বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০১৯, ০৭:২৬ অপরাহ্ন

তিন আত্মহত্যা,নেপথ্যে পারিবারিক নির্যাতন

তিন আত্মহত্যা,নেপথ্যে পারিবারিক নির্যাতন

সিনিয়র প্রতিবেদক :: চলতি মাসে সিলেটে পর পর তিনটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। পৃথকভাবে সংগঠিত এই তিন ঘটনায় মারা যান তিন মহিলা। এ ঘটনার পর থেকে সিলেটে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়ে গেছে অভিভাবক মহলে। বিশেষ করে গেলো রোববার নগরীতে নারী চিকিৎসক এবং মেডিক্যাল শিক্ষার্থী একই কায়দায় আত্মহত্যার ঘটনায় শোক বইছে সর্বত্র। ফলে পৃথক তিনটি করুণ মৃত্যুর বেদনায় ভারাক্রান্ত হন সিলেটের সাধারণ মানুষ। এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীসহ চিকিৎসা পেশায় জড়িতদের। প্রতিটি আত্মহত্যার পিছনে পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠে এসেছে আলোচনায়। এই নির্যাতন মানসিক থেকে শুরু করে শারীরিক পর্যন্ত গড়িয়েছে। আত্মহত্যা বলা হলেও মৃতের শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্ষতের চিহ্ন পাওয়ার ঘটনাও স্বীকার করেছে পুলিশ।
চলতি মাসের ১১ মে শনিবার আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে জৈন্তাপুরে। শ্বশুরবাড়ির মানসিক নির্যাতনের ঘটনায় নবপরিণীতা বধু হেলেনা বেগম সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। হেলেনা বেগম (২০) জৈন্তাপুরের ঘিলাতৈল গ্রামের শামীম আহমদের স্ত্রী।

প্রাপ্ত তথ্যে জানাগেছে, বাবার বাড়ি থেকে পাঠানো ইফতারি নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে গালমন্দ সইতে হয়েছে হেলেনাকে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, চার মাস আগে শামীম আহমদের সঙ্গে হেলেনা বেগমের বিয়ে হয়। শুক্রবার হেলেনার বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়িতে ইফতারি পাঠানো হয়। সেই ইফতারি নিয়ে শ্বশুর বাড়ির লোকজনের গালমন্দ শুনতে হয় তাকে। এরই জের ধরে ওইদিন আত্মহত্যা করেন হেলেনা। হেলেনার বাপের বাড়ির লোকজনের দাবি-তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়েছে স্বামীর বাড়ির লোকজন। এমনকি নির্যাতনও করা হয়ে থাকতে পারে। তবে স্বামী শামীম আহমদ বলেন, প্রতিদিনের মতো শনিবারও কাজে যাওয়ার সময় স্ত্রীকে হাসিখুশি দেখে যাই। কোনো সমস্যা ছিল না আমাদের মধ্যে। জৈন্তাপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খান মো. মাইনুল জাকির বলেন, মরদেহে আত্মহত্যারই আলামত মিলেছে।

এর ঠিক একদিন পর ১২ মে রোববার আরো দুইটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে সিলেট নগরীতে। একজন পেশায় পার্কভিউ মেডিকেল কলেজের প্রভাষক এবং অপরজন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্রী। একই কায়দায় এবং একই দিনে হৃদয় বিদারক এই দুই আত্মহত্যার ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে অনেকেই।

১২ মে রোববার নগরীর পাঠানটুলা এলাকায় নিজ বাসায় সিলিং ফ্যানের সাথে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন ডা. প্রিয়াংকা তালুকদার শান্তা (২৯)। তিনি পার্কভিউ মেডিকেল কলেজের প্রভাষক। প্রিয়াংকার বাড়ি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার গঙ্গাধরপুর গ্রামে। প্রিয়াংকার বাবা হৃষীকেশ তালুকদার জানান, প্রিয়াংকার স্বামী কল্লোল এবং তার পরিবারের সদস্যরা বিয়ের পর থেকেই তাকে নির্যাতন করতো। মেডিকেল কলেজের শিক্ষিকা হলেও বাসায় তাকে একজন কাজের বুয়ার মতো খাটানো হতো। নানা সময় শারীরিকভাবেও প্রিয়াংকাকে নির্যাতন করা হতো।

জালালাবাদ থানা পুলিশ এ ঘটনায় প্রিয়াংকার স্বামী, শ্বশুর ও শ্বাশুরীসহ তিন আসামীকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ওইদিনই আদালতে প্রেরণ করে। আদালত তাদের কারাগারে পাঠিয়েছে।
প্রিয়াংকার সহকর্মী ও শিক্ষকরা জানান, বিয়ের পর থেকে প্রিয়াংকা সারাক্ষণ মন মরা হয়ে থাকতো। বাইরে নিজেকে ভাল দেখালেও ভেতরে যে যন্ত্রণায় যে পুড়ছিল, সেটি তার চেহারা দেখেই অনুমান করা যেত। কিন্তু কাউকে এনিয়ে কিছুই সে বলেনি। তার বন্ধুরা জানায়, তার শ্বশুর বাড়িতে পড়াশোনার মত সহযোগী পরিবেশ ছিল না বলে এসিপিএস পরীক্ষার সময় বান্ধবীদের ম্যাচে/বাসায় থেকে পরীক্ষা দিয়েছে। তার উপর শ্বশুর বাড়ির লোকজন নানা সময় হাতও তুলতো। তিন বছর বয়সী এক কন্যা সন্তানের জননী ছিলেন ডা. প্রিয়াংকা।

এদিকে একই দিনে নগরীর সুবিদবাজারের মিয়া ফাজিলচিশত এলাকা থেকে ইশরাত জাহান মিথিলা (২১) নামের অপর এক মেডিকেল শিক্ষার্থীর লাশ উদ্বার করে পুলিশ। বাসায় সিলিং ফ্যানের ওড়না পেছিয়ে আত্মহত্যা করে মিথিলা। তিনি সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের ৫৬ ব্যাচের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী। ‘আত্মহত্যা’ করে। মিথিলার পিতা সিলেট ওসমানী মেডিকেলের ২৭তম ব্যাচের ডা. আবদুল হালিম।

এ ঘটনায় পুলিশ বলছে অতিরিক্ত পড়ালেখার চাপের কারণে মিথিলা আত্মহত্যা করতে পারে। তবে, দ্বিমত প্রকাশ করেন মিথিলার প্রতিবেশীরা। প্রতিবেশি একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, মিথিলা পারিবারিক ভাবে নির্যাতনের শিকার ছিল। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা তার বড়বোন প্রায়শই মিথিলাকে নির্যাতন করতেন। এ নিয়ে তাদের বাসায় ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকতো। মিথিলাদের বাসা থেকে প্রায়দিনই কান্নার আওয়াজ শোনতে পেতেন প্রতিবেশীরা। এমনকি ঘটনার দিন মধ্যরাতেও চিৎকার চেঁচামচির আওয়াজ শুনেছেন বলে দাবি করেন প্রতিবেশীরা।

আত্মহত্যা বলা হলেও মিথিলার মৃত্যু পরবর্তী প্রতিবেশিদের কাছে তার পরিবারের লোকজন একেক সময় একেক কথা জানান। পুলিশকে খবর না দিয়ে মিথিলা হার্ট এ্যাটাক করেছে এবং সঙ্গে বমি করেছে বলে সকালে তাকে সিএনজি চালিত অটোরিক্সা করে ওসমানী মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বলা হয় সে আত্মহত্যা করেছে। লাশ বাসায় থাকা অবস্থায় খবর না দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। সকাল ১০টার দিকে পুলিশ আত্মহত্যার খবর পেয়ে ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে গিয়ে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে। পরিবারের সদস্যরা পুলিশকে জানান, রুমে থাকা সিলিং ফ্যানের একটি পাখায় গায়ের ওড়না দিয়ে ঝুলে ‘আত্মহত্যা’ করে মিথিলা।
পরিচিতদের দাবি, সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে মৃত্যু হলে অন্তত পাখা বাঁকা হয়ে থাকার কথা, এমনকি লাশের জিব্বা বের হয়ে থাকবে। পা নিচের দিকেও ঝুলে থাকবে। কিন্তু মিথিলার ক্ষেত্রে তার কিছুই ছিল না।

এদিকে তার সহপাঠিরা জানান, মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে পোস্ট মর্টেম না করতে উচ্চ মহলে তদবির করা হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের চাপে শেষ পর্যন্ত ময়না তদন্ত করে রাতে তারাবির নামাজের আধাঘণ্টা আগে জানাজা শেষে নগরীর মানিকপীর টিলায় দাফন করা হয়। হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, মিথিলির দুই হাতে ৪ টা চ্যাকা দাগের মতো ক্ষত ছিল। এ দাগগুলো সাধারণত ড্রাগ এডিক্টেটদের শরীরে পাওয়া যায়। তবে নির্যাতনের কারণেও এরকম দাগ পড়তে পারে। এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহাদত হোসেন বলেন, ময়না তদন্তের রিপোর্ট ছাড়া কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবে সবকিছু বিবেচনায় এটি আত্মহত্যা বলে মনে হওয়ায় একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সিলেট জেলা সহ-সভানেত্রী ও নারী নেত্রী রীনা কর্মকার বলেন, বর্তমানে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে নারীকে হত্যা এবং তা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা আলোচিত খবরে পরিণত হয়েছে। মনে হচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশে নব নব কায়দায় নারী নির্যাতন ও হত্যা হচ্ছে! এটি এখন নারীদের কাছে, সমাজের কাছে আতংকের নাম। ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে নারীকে হত্যা করে তা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া। সিলেটেই এক সপ্তাহে তিন নারী আত্মহত্যা করেছে বলে খবর রটেছে। জৈন্তায় নব গৃহবধূ, ফাজিলচিশতে মেডিকেল শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান মিথিলা ও শহরের পার্কভিউ মেডিকেলের প্রভাষক প্রিয়াংকা তালুকদারের হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ পারিবারিকভাবে অভিযোগ করা হয়েছে, এদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমেই হত্যা করা হয়েছে। কোন নারী শখের বশে আত্মহত্যা করতে পারে না। এ নির্যাতন ও হত্যার বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, নয়তো দেশের সব উন্নয়নকে নস্যাৎ করে দেবে। এসব নির্যাতনকারী, হত্যাকারীদের আইনের আওতায় এনে প্রকাশ্যে শাস্তি দিতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে জিরো টলারেন্স নীতি প্রদর্শন করে যেভাবে জঙ্গীবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে, ঠিক সেভাবে সকল প্রকার নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সিলেটে আলোচিত এই তিন নারী হত্যাসহ সকল প্রকার নারী নির্যাতন ও হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করছি। আর এ হত্যাকে কোনভাবেই আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তিনি বলেন, সামাজিক সচেতনতার অভাবই ব্যক্তি সচেতনতার পথকে রুদ্ধ করে দেয়। বিশেষ করে নগরীর নারী চিকিৎসক এবং মেডিকেল শিক্ষার্থী মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নারী সমাজকে রুখে দাড়ানোর পথটাকে আরো রুদ্ধ করা দিলো। তিনি এমন ঘটনাকে নিরুৎসাহিত করে বলেন, দেশের প্রচলিত আইনের মাধ্যমেই এই নির্যাতন মোকাবেলা সম্ভব হতো। তবে, এক্ষেত্রে একজনকে নারীকে সর্বাগ্রে অন্ধকার যুগ থেকে বেড়িয়ে আসার আহবান জানান তিনি।

নিউজটি শেয়ার করুন






© All rights reserved © 2019 sylhetprotidin24