সঠিক সিদ্ধান্তটি আমি নিতে পারিনি। একটা অসুখী দাম্পত্য জীবনের মধ্যে তাদেরকে বড় করেছি, নিজের ফ্রাস্ট্রেশনের কারণে সবসময় তাদের প্রতি কোমল আচরণ করতে পারিনি। সমাজ নামক অদৃশ্য ঈশ্বরের কল্পিত রক্তচক্ষুর ভয়ে তাদের বাবাকে আরো অনেক আগে ছেড়ে আসার সাহস পাইনি, অসুখী দাম্পত্য জীবনের প্রভাবমুক্ত রাখতে পারিনি তাদেরকে। সন্তানদের আদালতে ক্ষমার অযোগ্য এমন অসংখ্য অপরাধের আসামী আমি।

প্রতিটা মুদ্রারই পিঠ দুটো, আমার মাতৃত্বের মুদ্রার অন্য পিঠটা কিন্তু কম চকচকে নয়। থাকতাম সিলেটে, স্কুলের শিক্ষকতা থেকে উপার্জিত আমার স্বল্প আয়ের বেশির ভাগই খরচ করতাম তাদের মানসিক বিকাশের চাহিদা পূরণে। ঘনঘন ঢাকায় নিয়ে যেতাম তাদের পছন্দমত বই কিনবার জন্য। বাসাভাড়া দিতে হিমশিম খাওয়া দিনগুলোতেও সেইসময়ের সবচেয়ে পাওয়ারফুল কম্পিউটার কিনে দিয়েছিলাম বাচ্চাদেরকে।

ছেলেমেয়ের উপর নিজের ধর্মীয়, রাজনৈতিক অথবা সামাজিক বিশ্বাস চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করিনি কখনো বরং আমি নিজেই তাদের দ্বারা অনেক বেশি প্রভাবিত হয়েছি। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বড় হওয়া বাচ্চা দুটোর জানার পরিধি এবং জীবনকে বুঝবার ক্ষমতা আমাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল খুব অল্পবয়সেই। আমার অনেক বিশ্বাস এবং কাজই তাদের কাছে আপত্তিকর মনে হতো, প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ হলেও তাদের কথাগুলো আমি মন দিয়ে শুনতাম। গত দশ/বারো বছরে আমার ব্যক্তিত্বের মধ্যে আমূল পরিবর্তন এসেছে এবং এর কৃতিত্বটুকু আমার সন্তানদেরই প্রাপ্য।

চাকুরীর ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে যখন প্রশ্নের সম্মুখীন হই ‘হোয়াট আর ইওর বিগেস্ট স্ট্রেংথ এন্ড উইকনেসেস?’ আমি ভাবি আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। ঠিক সেভাবেই আমার বাচ্চাদের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণের এই মানসিকতাই তাদের জীবনে আমার সবচেয়ে বড় অবদান। আমি তাদেরকে আমার মনমত বড় করে তুলিনি, বরং নিজেকে তাদের মনমত করে তুলতে চেষ্টা করেছি। আমি তাদেরকে পৃথিবীর মুখোমুখি হবার সুযোগ করে দিয়েছি, যা শেখার তারা নিজেরাই শিখেছে এবং আমাকেও শিখিয়েছে। বোধ এবং উপলব্ধির দিকে দিয়ে আমরা একই সাথে বেড়ে উঠেছি, অনেকটা ভাইবোনদের মত। আমি কখনোই আমার বাচ্চাদের গুরুজন ছিলাম না, বরং আমরা সতীর্থ।

মেয়ের বয়স যখন চৌদ্দ তখন তাকে নিয়ে ইউকেতে ফিরে আসি। কিছুদিনের মধ্যেই পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব দেখা যায় তার পোষাক-আশাকে। আমার দেশীয় বন্ধুরা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা প্রশ্ন করতে শুরু করেন, ‘তোমার মেয়ে এসব কী পরে? দেখতে ভালো লাগে না।’ আমি উত্তর দেই ‘ওর যা খুশি ও তা-ই পরবে। এই নিয়ে আপনাদের দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই’। কিছুদিন পর মেয়ের বাবাও আমাকে ইমেইলে মেয়ের পোষাক সম্পর্কে আপত্তি জানালেন, আমি তাকে যথোপযুক্ত উত্তর দেয়ার পর এ বিষয়ে আর ইমেইল আসেনি।

আমার মেয়ের পোষাক দেখে দুশ্চিন্তা করার অনধিকার চর্চায় যারা ব্যস্ত ছিলেন আমার মেয়েটি যে মানসিক দিক থেকে তাদেরকে অনেকখানি ছাড়িয়ে গেছে সেই খবর কিন্তু তারা রাখতেন না, রাখার কথাও নয়। মেয়ের যেসব প্রশ্নে আমার দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়ার কথা সেসব প্রশ্নই আমাকে বিস্মিত করে তুলত, একধরনের আনন্দমিশ্রিত বিস্ময়।

‘আচ্ছা মা, আমি যদি একদিন এসে বলি আমি প্রেগন্যান্ট, তুমি কি করবে?’
‘তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।’
‘রাগ করবে না?’
‘না।’
‘মন খারাপ হবে না?’
‘তা কিছুটা হবে।’
‘কেন, মন খারাপ হবে কেন?’
‘ঠিকমতো তোমার খেয়াল রাখতে পারিনি বলে, নিজের ভাল-মন্দ কীসে হয় তা শেখাতে পারিনি বলে। নিজেকে একজন খারাপ মা ভেবে মন খারাপ হবে।’
‘(হেসে) আমার দিকে ওমন করে তাকিয়ো না মা। আমি প্রেগন্যান্ট না, হবার প্ল্যানও নেই। মেয়েদের হয় তো এসব, তাই জিজ্ঞেস করলাম।

জবাবে আমিও হাসি, তাকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খাই। তার প্রশ্ন কিন্তু এখানেই শেষ হয় না।

‘আচ্ছা মা, ভাইয়া যদি হঠাৎ করে এসে বলে সে গে, তুমি কী করবে?’
‘এটা কী ধরনের প্রশ্ন?’
‘বল না মা, কী করবে?’
‘কী আবার করবো? মেনে নেবো।’
‘মেনে তো নেবেই। কিন্তু মন খারাপ হবে?’
‘তাতো হবেই।’
‘ছি মা ছি! তুমিও?’
‘সব মা’ই চায় তার সন্তান স্বাভাবিক হোক।’
‘তার মানে তুমি গে মানুষকে স্বাভাবিক ভাবো না? ছি: মা, আমি তোমার কাছ থেকে এটা আশা করিনি।’

এরকম আরো কত প্রশ্ন, কত আলোচনা। পনেরো বছর বয়সে মেয়ে ভেজিটেরিয়ান হতে চায়, পশুদের কষ্ট তার সহ্য হয় না। আমি জানি না কীভাবে সুষম ভেজিট্যারিয়ান ডায়েট নিশ্চিত করা যায়। আমি তাকে অনুরোধ করি কিছুদিন অপেক্ষা করতে যেন সে নিজেই নিজের পুষ্টির দিকে খেয়াল রাখতে পারে। আরো কিছুদিন পর মেয়ে হাতে ট্যাটু করতে চায়, শরীরের এখানে সেখানে পিয়ার্সিং করাতে চায়। আমি তাকে ধর্ম দেখাই না, সমাজ দেখাই না, শুধু কিছুদিন অপেক্ষা করতে বলি। নিজের গায়ে স্থায়ী কিছু পরিবর্তন করার আগে নিজের ইচ্ছা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে উপদেশ দেই। মেয়ে কথা শোনে।

আঠারো বছর বয়স হতে হতে মেয়ের পিয়ার্সিং এর শখ চলে গেলেও ট্যাটুর সখ থেকে যায়। আঠারোতম জন্মদিনে আমি তাকে ট্যাটু করানোর টাকা উপহার দেই। আরো কিছুদিন পর সে শুধু ভেজিট্যারিয়ান না, ভিগান হয়ে যায়, দুধ ডিম ঘি মাখন কিছুই খায় না। আমি যতদূর সম্ভব সহযোগিতা করি, নানান রকম ভিগান রেসিপি আয়ত্ত্ব করার চেষ্টা করি।

সবশেষে বলব আমি অসাধারণ একজন মা নই, কিন্তু তবু মা হিসেবে আমার মধ্যে অন্তত একটা অসাধারণ ব্যাপার রয়েছে- আমি প্রতিনিয়ত আমার সন্তানদের যোগ্য মা হবার চেষ্টায় লিপ্ত। তাদেরকে আমার যোগ্য সন্তান হবার চেষ্টা করতে হয়নি, আমার অপূর্ণ সব স্বপ্ন ধরার জন্য প্রস্তুত হতে হয়নি, হবেও না। নিজের জীবন নিজের মত করে বাঁচার অধিকার পরিপূর্ণভাবে ভোগ করতে আমিই তাদেরকে বরাবর উৎসাহ দিয়ে এসেছি। এমনকি যখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমার সাথে মেলেনি, তখনো।

আমার সন্তানরা আমার সম্পদ বা সম্পত্তি কিছুই নয়। তারা আমার বন্ধু, আমার সতীর্থ, আমার ভালোবাসা, আমার ঘনিষ্ঠতম মানুষ। এক্ষেত্রে কাহলিল জিবরানের কিছু কথা আমার জন্য দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে:
‘Your children are not your children.
They are the sons and daughters of Life’s longing for itself.
They come through you but not from you,
And though they are with you yet they belong not to you.’

(জেসমিন চৌধুরী : প্রবাসী কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক )

নিউজটি শেয়ার করুন






© All rights reserved © 2019 sylhetprotidin24