বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০১৯, ০৭:১৬ অপরাহ্ন

জামায়াত বিচ্ছিন্ন নয়া সংগঠনের চরিত্রবিচার জরুরি

জামায়াত বিচ্ছিন্ন নয়া সংগঠনের চরিত্রবিচার জরুরি

আহমদ রফিক : যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতার চরম শাস্তির পরিপ্রেক্ষিতে দলের অভ্যন্তরে যে সাংগঠনিক আলোড়ন সৃষ্টি হয় তা মূলত অস্তিত্ব রক্ষার টানে ও গা বাঁচাতে। ঘোষণা যদিও এ সংগঠন ‘ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে’ কিন্তু ধর্মীয় প্রেরণার কথাও বক্তব্য থেকে বাদ যায়নি। এ স্ববিরোধিতাও সংগঠনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্বন্ধে সন্দেহের উদ্রেক করে। স্বভাবতই এ বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত প্রতিবাদী রাজনীতিরও। এ ক্ষেত্রে হেলাফেলা সঠিক হবে বলে মনে হয় না। চেষ্টা চালানো উচিত নেপথ্যের সত্যগুলো সঠিক মূল্যে জানার।

সম্প্রতি একটি খবর রাজনীতিমনস্ক অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে- সংস্কারের নামে জামায়াতে ইসলামের ছোট একাংশের নতুন দল গড়ার প্রচেষ্টা যা বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে সুনির্দিষ্ট অবস্থান কাজ করবে। একাধিক দৈনিক পত্রিকায় সংবাদটি ছাপা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে।বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একাত্তরের জনবিরোধী ও বাংলাদেশ বিরোধী জামায়াত তাদের গণহত্যার ভূমিকা মুছে নিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠার উদ্দেশ্যে জামায়াতের এ প্রচেষ্টা তাদের দিক থেকে ‘ছোট কেস’ হিসেবে পরিচালিত। কারণ ইতোমধ্যে বাংলাদেশি রাজনীতিতে জামায়াত নিষিদ্ধ করার দাবি ক্রমে জোরালো হয়েছে। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত নমনীয়দের দাবি- তারা একাত্তরের ভুল স্বীকার করে জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে নিজদের শুদ্ধ করে দেশীয় রাজনীতিতে অংশ নিতে পারে। বিষয়টি কি ততই সহজ ও সরল? স্বভাবতই এ বিষয়ে সন্দেহবাদীদের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত বেশি। হয়তো এমনই একটি ধারার সংবাদ পরিবেশনে শিরোনাম ‘জামায়াতের সংস্কারপন্থিদের নতুন প্ল্যাটফরমের নেপথ্যে কারা? এ প্রতিবেদনে প্রশ্নটির জবাব খুব একটা স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি, ওঠার কথাও নয়।

সবে বীজ রোপণ ও অঙ্কুর- এর পরিণতি ও পরিণয় দেখার জন্য সময়ের অপেক্ষাই বড় কথা। কারণ বৃক্ষের পরিচয় তার ফলে। তার আগে এ সম্পর্কে ঘোষণা ও প্রচার তার সঠিক চরিত্র তুলে ধরবে বলে মনে হয় না। তবে আপাত দেখার বিষয় কারা এ উদ্যোগ নিচ্ছে, কি তাদের পরিচয়; কারা এর মূল সমর্থক প্রত্যক্ষভাবে বা নেপথ্যে এ বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।পরিচয়পত্রের পাতা খুলতে দেখা যায়, এর মূল উদ্যোক্তা ‘শিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু ‘জন আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফরমের ঘোষণা দিয়েছেন। রাজধানী ঢাকার এক হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা প্রকাশ পেয়েছে (২৭.০৪.২০১৯)।

দুই.
সন্দেহ নেই ঘটনাটি দেশের প্রধান দুই দলে দুই ভিন্নধর্মী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। ক্ষমতাসীন সরকার ও তার দল আওয়ামী লীগ এ প্রচেষ্টাকে সভার তাৎপর্য পর্যবেক্ষণ করবে এমনটাই স্বাভাবিক। হয়তো করবে বামপন্থি দল ও মোর্চাগুলো। তবে বিএনপি হয়তো বিশেষ আগ্রহ নিয়ে এর অগ্রগতি ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতে থাকবে। আর জামায়াত-শিবিরের কথিত এই সংস্কারপন্থিদের নিয়ে খোদ জামায়াতে ইসলামী কি ভাবছে সেটা সম্ভবত বিশেষ গুরুত্বের। কারো কারো ধারণা, এদের ‘জামায়াতের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। দল ভাঙার ভয়ও দলটিতে ভর করেছে। জামায়াত নেতাদের আশঙ্কা- এতে তাদের দল ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।’ প্রশ্ন উঠতে পারে, এটাই জামায়াতের অন্তরের কথা, না বাইরের কথা। এ উদ্যোগ জামায়াতের অন্য কোনো চাল নয় তো? নতুন করে রাজপথে জনসমর্থন নিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠার?
রাজনীতিমনস্ক পাঠকের স্মরণে থাকতে পারে- জনসাধারণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত জামায়াত এক সময় কীভাবে দুই প্রধান দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজপথে তথা রাজনীতিতে আসার সুযোগ পেয়েছিল, ক্রমে তার আর্থ-সামাজিক বংশ বিস্তার এবং রাজনীতিতে ক্রমশ প্রাধান্য। সেসব ইতিহাস মনে রাখার মতো হলেও রাজনৈতিক অঙ্গন অনেক সময় তা ভুলে যায়। ভুলে যায়, নিছক বিস্মরণে, কখনো স্বার্থের টানে।

এ নয়া উদ্যোগের মূল ব্যক্তি ও তার সহকারীগণের বক্তব্য হলো ‘মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সমাজে ন্যায় বিচার, ইনসাফ ও সাম্যের আকাক্সক্ষা জমে ছিল। ওই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করে সুন্দর দেশ গড়াই হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য। আপাত-নির্বিষ এ বক্তব্য কতটা নির্ভরযোগ্য সে প্রশ্নও যুক্তিসঙ্গত কারণে উঠে আসতে পারে।
তবে তাদের আপাত-নির্দোষ আদর্শিক বক্তব্য মেনে নিলেও এ কথা সত্য যে, তাদের বক্তব্যমতেই এটা নতুন করে ইসলামী রাজনীতিরই নয়া উদ্যোগ এবং তাতে জামায়াতের ভগ্নাংশ, তাতে দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ নেই। জামায়াতের একদা সংস্কার প্রচেষ্টার কথাও প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে। তখনকার কোনো কোনো তরুণ জামায়াতীর ছিল এ ধরনের আকাক্সক্ষা। এখন প্রতিকূল পরিবেশে তাদের কারো কারো নতুন বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জায়গা করে নেয়ার এ চেষ্টা মহলবিশেষ সন্তোষের চোখে দেখতেই পারে।
উল্লিখিত প্রতিবেদকের মতেও ‘এ উদ্যোগের পেছনে আরো বড় কোনো পক্ষ জড়িত কিনা তা এখনই বলার সময় আসেনি।’ তবে মনে রাখা দরকার যে, এ উদ্যোগের আহ্বায়ক সাবেক শিবির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জুর ভাষায় তাদের ‘অনুপ্রেরণার উৎসস্থল ইসলামের উদার ঐতিহ্য ও সাম্যের দর্শন।’ সেই সঙ্গে সামাজিক ন্যায় বিচার, জাতীয় ঐক্য ইত্যাদি বিষয়ও তাদের আদর্শিক চেতনার মূল ভিত্তি।

গোটা প্রচেষ্টা বা উদ্যোগটি রাজনৈতিক চরিত্রবিচারে এখনো উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের বিচারে এখনো অনেকটাই রহস্যাবৃত হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে এটি একটি ইসলামিক রাজনীতির সংগঠন। দ্বিতীয়ত, এর মধ্যে মূল জামায়াতী রাজনীতির ভয়াবহতার কতটা মিশ্রণ নিহিত, তা এ মুহূর্তে স্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। হয়তো এ কারণে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ তার সোজাসাপ্টা ভাষায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এই বলে যে, যে নামেই হোক জামায়াতে ইসলামীর বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার নেই। এ প্রতিক্রিয়া খুবই স্বাভাবিক। তবে এ বিষয়ে দলীয় প্রধানের কাছ থেকে কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়নি।

তিন.
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে এ নয়া উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিচার-ব্যাখ্যার অবকাশ যেমন রয়েছে, তেমনি এর রাজনৈতিক পরিণাম ও মেরুকরণ কতটা পুরুষপূর্ণ, আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কিনা তাও চিন্তাভাবনার বিষয়তো বটেই। এবং তা ভালো ও মন্দে। একটি স্ফুলিঙ্গ দাবানল সৃষ্টি করতে পারে- এ প্রবাদেরও বাস্তবতা উল্লিখিত ভালোমন্দ দুদিক ঘিরেই।
এ নতুন উদ্যোগকে অত্যধিক গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন না থাকলেও কয়েকটি প্রাসঙ্গিক বিষয় গণতন্ত্রী জাতীয়তাবাদী ও সমাজতন্ত্রী মতাদর্শের রাজনীতিকদের সতর্কতার সঙ্গে অনুধাবন করা দরকার। সেগুলো হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াত-রাজনীতি রীতিমতো চাপের মুখে আছে।

বিএনপি তাকে কতটা আড়াল দিতে পারবে সেটাও বিচার্য বিষয়।বিএনপি নিজেই রাজনৈতিক সংকটে তার দলীয় প্রধান ও দ্বিতীয় প্রধানকে নিয়ে। অন্যদিকে দ্বিতীয়জনকে নিয়ে, তার কার্যকলাপ ও হঠাৎ তৎপরতা নিয়ে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা শুধু বিব্রতই নন, অসন্তুষ্ট বটে, যদিও তা প্রকাশ্যে নয়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেও খুব একটা স্বস্তিতে নেই। তাকে বহু অপ্রিয় বিষয় ধামাচাপা দিতে হচ্ছে, যেমন সংসদে তাদের নির্বাচিত সদস্যদের আচরণ এবং তাতে হঠাৎ করেই তারেক রহমানের অভাবিত অনুপ্রবেশ। এজন্যই বলছিলাম, বিএনপি তার বর্তমান সংকটে জামায়াতের জন্য কতটা ঢাল হতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে। আলোচ্য নয়া উদ্যোগ নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরে ভিন্নমত থাকার খুবই সম্ভাবনা, অর্থাৎ পক্ষে-বিপক্ষে। এদের অন্তর্নিহিত প্রকৃত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কতটা বিএনপির জানা, মহাসচিবের জানা, সে প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। যারা উদ্যোগের মূল প্রবক্তা সম্পর্কে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থি রাজনীতিকদের একটি তথ্য মনে রাখা দরকার যে, বহিষ্কৃত হওয়ার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত প্রস্তাবিত সংগঠনের আহ্বায়ক মজিবুর রহমান মঞ্জু শুধু ছাত্রশিবিরের উচ্চপদস্থ নেতাই ছিলেন না, ছিলেন জামায়াতের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতার চরম শাস্তির পরিপ্রেক্ষিতে দলের অভ্যন্তরে যে সাংগঠনিক আলোড়ন সৃষ্টি হয় তা মূলত অস্তিত্ব রক্ষার টানে ও গা বাঁচাতে। আর সেজন্যই দাবি ওঠে সংস্কারের পক্ষে, অর্থাৎ স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তনের। এসব ঘটনা মনে রেখেই আলোচ্য বর্তমান উদ্যোগের মূল্যায়ন ও চরিত্র বিচার করতে হবে।
ঘোষণা যদিও এ সংগঠন ‘ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে’ কিন্তু ধর্মীয় প্রেরণার কথাও বক্তব্য থেকে বাদ যায়নি। এ স্ববিরোধিতাও সংগঠনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্বন্ধে সন্দেহের উদ্রেক করে। স্বভাবতই এ বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত প্রতিবাদী রাজনীতিরও। এ ক্ষেত্রে হেলাফেলা সঠিক হবে বলে মনে হয় না। চেষ্টা চালানো উচিত নেপথ্যের সত্যগুলো সঠিক মূল্যে জানার।

লেখক : ভাষাসংগ্রামী , কবি ও প্রাবন্ধিক ।

নিউজটি শেয়ার করুন






© All rights reserved © 2019 sylhetprotidin24