সোমবার, ২৪ Jun ২০১৯, ০৬:৪২ অপরাহ্ন

গ্রামের সবাই হাঁটেন জুতা হাতে নিয়ে

গ্রামের সবাই হাঁটেন জুতা হাতে নিয়ে

প্রতিদিন ডেস্ক : গ্রামের প্রবেশদ্বার থেকে জুতা হাতে নিয়ে গ্রামে প্রবেশ করেন তারা। আবার জুতা হাতে নিয়ে গ্রামের সীমানার বাইরে গিয়ে তারা এটি পায়ে দেন। অদ্ভুত রীতিনীতি মনে হলেও প্রতিদিন এমন করেই দিন পার করেন এখানকার মানুষ।

গ্রামটি প্রতিবেশী দেশ ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের শহর তামিল নাড়ু রাজ্যে। এখানকার রাজধানী চেন্নাই থেকে ৪৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছোট্ট গ্রাম আন্দামান। ধানক্ষেত ঘেরা গ্রামটিতে ১৩০ পরিবারের বাস। এখানকার অধিকাংশই কৃষিজীবী।
এই আন্দামান গ্রামের প্রবেশদ্বারেই আছে প্রকাণ্ড একটি নিম গাছ। গাছটির নিচে থাকা ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকেই ধানক্ষেতগুলোতে চাষের পানি আসে। এখানকার রাস্তাগুলো পাথর দিয়ে আবৃত। বহু বছরের পুরনো এই নিম গাছটি থেকেই শুরু হয় গ্রামের মানুষদের জুতা খুলে হাতে নেয়া।

অনেক বয়স্ক ও খুব অসুস্থতা ছাড়া আন্দামান গ্রামের প্রতিটি মানুষ এই নিয়ম মেনে চলেন। এমনকি প্রচণ্ড গরমে মাটি যখন প্রচণ্ড উত্তপ্ত থাকে তখনও তাদের পায়ে জুতা থাকে না। গ্রামের সীমানা পার না হওয়া পর্যন্ত সবাই জুতো হাতে নিয়ে হাঁটেন। এমনকি ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও স্কুলে যাওয়ার পথে এ নিয়ম মেনে চলে। খালি পায়ের এ অবস্থাতেই চলে গ্রামের কাজকর্ম।

গ্রামটিতে জুতা না পরার শুরুটাও ছিল একটা বিস্ময়কর ঘটনা। ৬২ বছর বয়সী লক্ষণ ভিরাবাদরা চার দশক আগে এই গ্রামে দৈনিক মজুরির শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বর্তমানে তিনি দুবাইতে একটি নিমার্ণ কোম্পানির মালিক। এই কোম্পানিতে জনবল নিয়োগ দেয়ার জন্যে তিনি মাঝে মাঝে গ্রামে আসেন। যদিও তার গ্রামের আসার মূল উদ্দেশ্য সেটা না। শেকড়ের টানেই তিনি এই গ্রামে ছুটে আসেন।

লক্ষণ ভিরাবাদরা বলেন, আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগের কথা। গ্রামের প্রবেশদ্বারে ওই নিম গাছটির নিচে গ্রামের সবাই মিলে কাদামাটি দিয়ে ভগবান মুথায়ালাম্মার একটি মূর্তি তৈরি করে। পুরোহিতরা যেমন ভগবানের মূর্তি গয়না দিয়ে সাজায় এবং এর চারপাশে ঘুরে মানুষ পূজা করেন, ঠিক এভাবেই একটি যুবক জুতা পরে ভগবানের মূর্তির চারপাশে হেঁটেছিল। তিনি বলেন, যুবকটি অবজ্ঞা করে এভাবে হেঁটেছিল কি না সেটা আজও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে হাঁটতে হাঁটতে যুবকটি পিছলে মাঝখানে পড়ে যায়। ওইদিন সন্ধ্যায়ই সে রহস্যময়ভাবে জরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। যা সেরে উঠতে কয়েক মাস লেগে গিয়েছিল। সেই থেকে অজানা ভয় এবং বিশ্বাসে গ্রামের মানুষ আর কোনো দিন জুতা পরে না। এটা এখন জীবনের স্বাভাবিক একটি অংশ হয়ে গেছে।

৭০ বছর বয়সী আন্দামানের বাসিন্দা মুখান আরুমুগাম জানান, বয়স্ক বা খুব বেশি অসুস্থ ছাড়া গ্রামের কেউ জুতা পরেন না। তিনিও খালি পায়েই ছিলেন। যদিও তিনি বলছেন, শীঘ্রই তিনি স্যান্ডেল পরবেন, বিশেষত গ্রীষ্মের উষ্ণ মাসগুলোতে।

গ্রামটির মধ্যে দিয়ে হাঁটলেই দেখা যায় স্যান্ডেল বা জুতা না পরার দৃশ্য। শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা জুতা হাতে নিয়ে স্কুলে যায়। এখানে সবাই এভাবেই চলাফেরা করে। একটি পার্স বা ব্যাগের মতো তারা হাতে করে জুতা বহন করে। গ্রামের মধ্যে দিয়ে খালি পায়ে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন আনবু নিথি। পাঁচ কিলোমিটার দূরের শহরের একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াশোনা করে নিথি।

খালি পায়ে থাকার বিষয়ে ১০ বছর বয়সী নিথি বলেন, আমার মা বলেছে, আমাদের গ্রামকে মুথায়ালাম্মা নামের একজন শক্তিশালী দেবী রক্ষা করছে। তাই তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমরা গ্রামে কখনো জুতা পরি না। আমি চাইলে জুতা পরতেই পারি। কিন্তু এটা এমন দাঁড়ায় যে, সবাই যাকে ভালোবাসছে আমি তাকে অপমান করছি।

এ রীতি কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় না। আবার এটা কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস নয়। তবুও ভালোবাসা আর সম্মানের সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই রীতি পালন করে আসছে এখানকার মানুষ।

৫৩ বছর বয়সী চিত্রশিল্পী কারুপ্পিয়া পান্ডে স্ত্রী পিছিম্মার সঙ্গে ধানের জমিতে কাজ করছিলেন। তিনি বলেন, আমরা চতুর্থ প্রজন্ম হিসেবে গ্রামের এই রীতি পালন করে আসছি। পিছিম্মা বলেন, যখন কেউ আমাদের গ্রামে বেড়াতে আসেন, আমরা তাকে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু এটি তিনি করতে না চাইলে জোর করা হয় না।

তবে একটা সময় ছিল যখন জুতা না পরা নিয়ে বাড়াবাড়ি ছিল। এখন এটি সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিগত পছন্দ যা এখানে বসবাসকারী সকলে পালন করে। আমি কখনো আমার চার সন্তানের ওপর এ নিয়ম চাপিয়ে দেইনি। আশেপাশের শহরগুলোতে কাজ করা মানুষগুলো এই গ্রামে বেড়াতে আসলে এটা সবাই তারা অনুসরণ করে চলে।

গ্রামের আরেক বাসিন্দা সুব্রামানিয়াম পিরামবান বলেন, কথিত আছে গ্রামে কেউ জুতা পায়ে দিয়ে হাঁটলে রহস্যজনকভাবে তার জ্বর হয়। আমরা এ কথায় ভয় পাই না। কিন্তু এই গ্রামকে একটি পবিত্র জায়গা বিবেচনা করেই আমরা বড় হয়েছি। আমার কাছে পুরো গ্রামটাই একটি মন্দির।

রমেশ সেভাগন নামের এক গাড়িচালক বলেন, এটি আমাদের সম্প্রদায়কে দৃঢ় করতে সাহায্য করছে। একটি পরিবারের মতো আমাদের সবাইকে একই বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। এখানে কেউ মারা গেলে তার পরিবারের জন্য গ্রামের প্রত্যেকে ২০ রুপি করে অনুদান দেন। এই অর্থ দেয়ার জন্য ধনী বা গরীব আলাদা করা হয় না। সবার জন্যই এই নিয়ম সমান। ভালো সময় ও খারাপ ক্ষেত্রে প্রতিবেশীদের আমরা পাশে থাকতে চাই। এটা মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা এখানে সবাই সমান।

গ্রামের মানুষদের এই বিশ্বাস ভঙ্গ করেন না গ্রাম থেকে বাইরে চলে যাওয়া মানুষগুলোও। তারা গ্রামে ফিরে এলে গ্রামবাসীদের সাথে মিলে জুতা ছাড়াই হাঁটেন। তারা চান না আন্দামানের সহজ-সরল মানুষগুলোর হৃদয়ে থাকা এই বিশ্বাসে চির ধরাতে।

জুতা না পরার সঙ্গে কোনো অন্ধবিশ্বাস জড়িত কি না এমন আলোচনায় দুবাইভিত্তিক নির্মাণ কোম্পানির মালিক লক্ষণ ভিরাবাদরা বলেন, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই নানান বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে আমাদের জীবন চলে। এটা তেমনি এক বিশ্বাস যা এখানে আপনি দেখতে পাবেন। আমরা কে বা কোথায় থাকি সেটা বড় বিষয় না। যাইহোক না কেন প্রতি সকালে উঠে বিশ্বাস করি যে আমরা ভালো থাকবো। যদিও সেই ভালো থাকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবুও আমরা স্বপ্ন দেখি এবং ভালো থাকার পরিকল্পনা করে এগিয়ে যায়।

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © 2019 sylhetprotidin24